মতামত

জুয়া দমন আইন নাকি রাষ্ট্রের হাতে নতুন ‘ডিজিটাল অস্ত্র’?

প্রস্তাবিত ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ কেবল একটি খারাপ আইন নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক ও আইনগত সংস্কারের গতিপথের বিরুদ্ধে এক বিপজ্জনক পশ্চাদপসরণ।

খসড়াটি পড়লে মনে হয় না এর মূল উদ্দেশ্য জুয়া দমন। বরং মনে হয়, অনলাইন জুয়ার জনপ্রিয়তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে এমন কিছু ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পতনের পর হারিয়ে গিয়েছিল।

সরকার জনগণকে বোঝাতে চাইছে এটি জুয়াবিরোধী আইন। কিন্তু আইনটির প্রকৃত চরিত্র লুকিয়ে আছে এর নজরদারি, তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ন্ত্রণের ধারাগুলোয়। জুয়া এখানে মুখোশ; আসল বিষয় ক্ষমতা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রশ্ন হলো—যে কাজ ইতিমধ্যেই অপরাধ, সেটিকে আবার নতুন আইন দিয়ে অপরাধ ঘোষণা করার প্রয়োজন কী? অনলাইন জুয়া সাইবার সুরক্ষা আইনেই শাস্তিযোগ্য।

তাহলে নতুন আইন কেন? কারণ, নতুন আইন জুয়ার বিরুদ্ধে নয়, নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন।

৪৩ ধারার ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ ধারণা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নয়, বরং একটি নজরদারি-রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। কোনো বিচারিক আদেশ ছাড়া, কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ছাড়া, কোনো স্বাধীন আপিলব্যবস্থা ছাড়া সরকার একজন নাগরিককে ডিজিটাল ও আর্থিকভাবে কার্যত অচল করে দিতে পারবে।

নাম, এনআইডি, সিম, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিভাইস, আইপি—সবকিছু একটি কেন্দ্রীয় কালোতালিকায় জমা হবে। ভুল হলে কী হবে? প্রতিকার কোথায়? আইন নীরব। কারণ, নাগরিকের অধিকার নয়, নিয়ন্ত্রণই এখানে অগ্রাধিকার।

৪৪ ও ৪৭ ধারা আরও ভয়ংকর। এনআইডি, সিম, ব্যাংকিং তথ্য, বায়োমেট্রিক পরিচয় এবং মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তিকে একত্রে যুক্ত করার ক্ষমতা কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রয়োজন নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নজরদারি অবকাঠামোর নকশা।

ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা দিয়ে সরকার নাগরিকের ডিজিটাল জীবনের ওপর নজর রাখার এমন সুযোগ পাবে, যার অপব্যবহার রোধে কার্যকর কোনো সুরক্ষা রাখা হয়নি।

অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক হতে শেখায়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও জননিরাপত্তার ভাষায় শুরু হয়েছিল। বাস্তবে সেটি পরিণত হয়েছিল সাংবাদিক, লেখক, কার্টুনিস্ট, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নাগরিককে হয়রানির যন্ত্রে।

আজ যে সরকার সেই আইনের অপব্যবহারের সমালোচনা করে ক্ষমতায় এসেছে, তারাই যদি একই ধরনের ক্ষমতা নতুন নামে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি শুধু নীতিগত বৈপরীত্য নয়—জনগণের সঙ্গে প্রতারণা।

এই প্রস্তাবিত আইনটির ৩৯ ধারায় ওয়ারেন্টবিহীন তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা, ৩৭ ধারায় সব অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা এবং ৩৬ ধারায় মোবাইল কোর্টের হাতে বিচার তুলে দেওয়া দেখায় যে খসড়াটির রচয়িতারা নাগরিক স্বাধীনতার মৌলিক নীতিগুলোকে গুরুত্বই দেননি।

সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার, দীর্ঘ কারাবাস এবং বিচারিক সুরক্ষার অনুপস্থিতি কোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, খসড়াটির ৩ নম্বর ধারা দ্বারা এই আইনকে অন্য আইনের ওপর ওভাররাইডিং ইফেক্ট দেওয়ার মাধ্যমে সরকার ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইনকেও কার্যত অকার্যকর করে দিতে চায়।

একদিকে সরকার নাগরিককে তথ্য সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে আরেকটি আইন দিয়ে সেই সুরক্ষাকেই অতিক্রম করার ব্যবস্থা করছে। এটি নীতি নয়; এটি আত্মবিরোধিতা।

এই খসড়া আইনের ভাষা যেন এক অদ্ভুত মানসিকতার প্রতিফলন—যেখানে প্রতিটি নাগরিক সম্ভাব্য অপরাধী, প্রতিটি ফোন সম্ভাব্য প্রমাণ, প্রতিটি ব্যাংক হিসাব সম্ভাব্য সন্দেহভাজন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি আস্থা; এই খসড়ার ভিত্তি অবিশ্বাস।

অনলাইন জুয়া অবশ্যই একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। কিন্তু কোনো সমস্যার সমাধান এমন হতে পারে না, যা সমস্যার চেয়েও বড় বিপদ তৈরি করে।

রাষ্ট্র যদি জুয়া দমনের নামে গণ-নজরদারি, বিচারবহির্ভূত প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাহীন হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়, তবে ইতিহাস বলছে—সেই ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে নয়, ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধেই বেশি ব্যবহৃত হয়।

সরকারের উচিত এই খসড়া অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নতুন করে জনপরামর্শ শুরু করা।

অন্যথায় ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ হয়তো জুয়ার বিরুদ্ধে আইন হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে না; বরং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উত্তরসূরি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে—একটি আইন, যা জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করেছিল।

খসড়াটির আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো এটি ডিজিটাল বাস্তবতার জটিলতাকে উপেক্ষা করছে।

আজ বাংলাদেশে কিংবা বিশ্বের যেকোনো দেশে অসংখ্য চলচ্চিত্র, খেলা বা সফটওয়্যার ডাউনলোডের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে ব্যবহারকারীর কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াই পপআপ বিজ্ঞাপন বা নতুন ব্রাউজার ট্যাব হিসেবে বিভিন্ন বেটিং ও জুয়ার সাইট স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়।

অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারী সেই সাইটে প্রবেশ করতে চাননি; বরং ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনব্যবস্থার কারণে তা ঘটেছে।

উদ্বেগের কারণ আরও আছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের মুঠোফোন অনানুষ্ঠানিকভাবে তল্লাশি, ব্যক্তিগত ছবি ও বার্তা পরীক্ষা, কিংবা আইনগত ভিত্তি ছাড়াই ডিভাইস অ্যাকসেস করার অভিযোগ উঠেছে।

এ বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে: তদন্তকারী সংস্থা যদি কোনো ব্যক্তির ব্রাউজিং হিস্টরি, ডিভাইস লগ বা নেটওয়ার্ক ডেটা সংগ্রহ করে, তাহলে কীভাবে নিশ্চিত হবে যে কোনো জুয়াসংক্রান্ত ওয়েবসাইটে প্রবেশ ইচ্ছাকৃত ছিল, নাকি সেটি স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞাপন, পপআপ বা রিডাইরেকশনের ফল? খসড়া আইন এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট মানদণ্ড দেয় না।

উদ্বেগের কারণ আরও আছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের মুঠোফোন অনানুষ্ঠানিকভাবে তল্লাশি, ব্যক্তিগত ছবি ও বার্তা পরীক্ষা, কিংবা আইনগত ভিত্তি ছাড়াই ডিভাইস অ্যাকসেস করার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা বিচারিকভাবে প্রমাণিত হোক বা না হোক, এ ধরনের অভিযোগের ব্যাপকতা একটি বাস্তব জন-আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

সেই পটভূমিতে ব্রাউজিং হিস্টরি, ডিভাইস ডেটা ও ডিজিটাল পরিচয় সম্পর্কিত বিপুল ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দেওয়া হলে অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়।

আইনের শাসনের মূলনীতি হলো—প্রযুক্তিগতভাবে কোনো কিছু করা সম্ভব বলেই রাষ্ট্রকে তা করার সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। বরং যত বেশি নজরদারি-ক্ষমতা দেওয়া হবে, তত বেশি বিচারিক ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, খসড়া আইনটি ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে যতটা মনোযোগ দিয়েছে, সেই ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার দিকে ততটা দেয়নি।

  • শামস নাজিব প্রথম আলোর সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার।

    * মতামত লেখকের নিজস্ব।