ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব এবং দেশটির রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ আলী লারিজানির মৃত্যু হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড ইরানের জন্য ক্ষতির চেয়েও বেশি কিছু।
দেশটির ক্ষমতার জটিল ভারসাম্যে আলী লারিজানি ছিলেন এমন এক কেন্দ্রবিন্দু, যাঁর অনুপস্থিতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব নয়। যুদ্ধের শুরুতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হারালে যে মাত্রার অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, লারিজানির মৃত্যু সেই আঘাতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
লারিজানি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি নেতৃত্বের শীর্ষ সারির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর প্রভাব শুধু দেশের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও কার্যকর যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় কাশেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর ইরানি রাষ্ট্রযন্ত্র যে বড় শূন্যতার মুখে পড়েছিল, লারিজানির মৃত্যু সেই ধাক্কার সমতুল্য বলেই মনে করা হচ্ছে।
জীবনের শেষ পর্যায়ে লারিজানি ধীরে ধীরে কঠোর রক্ষণশীল অবস্থান থেকে সরে এসে একটি মধ্যপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে একসময় তিনি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন।
এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক তাৎপর্যও গভীর। এটি ইঙ্গিত দেয়, ইসরায়েল এবং সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র কখনোই লারিজানিকে ইরানের সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে বিবেচনা করেনি। যুদ্ধ-পরবর্তী সম্ভাব্য আলোচনায় বা সমঝোতায় তাঁর ভূমিকা থাকতে পারত। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও এমন ধারণা ছিল যে লারিজানি থাকলে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ইরানের সঙ্গে আলোচনা সহজ হতে পারত। এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হয়তো সেই সম্ভাবনাই নষ্ট করতে চেয়েছেন।
লারিজানি ছিলেন মধ্যপন্থী, যিনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংলাপের পথ খোলা রাখতে আগ্রহী ছিলেন। ভেনেজুয়েলায় নিকোলা মাদুরো সরকারের ভেতরে ডেলসি রদ্রিগেজ যেভাবে বাস্তববাদী ভূমিকা পালন করছেন, অনেকের চোখে লারিজানি ছিলেন ইরানের সেই ধরনের একজন সম্ভাব্য সেতুবন্ধকারী। তাঁর অনুপস্থিতিতে ইরানের ভেতরে এমন কোনো গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর সমঝোতাকারী এখন দৃশ্যমান নয়।
অন্যদিকে রেজা পাহলভিকে বিকল্প নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়েও ওয়াশিংটনের আগ্রহ কম। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের ভেতর থেকেই নেতৃত্বের বিকাশ দেখতে চায়। কিন্তু লারিজানির মতো গ্রহণযোগ্য, অভিজ্ঞ এবং বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অভাবে সেই সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
লারিজানির শক্তি ছিল তাঁর ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা। তিনি একদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্মের প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারতেন, অন্যদিকে বাস্তববাদী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সংলাপ বজায় রাখতেন। তিনি ছিলেন সাবেক পার্লামেন্ট স্পিকার, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান, আবার একই সঙ্গে দর্শনচর্চায় পারদর্শী এক বুদ্ধিজীবী। পশ্চিমা দর্শন তাঁর দখল, তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের উত্তরাধিকার প্রশ্নেও লারিজানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মোজতবা খামেনিকে ক্ষমতায় আনার সম্ভাবনার বিরোধিতা করেছিলেন লারিজানি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এতে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো আরও বেশি সামরিকীকরণের দিকে যাবে এবং বেসামরিক শাসনের অবশিষ্ট ভারসাম্য নষ্ট হবে।
তবু সংকটের মুহূর্তে লারিজানি বিভাজনের রাজনীতি করেননি; বরং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। গত আগস্টে নতুন করে সংকট তৈরি হলে তাঁকেই আবার দায়িত্বে আনা হয়। জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলে তাঁর নেতৃত্বে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয়ে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও তিনি ছিলেন প্রধান মুখ।
জীবনের শেষ পর্যায়ে লারিজানি ধীরে ধীরে কঠোর রক্ষণশীল অবস্থান থেকে সরে এসে একটি মধ্যপন্থী অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এ কারণে একসময় তিনি নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন। কিন্তু সংকটময় বাস্তবতায় আবারও তাঁকেই ভরসা করতে হয় রাষ্ট্রকে। অর্থনৈতিক চাপ, জন–অসন্তোষ এবং যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি একধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লারিজানির শূন্যস্থান কে পূরণ করবে? ইরানের জটিল ক্ষমতার কাঠামোয় লারিজানির মতো বহুমাত্রিক, গ্রহণযোগ্য ও কৌশলী নেতৃত্ব খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। ইসরায়েলের কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতার মুখে ইরান কি নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারবে, নাকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার সূচনা হয়ে থাকবে, সেই উত্তর আপাতত অজানা। সময়ই তার ব্যাখ্যা দেবে।
প্যাট্রিক উইনটুর দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার কূটনৈতিক সম্পাদক
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত