বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, তাতে বাংলাদেশের বিচলিত হওয়া চলবে না। অন্তর্বর্তী সরকার যেই ভুল করেছিল, নির্বাচিত সরকার সেই একই ভুল করলে বাংলাদেশ তড়িঘড়ি করে আরেকটি সুযোগ হারাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে লিখেছেন মোশাহিদা সুলতানা
২ এপ্রিল ২০২৫। হোয়াইট হাউসের গোলাপবাগানে তখন বসন্ত এসে গেছে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ভাষণে ওই দিনকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি’ উল্লেখ করে ‘লিবারেশন ডে’ বা ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিন’ ঘোষণা করেন। একটি নির্বাহী আদেশ সই করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি মোকাবিলায় তিনি ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’র কথা বলেন এবং পরে যেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি সবচেয়ে বেশি, সেই দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ১১ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ ‘রিসিপ্রোকাল’ (পাল্টা) শুল্ক আরোপ করেন।
ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, ‘আমরা এখন থেকে বুদ্ধিমান এবং আবার খুব ধনী দেশ হব।’ তাঁর দাবি, এই নতুন নীতি দেশীয় উৎপাদন বাড়াবে, চাকরি তৈরি করবে এবং ‘কর কমাতে ও জাতীয় ঋণ শোধ করতে ট্রিলিয়ন ডলার এনে দেবে’।
অনেক অর্থনীতিবিদ তখন বলেছিলেন, ‘রিসিপ্রোকাল’ শুল্ক গণনার যে ফর্মুলা ব্যবহার করা হয়েছে, তা খুবই সরলীকৃত এবং বাস্তব বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই। কেউ কেউ বলেছিলেন, এটা যত না বাণিজ্যঘাটতি কমানোর বিষয়, তার চেয়ে বেশি ভূরাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার কৌশল। আমদানিকারকেরা বলেছিলেন, এই শুল্ক তাদের নিজ পকেট থেকে যাবে। আর ভোক্তাদের কাছে যে বার্তা যায় তা হলো, বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে।
১৪ এপ্রিল পাঁচটি ছোট মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল নিউইয়র্কের একটি ওয়াইন আমদানিকারক, ভারমন্টের একটি সাইক্লিং পোশাক ব্র্যান্ড এবং ভার্জিনিয়ার একটি শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের উদ্বেগ, এসব শুল্ক তাদের টিকে থাকার জন্য মারাত্মক হুমকি। আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) অধীনে সংবিধান অনুযায়ী এসব শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়।
সব জেনেশুনেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই মামলা চলাকাল ২০২৫ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘নন–ডিসক্লোজার’ চুক্তি সই করে। চুক্তির শর্তাবলি গোপন থাকায় নাগরিকদের মধ্যে তখনই প্রশ্ন জাগে, অন্তর্বর্তী সরকারের এমন চুক্তি করার এখতিয়ার আছে কি না; বিষয়টি নিয়ে নানামুখী সমালোচনা হয়। চুক্তির কিছু অংশ ফাঁস হয়ে গেলে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে দায়ী করে চাকরিচ্যুতও করা হয়।
আগস্টের ২৯ তারিখ যখন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আপিল আদালত রায় দেন যে বৈশ্বিক শুল্কের অধিকাংশই অবৈধ, তখনই ট্রাম্পের আগ্রাসী বাণিজ্যনীতির মূল ভিত্তিতে বড় আঘাত লাগে। যে আইনের দোহাই দিয়ে ট্রাম্প শুল্ক আরোপ করেছিলেন, সেই আইন আসলে তাঁকে এসব শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। সারা বিশ্ব জেনে যায়, প্রেসিডেন্টের একতরফাভাবে এসব শুল্ক বসানোর সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে গুরুতর আইনি বিতর্ক আছে।
এরপর মামলা যখন সুপ্রিম কোর্টে যায়, তখন থেকে পাঁচ মাস ধরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির আলোচনা চালিয়ে গেছে। প্রথমত, তখনই বোঝা যাওয়ার কথা ছিল যে ওই অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করা যেকোনো দেশকে একটি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ আইনি পরিস্থিতির সম্মুখীন করবে। নিম্ন আদালতের রায় সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে বদলে যাবে, এমন আশা করাটা ছিল বোকামি।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবে এসব ট্যারিফ মার্কিন ভোক্তা ও ব্যবসার ওপর কর। এগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারে যাচ্ছিল, আবার একই সঙ্গে তা অনেক ছোট ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল। শেষ পর্যন্ত ট্যারিফগুলো অবৈধ হলে শুল্ক ফেরতের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ সহজেই জরুরি আইনের ব্যাখ্যা বদলে শুল্ককে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাতে পারে—আজ এক আইনের, কাল আরেক আইনের দোহাই দিয়ে—এই আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বাণিজ্য প্রতিশ্রুতি ও স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা কমে গিয়েছিল।
সার্বিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতির আইনি অবস্থান স্পষ্ট না হওয়া এবং কংগ্রেস আবার সুস্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ না নেওয়া পর্যন্ত, নতুন বাণিজ্যচুক্তি থেকে দূরে থাকাই যুক্তিযুক্ত ছিল। অথচ নির্বাচনের তিন দিন আগে, ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি সম্পন্ন করে। এর মাত্র দিন দশেক পরই ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রিসিপ্রোকাল ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করেন।
যে সময় দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ধীরে এগোচ্ছে, চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করছে এবং পর্যবেক্ষণ করছে অন্য দেশগুলোর পদক্ষেপ, সেই সময় বাংলাদেশকে কেন তাড়াহুড়া করে এই চুক্তি স্বাক্ষর করতে হলো? এই প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই চুক্তিকে সাফল্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
প্রশ্ন উঠেছে, চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্যমূলক এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করলেও তিনি কেন এটাকে সাফল্য হিসেবে দেখছেন? এই সাফল্যের মানদণ্ড কী?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং তাঁর ভারতে পলায়নের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারত বিরোধিতার ‘রেটরিক’ শক্তিশালী হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বস্তুনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘ভারতীয় আধিপত্য বনাম যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য’—এই দুইয়ের মধ্যে বেছে নেওয়ার তাগিদ থেকে দ্রুত চুক্তি করা হয়েছে, অবস্থাদৃষ্টে এমনটা মনে হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যেহেতু রপ্তানির একটি বড় অংশ, অন্তর্বর্তী সরকার পোশাক ব্যবসায়ীদের চাপকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়েছে।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক বেশি বেশি ধার্য করার কৌশলগত কারণই ছিল, প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদাভাবে দর–কষাকষিতে এগিয়ে থাকা। বাংলাদেশের জন্য প্রথমে ৩৭ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে ধীরে ধীরে তা নামিয়ে ২০ শতাংশ করে। শেষ পর্যন্ত শুল্ক ১৯ শতাংশ করার সময় বাণিজ্যচুক্তিতে শুধু তৈরি পোশাক পাল্টা শুল্কমুক্ত করার জন্য বেশ কিছু শর্ত দিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের শর্ত। এ ক্ষেত্রে রপ্তানির পরিমাণও নির্ধারণ করে দেবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু খোদ ব্যবসায়ীরা চুক্তির এসব শর্তের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য নানা কারণে বৈষম্যমূলক। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে মোট শুল্ক প্রায় ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে; অর্থাৎ তৈরি পোশাক রপ্তানি সুবিধার বদলে কার্যত বাড়তি শুল্কের বোঝা চাপানো হয়েছে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিচ্ছে আর নিজে পাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে সীমিত পাল্টা শুল্কছাড়; এতে স্থানীয় কৃষিশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত ও রাজস্ব আয় কমার ঝুঁকি আছে।
সার্বিকভাবে যে পোশাক ব্যবসায়ীদের কথা বিবেচনা করা হয়েছিল, তাঁদের স্বার্থরক্ষাও এখন অনিশ্চিত হয়ে গেছে। ভারতের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ শুল্ক আর বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে সাফল্যের দাবি করেছিল, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের মধ্য দিয়ে তা বাতিল হয়ে গেল। সব দেশের জন্য এখন ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর। এ থেকে বোঝা উচিত, জনতুষ্টিবাদী রেটরিক এবং কোনো বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত দেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে।
ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ-বিপক্ষ দিয়ে নয়, নিজ দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভারতের আধিপত্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে মেনে নিতে হবে, এটা কোনো গ্রহণযোগ্য কৌশল নয়। ভারত এখনো চুক্তিতে সই করেনি—এমনকি সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পরও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বসেনি, ওই অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করে।
আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে? এখন অন্য আইনের অধীনে ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় বিরাজ করছে, যুক্তরাষ্ট্র তাই চুক্তি মেনে নিতে বলছে। যেহেতু জেনেশুনেই চুক্তি করেছে, তাহলে বাংলাদেশ কেন মানবে না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরিরও চেষ্টা করছে।
চুক্তিতে উল্লেখ আছে, চুক্তি সই করার ৬০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ তা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। যেহেতু চুক্তিটি এখনো সংসদে অনুমোদন হয়নি, কাজেই বর্তমান সরকার সংসদে এই চুক্তি পর্যালোচনা করার জন্য সময় চাইতে পারে। সে ক্ষেত্রে এখনই এই চুক্তি কার্যকর হবে না।
কিন্তু এর আগেই ট্রাম্পের একজন বিশেষ দূত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর ৩ মার্চ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকায় এসেছেন। লক্ষণীয় হলো, বাণিজ্যচুক্তি ছাড়াও বাংলাদেশের সঙ্গে দুটি বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা চুক্তি—জিসোমিয়া ও আকসা সই করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, বেশি দামে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য থাকা এবং চুক্তির শর্তের কারণে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হওয়া। বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে একটি সংবেদনশীল দেশ। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করেই বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। এর ফলে এ ধরনের চুক্তি ভবিষ্যতের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই অসম বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে কী করবে? ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি, বাজেটে চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বরাদ্দও রাখা হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম কেনা শুরু হয়েছে; অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তির শর্ত পূরণে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিল।
একটি আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি বিভিন্ন সময় আলোচিত হয়েছে। এ রকম বাস্তবতায় বর্তমান সরকার এই চুক্তির ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
সম্প্রতি ইসরায়েলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রও ইরানে আক্রমণ করেছে। এই আক্রমণের বিষয়টি অন্য দেশগুলোর ওপর একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছে। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগেই ট্রাম্পের বিশেষ দূতের এই অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি, নতুন সরকারের দায়িত্ব দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করা এখন প্রধান দায়িত্ব।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য নানা কারণে বৈষম্যমূলক। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে মোট শুল্ক প্রায় ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে; অর্থাৎ তৈরি পোশাক রপ্তানি সুবিধার বদলে কার্যত বাড়তি শুল্কের বোঝা চাপানো হয়েছে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিচ্ছে আর নিজে পাচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে সীমিত পাল্টা শুল্কছাড়; এতে স্থানীয় কৃষিশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত ও রাজস্ব আয় কমার ঝুঁকি আছে।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে মার্কিন বোয়িং বিমান, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ এলএনজি ও কৃষিপণ্য কিনতে হলে নিকটবর্তী বাজার থেকে সস্তা পণ্য আমদানির সুযোগ কমে যাবে এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিদ্যুৎ, টেলিকম, অবকাঠামো, তেল, গ্যাস, বিমা ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিকে বেশি সুবিধা দিতে গেলে দেশীয় শিল্প ও কৌশলগত খাতগুলো দুর্বল হয়ে যাবে।
নিরাপত্তার নামে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো বাণিজ্যচুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আবার শাস্তিমূলক উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
এ রকম অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র এখন যে মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, তাতে বাংলাদেশের বিচলিত হওয়া চলবে না। অন্তর্বর্তী সরকার যে ভুল করেছিল, নির্বাচিত সরকার সেই একই ভুল করলে বাংলাদেশ তড়িঘড়ি করে আরেকটি সুযোগ হারাবে। বাংলাদেশের উচিত, চাপের কাছে হার না মেনে পর্যালোচনার জন্য সময় চাওয়া; আইনি জটিলতা পর্যবেক্ষণ করা, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং সর্বোপরি জাতীয় সংসদের মাধ্যমে চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধন করতে চাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়া।
মোশাহিদা সুলতানা সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই–মেইল: moshahida@du.ac.bd
মতামত লেখকের নিজস্ব