একটা ব্যাপার অনেকভাবে আলোচিত হয়েছে—বিএনপির হাত ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত পুনর্বাসিত হয়েছিল। জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে বিএনপি তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ছিল অনেকটা ‘ক্ষমাশীল’। দুই দল জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করেছিল, সেসব বেশি দিন আগের কথা নয়।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে জামায়াতের ৫ শতাংশ সমর্থন তখন বিএনপির প্রয়োজন ছিল। তাই তখন বিএনপির মধ্যে জামায়াতকে নিয়ে কোনো সমালোচনা ছিল অনেকটা দমিত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে এবং জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ হয়েছে। এ দুই দলের সম্পর্কের বহুমুখী জটিলতাও নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দুই দলের সদস্যদের বাগ্বিতণ্ডা বিএনপি-জামায়াত রসায়ন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
‘সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’ বিএনপি এখন ক্ষমতায় এবং জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী দল। দুই দলেরই সুযোগ ছিল জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে এবং ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিতে। প্রথম থেকেই বিএনপি চেয়েছিল যেসব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির শরিক ছিল, তাদের নিয়ে একত্রে নির্বাচন করতে এবং যৌথভাবে সরকার গঠন করতে। কোনো কোনো ছোট দল তাদের কথায় সায় দিয়েছিল, তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ এখন মন্ত্রী।
কিন্তু দুই কারণে জামায়াত এতে রাজি হয়নি। এক. জামায়াত চাইছিল নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করে এককভাবে ক্ষমতায় যেতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনে শিবিরের জয় জামায়াতের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলেছিল।
দ্বিতীয় কারণটি ছিল, জামায়াত জানত সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও তারা নিশ্চিতভাবে প্রধান বিরোধী দল হবে এবং সেটা কিছু মন্ত্রিত্বের চেয়েও অনেক বেশি সম্মানের। তা ছাড়া জুলাই সনদে বিরোধী দলের জন্য অনেক লাভজনক প্রণোদনা রয়েছে, যেমন আনুপাতিক হারে উচ্চপরিষদ, ডেপুটি স্পিকারশিপ, কমিটি চেয়ারম্যান, নির্বাচনকালীন সরকার গঠনপ্রক্রিয়া কমিটিতে একাধিক সদস্য ইত্যাদি। জামায়াত প্রথম থেকেই এসব নিয়ে সোচ্চার ছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদে শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন নিয়ে সব সময় উচ্চবাচ্য ছিল। বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই যদি ক্ষমতা ভাগ করে নিত তাহলে বিরোধী দল কে হতো? এনসিপির যে সাংগঠনিক ক্ষমতা, তাতে তারা এককভাবে নির্বাচন করে আসন পাওয়া সম্ভব ছিল না।
জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্ব যে একদম ভুলে যেতে চান, তা বলা যাবে না। সালাহউদ্দিন আহমদ ও ফখরুল ইসলাম আলমগীর সময়–সময় এ নিয়ে জামায়াতকে তুমুল সমালোচনা করেছেন, যখন প্রয়োজন হয়েছে। বলা যায়, একাত্তর কার্ড শুধু প্রয়োজনেই ব্যবহার করার পক্ষে বিএনপি নেতারা।
জামায়াত নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত তাদের জন্য সঠিক ছিল। নিজস্ব জোটে নির্বাচন করে এবং প্রধান বিরোধী দল হয়ে জামায়াত একটা নিজস্ব বলয় ও প্রভাব সৃষ্টি করেছে। এটা কতটুকু টেকসই হবে, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি প্রবাহ সেটা নির্ধারণ করবে।
এখন জামায়াত বিরোধী দল—এনসিপির তরুণেরাও জামায়াতের রাজনৈতিক শক্তি বাড়িয়েছেন। বর্তমান সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে জামায়াত এত নির্বিঘ্নে এবং উচ্চ শিরে কখনো রাজনীতি করতে পারেনি।
অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর নিজ দেশ পাকিস্তানে জামায়াত ২০২৪ সালের নির্বাচনে ২.৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে; কিন্তু কোনো আসন অর্জন করতে পারেনি। নিয়তির কী পরিহাস, যে দেশের স্বাধীনতায় জামায়াতের ছিল সক্রিয় বিরোধিতা, সে দেশের জনগণ তাদের ৩০ শতাংশ ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। সে জন্যই হয়তো বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, ‘জামায়াত জোটের এবারের নির্বাচনের জাদুকরি সংখ্যা গবেষণার দাবি রাখে।’
নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতের রসায়ন পরীক্ষা করলে খুব কৌতূহলোদ্দীপক মনে হবে। কখনো মনে হবে খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ, নিন্দুকেরা বলবে ‘সহযোগী’ বিরোধী দলের মতো। আবার সংস্কার প্রশ্নে জামায়াত জোট বিএনপির কড়া সমালোচনা করলেও, দেখা যাচ্ছে সক্রিয়তা সীমাবদ্ধ রাখছে। আসলে নতুন বাস্তবতায় সংসদে এবং সংসদের বাইরেও এ দুই দলের সম্পর্ক এখনো ক্রম বিকাশমান।
মাঠপর্যায়ে বিএনপির দুর্বলতাগুলো নিয়ে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের যতটুকু সোচ্চার হওয়ার কথা ছিল, সেটা দেখা যাচ্ছে না। আবার জামায়াতের ‘মবজাতীয়’ কর্মকাণ্ড নিয়েও বিএনপিকে বেশ সহনশীল মনে হয়। অনেকে বলবেন, দুই দলের নেতৃত্বে একটা সমঝোতা আছে একে অপরের বিরোধিতায় কতটুকু যাবে।
একটা বিষয়ে দুই দলই একসঙ্গে কাজ করছে—স্থানীয় নির্বাচন, বার কাউন্সিলের নির্বাচন এসব সুযোগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের লোকদের দূরে রাখতে।
এ দুই দলের সহযোগিতার একটা বড় কারণ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটা অ্যাডহক বা সাময়িক অবস্থা দিয়ে যাচ্ছে। কত দিন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকবে কিংবা কত দিন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিনা বিচার আটকে রাখা যাবে, তা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। তবে সেটা যে অনির্দিষ্টকাল হবে না, তা নিয়ে প্রায় সবাই একমত। বিএনপির একটা অংশ সম্ভবত চাচ্ছে আগামী আরেকটা নির্বাচন পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে দূরে রাখতে, কিন্তু রাজনৈতিক অভিজ্ঞ অংশটা প্রকাশ্যেই ভিন্নমত প্রকাশ করেছে।
এটা কোনো অজানা কথা নয় যে যত দিন আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে না আসতে পারে, তত দিন বিএনপি এবং জামায়াতের কিছু বাড়তি সুযোগ থাকবে।
বিএনপির সুযোগ এই জন্য যে তারা জোরালো বিরোধিতা ছাড়া নিশ্চিন্তে দেশ চালাতে পারবে এবং বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনগুলোতে একচেটিয়া ফললাভ করতে পারবে।
জামায়াত বিরোধী দল হিসেবে এখন যে সম্মান ভোগ করছে, আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে এলে তা অবশ্যই বাধাগ্রস্ত হবে। একটা বড় সম্ভাবনা রয়েছে যে তাদের জনসমর্থন আবার দূরতম তৃতীয় স্থানে নেমে যেতে পারে।
এনসিপির ওপর যতবারই ভরসা করা হয় তারা নেপালের জেন–জিদের মতো হতে পারবে, ততবারই নিরাশ হতে হয়েছে। অনেকে মনে করেন, গত নির্বাচনেই তাদের সুযোগ ছিল চমক দেওয়ার। সম্ভবত ভবিষ্যতে তারা আরেকটি গতানুগতিক রাজনৈতিক দল হয়ে টিকে থাকবে।
সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টা হলো—একাত্তরে জামাতের ভূমিকা নিয়ে বিএনপির অবস্থান। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক যাকে বলবেন, ‘একাত্তর কার্ড’।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘একাত্তরের গণহত্যার প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য অবস্থান না নেওয়া পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিতর্ক চলবে।’ অন্যভাবে বলা যায়, একাত্তর কার্ড সক্রিয় থাকবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল যিনি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা, তিনি বলেছেন —‘যখন বেশি বাড়াবাড়ি করে তখন বলতে ইচ্ছা করে, তোরা রাজাকার, তোরা আলশামস, তোরা আলবদর।’
জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিএনপিতে দুটি ভাগ আছে। এক দল—যাদের মধ্যে আছেন একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা, তাঁরা সুযোগ পেলেই মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার সমালোচনায় সোচ্চার হন। আরেক দল আছেন জামায়াতকে নিয়ে তাঁরা বেশ সহনশীল, তাঁরা মনে করেন জামায়াতকে মান্য করে তাদের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করাই বিএনপি সরকারের জন্য বেশি ফলদায়ক হবে। তাঁদের বলা যায় ‘গুড কপ’, তাঁরা অকারণে অতীতের ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করতে নারাজ। একাত্তর কার্ড তাঁরা ব্যবহার করতে চান শুধু প্রয়োজন পড়লে বা বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে।
সংসদে সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির ‘গুড কপ ব্যাড কপ’ বিষয়টা সবার নজরে পড়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্য বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান গুড কপ ব্যাড কপের রাজনীতি মানেন না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর আলাদা অনুভূতি রয়েছে এবং সেটা তিনি সাহস নিয়ে সব সময় ব্যক্ত করে এসেছেন। একাত্তরে জামাতের ভূমিকা নিয়ে তিনি সংসদে তীব্র সমালোচনা করেছেন।
বিএনপির এক দলকে দেখা গেছে তাঁকে সমর্থন জানাতে, আবার অনেকে বিরক্তিও প্রকাশ করেন। একটা জাতীয় দৈনিকের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্যকে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়।
বিএনপির এক দল যখন জামায়াতের তীব্র সমালোচনা করে, তখন অন্য আরেক দল চেষ্টা করে তাদের নিবৃত্ত করতে। ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘নতুন করে আমার মনে হয় যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ভিত্তিতে জাতিকে আর বিভক্ত না করি।’
জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্ব যে একদম ভুলে যেতে চান, তা বলা যাবে না। সালাহউদ্দিন আহমদ ও ফখরুল ইসলাম আলমগীর সময়–সময় এ নিয়ে জামায়াতকে তুমুল সমালোচনা করেছেন, যখন প্রয়োজন হয়েছে। বলা যায়, একাত্তর কার্ড শুধু প্রয়োজনেই ব্যবহার করার পক্ষে বিএনপি নেতারা।
বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কের নানা রকম জটিলতা সত্ত্বেও বলা যায়, দুই দলই তাদের নির্বাচন-উত্তর ক্ষমতা ও সমঝোতার একটা ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছে। দুই দলই সতর্ক, যেন কোনো ‘স্পয়লার’ এসে তাদের সাফল্যে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
salehpublic711@gmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব