গাজায় যখন ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছিল, ঠিক তখন ইসরায়েলের হাইফা ও জেরুজালেমের মতো বড় বড় শহরে এই বিলবোর্ড ওঠে।
গাজায় যখন ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছিল, ঠিক তখন ইসরায়েলের হাইফা ও জেরুজালেমের মতো বড় বড় শহরে এই বিলবোর্ড ওঠে।

মতামত

ইরানে হামলা ও ইসরায়েলি বিলবোর্ডের ‘বারো ভাইয়া’

গত বছরের জুনের শেষের দিকে গাজায় যখন ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছিল, ঠিক তখন ইসরায়েলের হাইফা ও জেরুজালেমের মতো বড় বড় শহরে একটি বিশেষ ছবিসহ বিলবোর্ড ওঠে।

গেল শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের রাজধানী তেহরানে প্রায় দুই শ জঙ্গি বিমান নিয়ে হামলা চালায় ঠিক সে মুহূর্তেও জায়ান্ট স্ক্রিনের সেই বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছিল। বিলবোর্ডের এই ছবিটা খেয়াল করে দেখা দরকার।

ছবিতে ১২টি মাথা দেখা যাচ্ছে। মাঝখানের সবচেয়ে বড় মাথাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।

ট্রাম্পের ডানে (পাঠকের দিক থেকে বাঁয়ে) আছেন সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ বিন সালমান। তারপর একে একে রয়েছেন-মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারা (এর আগে এই ব্যক্তি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস-এর নেতা ছিলেন। তখন তাঁকে সবাই আবু মোহাম্মাদ আল-জোলানি নামে চিনত। যুক্তরাষ্ট্র তাঁর মাথার দাম এক কোটি ডলার ঘোষণা করেছিল।), লেবাননের সেনাপ্রধান (তাঁকে ‘লেবাননের প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়) জোসেফ আউন এবং জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ।

ট্রাম্পের বাঁয়ে (পাঠকের দিক থেকে ডানে) আছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

তারপর একে একে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমির শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, সুদানের ডি ফ্যাক্টো রাষ্ট্রপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল বুরহান, মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মুহাম্মদ এবং কাতারের আমির হামাদ বিন খলিফা আল থানি।

ছবির মাঝখানে শিরোনামের মতো করে লেখা ‘দ্য আব্রাহাম অ্যালায়েন্স’। তার নিচে লেখা ‘ইট ইজ টাইম ফর আ নিউ মিডল ইস্ট’। সোজা বাংলায় অর্থ দাঁড়ায়, ‘আব্রাহাম জোট: এখন সময় নতুন মধ্যপ্রাচ্যের’।

এই বিলবোর্ড টাঙিয়েছে ‘কোয়ালিশন ফর রিজওনাল সিকিউরিটি’ নামের একটি ইসরায়েলি উদ্যোগ।

জেরুজালেমসহ আরও কিছু শহরে বিশাল বিশাল পোস্টার লাগানো হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। তাঁদের পেছনে বড় ইসরায়েলি পতাকা এবং পোস্টারে লেখা: ‘ইসরায়েল প্রস্তুত।’

প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল কীসের জন্য ‘প্রস্তুত’? জবাবটা দেওয়া আছে বিলবোর্ডেই। সেখানে লেখা আছে—‘ইট ইজ টাইম ফর আ নিউ মিডলইস্ট’।

মানে, ভারতের আরএসএস সমর্থিত মোদি সরকার যেভাবে ‘অখণ্ড ভারত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে এবং বাংলাদেশসহ আশপাশের ভূখণ্ডকে নিজের ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করার ধারনাসংবলিত মানচিত্র তাদের পার্লামেন্ট ভবনে টাঙিয়ে রেখেছে; ঠিক সেভাবে গাজার পুরোটা, পশ্চিম তীরের বড় একটি অংশ এবং জর্ডান উপত্যকা দখল করে ইসরায়েলকে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বানিয়ে নেতানিয়াহু একটি ‘নিউ মিডলইস্ট’ প্রতিষ্ঠা করতে চান।

আর তার জন্য ইসরায়েল ‘প্রস্তুত’। এই লক্ষ্যে বিলবোর্ডের ওই ১২ জন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব করা ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা ‘ইব্রাহিম চুক্তি’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছেন।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এর মধ্য দিয়ে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তা হলো, যেহেতু ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমান—এই তিন ধর্মের অনুসারীরা নবী ইব্রাহিম (আ.) (পশ্চিমারা যাঁকে বলেন ‘আব্রাহাম’ বা ‘অ্যাব্রাহাম’)-এর বংশধর; সেহেতু তারা ‘ভাই ভাই’। সুতরাং ‘আব্রাহামের সন্তান’ হিসেবে তাদের মধ্যে শান্তিচুক্তি হওয়া দরকার।

এর মধ্য দিয়ে আরব দেশগুলোর কাছ থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের স্বীকৃতি আদায় করতে হবে এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ‘নরমালাইজ’ করতে হবে।

মুসলমান-ইহুদি-খ্রিষ্টান-এই তিন সম্প্রদায়েরই ধর্মীয় ভাষ্যমতে, ইসরায়েল রাষ্ট্রটি যে পয়গম্বরের নামে হয়েছে, সেই হজরত ইসরাঈলের (ফিলিস্তিনের কেনান এলাকার বাসিন্দা ইয়াকুব নবীর ডাকনাম ‘ঈসরাইল’) ১২ পুত্র ছিলেন। তাঁদের বংশধররাই আজকের সেমেটিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের পূর্বপুরুষ।

যেহেতু ইসরায়েলের প্রশাসন সাধারণত প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে তাদের ধর্মীয় ইঙ্গিতবাহী প্রতীক ব্যবহার করে, সেহেতু বিলবোর্ডের ‘১২’ সংখ্যাটিকে তারা ইসরাঈলের ১২ পুত্রের ভ্রাতৃত্বকে একটি ‘বিবলিক্যাল মেটাফোর’ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকতে পারে।

২০২০ সালে ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার ছিলেন তাঁর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সিনিয়র উপদেষ্টা। তিনি সে সময় মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কুশনার নিজে একজন কট্টর জায়নবাদী ইহুদি।

সে কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করতে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর উদ্যোগ নেন। তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেন তাঁর শ্বশুর ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তেলআবিবের মতো ওয়াশিংটনেও দেখা যায় একই ধরনের বিলবোর্ড।

আরও একজন এই আব্রাহাম অ্যাকর্ড বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি হলেন জ্যারেড কুশনারের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ বন্ধু সৌদি সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও কার্যত রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মাদ বিন সালমান।

মোহাম্মাদ বিন সালমানের নিজস্ব উদ্যোগে ২০২০ সালেই চারটি মুসলিম প্রধান দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। দেশগুলো হলো-সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং মরক্কো।

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কয়েক মাস পরই ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মরক্কোকে আইএমএফ দেয় ৫.৮ বিলিয়ন ডলার।

আর ২০২১ সালের জানুয়ারিতে সুদানকে আইএমএফ দেয় আড়াই বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংক দেয় দেড় বিলিয়ন ডলার। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে ‘নগদ নারায়ন’ হিসেবে তারা এই অর্থ সহায়তা পায়।

ওই সময় সৌদি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে বলা হয়েছিল, ধীরে ধীরে সমগ্র আরব বিশ্ব এবং আরব বিশ্বের বাইরের মুসলিম দেশগুলো যাতে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে, সে জন্য সৌদি সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো যেসব অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল মুসলিম দেশ শ্রমিক বা জনশক্তি ইস্যুতে বা অন্য কোনো কারণে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল, সেসব দেশকে এই ‘নরমালাইজেশন’ প্রক্রিয়ায় সৌদি আরব শামিল করতে কাজ করবে বলে খবর বেরিয়েছিল।

হাসিনা সরকারের পতনের পর সদ্য বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবশ্য ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ আবার ফিরিয়ে এনেছে।

খেয়াল করার মতো ঘটনা হলো, আগে বাংলাদেশের পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সসেপ্ট ইসরায়েল’ (ইসরায়েল ব্যতীত এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ)।

২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ড স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ওই বছরই শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার দেশে চালু করা নতুন ই-পাসপোর্ট থেকে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ বা ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ কথাটি বাদ দিয়েছিল। এই চুক্তি সাক্ষরের সঙ্গে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ কথাটি বাদ দেওয়ার মধ্যে সম্পর্ক ছিল নাকি এই দুটি ঘটনা ঘটার সময়কাল কাকতালীয় তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

এর কারণ সে সময় বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে এ বিষয়ে কোনো ঘোষণাও দেওয়া হয়নি। পরে ২০২১ সালের ২২ মে জেরুজালেম পোস্ট যখন এক প্রতিবেদনে বলে, ‘ইসরায়েল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে বাংলাদেশ’; তখন পাসপোর্ট থেকে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ কথাটি বাদ দেওয়ার বিষয়টি সবার নজরে আসে। (হাসিনা সরকারের পতনের পর সদ্য বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অবশ্য ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ আবার ফিরিয়ে এনেছে)

প্রশ্ন হলো: যে আরব নেতারা শপথ নিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনিদের স্বীকৃতি এবং ফিলিস্তিনকে ১৯৬৭ সালের আগের সীমানা ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা হবে না, সেই আরব দেশগুলোর নেতারা কেন শপথ ভঙ্গ করে ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মেলালেন?

বিশেষ করে ইসরায়েলের শহরগুলোতে টাঙানো বিলবোর্ডের এই আরব নেতারা এত দিন কেন নিজেদের দেশের মাটিতে সেই মার্কিন ঘাঁটি তুলতে দিয়েছেন যা কিনা মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি ইসরায়েলি স্বার্থকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে?

ওয়াশিংটন পোস্ট এক খবরে বলেছে, সৌদি যুবরাজ নিজেই ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পের কাছে লবিং করেছেন। আর তাঁর সঙ্গে ইসরায়েল তো ছিলই। তার ফল ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের যৌথ হামলা।

আর তার প্রতিক্রিয়ায় ইরান সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা।

এই দেশগুলোতে যাঁরা ক্ষমতাসীন তাঁদের প্রায় সবাই কর্তৃত্ববাদী শাসক এবং আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র। এই শাসকেরা জানেন, গণতন্ত্রহীনতার প্রশ্নে দেশের ভেতরের জনগণ এবং বাইরের দুনিয়ার নেতাদের কাছে তাঁদের নৈতিক অগ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

আমেরিকা ও ইউরোপের মতো পশ্চিমা শক্তিগুলো সেই অগ্রহনযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সহজেই দেশের জনগণকে খেপিয়ে তুলতে পারে এবং তাঁদের গদি থেকে নামিয়ে দেওয়ায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এসব আরব নেতাদের এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা তাঁদের ‘নিরাপত্তা’ দিতে এসব দেশে ঘাঁটি গড়েছে। এসব ঘাঁটিতে থাকা সামরিক শক্তির জোরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুক্তরাষ্ট্র অলিখিত কলোনিতে রূপান্তরিত করেছে। ক্ষমতাসীন আরব নেতারা বংশ পরম্পরায় ক্ষমতা ভোগ করছেন।

উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এবং ব্রিটেন-ফ্রান্সসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর সহযোগী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে কিছু আরব নেতা উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ১৯১৬ সালে ভেঙে দেওয়ায় ভূমিকা রেখেছিলেন।

ওয়াশিংটন পোস্ট এক খবরে বলেছে, সৌদি যুবরাজ নিজেই ইরানে হামলার জন্য ট্রাম্পের কাছে লবিং করেছেন। আর তাঁর সঙ্গে ইসরায়েল তো ছিলই। তার ফল ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের যৌথ হামলা।

১৯১৬ সালের মে মাসে গোপনে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তির নাম সাইকস-পিকো চুক্তি

এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে আরব ভূমিগুলো কীভাবে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হবে, সেটি আগে থেকেই ঠিক করে ফেলা।

সোজা কথায়, সাইকস-পিকো চুক্তি ছিল মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগির নকশা। চুক্তিতে ঠিক হলো: উসমানীয় খেলাফত ভাঙার পর ফ্রান্স পাবে বর্তমান সিরিয়ার উত্তরাংশ, লেবানন, দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের কিছু অংশ ও উত্তর ইরাক (মসুল অঞ্চল)।

ব্রিটেন পাবে বর্তমান ইরাকের দক্ষিণাংশ (বাগদাদ ও বসরা), বর্তমান কুয়েত এবং জর্ডান নদীর পশ্চিমে উপকূলীয় অঞ্চল (ফিলিস্তিন বাদে)।

বলা যায় সেই চুক্তির ধারাবাহিকতায় উসমানীয় খেলাফত ভেঙে ফেলতে সহায়তাকারী আরব নেতাদের ‘বখশিস’ হিসেবে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসক পদে বসানো হয়েছিল।

মূলত তাঁদের বংশধরেরা আজও পশ্চিমাদের ‘নিরপত্তা’ নিয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। উসমানীয় খেলাফতের পতনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের মাটিতে ‘ইসরায়েল’ নামক যে হাইব্রিড রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল সেই রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে এই আরব নেতারা যাবেন না, এমন একটি অলিখিত অঙ্গীকারেও তাঁরা আবদ্ধ।

কিন্তু মুসলিম উম্মাহের নৈতিক চাপ থেকে বাঁচতে এই নেতারা ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলে আসছিলেন। তবে সাম্প্রতিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’ সেই সমর্থনের জায়গাটুকুকেও মুছে দিয়েছে।

আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরান যে হামলা চালিয়েছে, সৌদি আরবসহ আরবের অন্য দেশগুলো তার জন্য ইরানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়েছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের মতো একটি সার্বভৌম দেশে ঢুকে তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করল—তা নিয়ে আরব নেতারা নিন্দা জানাননি।

এর সঙ্গে কি ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে টাঙানো সেই ১২ ‘ভাইয়ের’ বিলবোর্ডে দেওয়া বার্তার কোনো সম্পর্ক আছে?

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার খবর শোনা‌র পর ইরানের তেহরানের এনগেলাব স্কয়ার-এ মানুষ জড়ো হয়।

২.

দুনিয়ায় ৫৭টি মুসলিম দেশ আছে। কিন্তু কী এমন কারণ যে ইসরায়েলকে তাদের সবাইকে বাদ দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে লেগে থাকতে হচ্ছে।

কেনই বা যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোকে, বিশেষ করে তাদের নেতৃত্ব দেওয়া সৌদি আরবকে এইভাবে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। এই বিষয় বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে।

১৯৩৯ সাল। সবগুলো দেশের সামনে স্রেফ দুটো পথ খোলা—হয় তুমি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে; নয়তো হিটলারের পক্ষে। ওই সময় আরব ও উপসাগরীয় দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষ নিল। কিন্তু ইরানের সে সময়কার বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভি হিটলারের সঙ্গে হাত মেলালেন।

ব্যাপারটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মোটেও পছন্দ হলো না। তারা ১৯৪১ সালে চারদিক থেকে ঘিরে ইরানের ওপর হামলা চালানো শুরু করল। তারা সহজেই ইরানের ভূখণ্ড একের পর এক দখল করতে থাকল।

হেরে যেতে হবে বুঝে বাদশাহ একপর্যায়ে ব্রিটিশরাজের কাছে মাফ চাইলেন। ব্রিটিশদের দিক থেকে বলা হলো, ‘তোমাকে গদি ছাড়তে হবে এবং সেখানে তোমার ২২ বছরের ছেলে মোহান্মদ রেজা পাহলভিকে বসাতে হবে।’ পাহলভি গদিতে বসলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতের পুতুল হয়ে বসলেন।

রেজা পাহলভি ইংরেজদের এতটাই ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি চাইতেন ইরানিরা ইংরেজদের মতো পোশাক আশাক পরুক, ইংরেজদের মতোই পশ্চিমা জীবনযাপনে অভ্যস্ত হোক, আর ইরানের আদি ঐতিহ্য ভুলে যাক।

তিনি এক বিশদ সংস্কারের দিকে হাঁটলেন। তিনি ইরানে হিজাব নিষিদ্ধ করলেন। বহু মসজিদ-মাদ্রাসা বন্ধ করে দিলেন। ইরানের বড় বড় আলেমকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমা ধাঁচের পার্টির আয়োজন করতে লাগলেন।

রেজা পাহলভি ওই সময় সৌদি বাদশাহ ফয়সালকে বলেছিলেন, ‘আপনি পশ্চিমাদের মতো সৌদি আরবকে আধুনিকতায় ঢেলে সাজান।’ বাদশাহ ফয়সাল তাঁকে বলেছিলেন, ‘সৌদি আরব পশ্চিমাদের দাস না।’

কী মজার কথা, আজ সেই সৌদি আরব আজকের ইরানকে বলছে, ‘তুমি আমার মতো লিবারেল হও’, আর ইরান বলছে, তা সম্ভব না।

ওই সময় ইরানের যেসব বড় আলেম মসজিদে খুতবায় রেজা শাহ পেহেলভির কাজকারবারের সমালোচনা করছিলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি।

খোমেনি জনগণের ওপর ওতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, পাহলভির সরকার ১৯৬২ সালে আয়াতুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়।

আয়াতুল্লাহ চলে যান ইরাকে। সেখান থেকে প্যারিসে। তিনি বিদেশে বসে নিজের বক্তব্য ক্যাসেটে রেকর্ড করে তা গোপনে ইরানে পাঠাতে থাকেন। ইরানের সরকারবিরোধীরা সেইসব ক্যাসেট শুনে উজ্জীবিত হন। কিন্তু পাহলভিকে হটানো সহজ ছিল না। কারণ তাঁর পেছনে ছিল আমেরিকা।

আমেরিকার মদদ পেয়ে পাহলভি নিজেকে অজেয় ভেবে বসেছিলেন। নিজের শান শওকত পশ্চিমের বন্ধুদের দেখানোর জন্য ১৯৭৯ সালে তিনি এক জমকালো পার্টির আয়োজন করেন।

ওই সময় পর্যন্ত সেটি ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও জমকালো পার্টি। আয়োজনটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্লেমস অব পার্সিয়া’। ওই পার্টিই তাঁর কাল হয়েছিল।

আক্ষরিক অর্থে সোনা দিয়ে বানানো সিংহাসনে রেজা পাহলভি গিয়ে এমনভাবে বসলেন, যেন তিনি কোনো প্রাচীন পারস্যের একচ্ছত্র সম্রাট।

পাহলভি ঘোষণা দেন হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পারস্য সাম্রাজ্যকে পুনর্জীবীত করতে তিনি এই পার্টির আয়োজন করেছেন। তিনি নিজেকে ‘পারস্যের বাদশাহ’ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য দুনিয়ার সব বড় বড় রাষ্ট্রের নেতা ও সেলিব্রেটিকে দাওয়াত করে আনলেন।

অতিথিদের আনা নেওয়ার জন্য ছয় শ লিমোজিন গাড়ি কিনলেন। ডাইনিং হলে অতিথিদের আক্ষরিক অর্থে সোনার প্লেটি খাবার খেতে দেওয়া হলো।

আক্ষরিক অর্থে সোনা দিয়ে বানানো সিংহাসনে মোহান্মদ রেজা পাহলভি গিয়ে এমনভাবে বসলেন, যেন তিনি কোনো প্রাচীন পারস্যের একচ্ছত্র সম্রাট। বিদেশি অতিথিরা হাত তালি দিলেন।

এই পুরো দৃশ্য টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হলো। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যজর্জর ইরানিরা দেখল, তারা খেতে পায় না আর তাদের শাসক সোনার প্লেটে খাবার খান। তারা ক্ষেপে গেল।

বিদেশ থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে নতুন ভাষণের ক্যাসেট পাঠালেন। সেই ভাষণে তিনি ইরানিদের রাস্তায় নেমে আসতে ডাক দিলেন। মানুষ নেমে এল পতঙ্গের মতো।

পাহলভি বুঝলেন, তাঁর সামনে পালানো ছাড়া গতি নেই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সহায়তা চাইলেন। কিন্তু আমেরিকা কোনো সাহায্য করতে পারল না। পাহলভি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় আশ্রয় নিলেন।

১৪ বছর পর নির্বাসন থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনি দেশে ফিরলেন।

অন্যদিকে ১৪ বছর পর আয়াতুল্লাহ খোমেনি দেশে ফিরলেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে তেহরানে ৭০ লাখ লোক জড়ো হয়েছিল। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় কোনো নেতাকে স্বাগত জানানোর জন-উপস্থিতির সংখ্যার দিক থেকে এটি এখনো বিশ্বরেকর্ড হয়ে আছে।

ইমাম খোমেনি ইরানে পা রাখতেই ইরানের মাটিতে প্রথমবারের মতো রাজপথে ‘আমেরিকা মুর্দাবাদ’ ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান উচ্চারিত হলো।

খোমেনির বিপ্লবী সরকার তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের সব কর্মীকে আটক করল। খোমেনির সমর্থকেরা ঘোষণা করলেন, যতক্ষণ আমেরিকা পাহলভিকে ইরানের হাতে তুলে না দেবে ততক্ষণ এই মার্কিন নাগরিকদের ছাড়া হবে না।

এই ঘটনার পর ইরানের সঙ্গে আমেরিকার শত্রুতা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে গেল। এরপর খোমেনি আরব এবং উপসাগরীয় এলাকায় আমেরিকা ও ইসরায়েলের নানা পরিকল্পনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন।

স্বাভাবিকভাবেই ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও আমেরিকার সাপে-নেউলে সম্পর্ক তৈরি হলো।

আগেই বলেছি, সৌদি আরবসহ আজকের আরব বিশ্বের প্রায় সব দেশে যে শাসকেরা রয়েছেন, তাঁদের পূর্বসূরিরা নিজেদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিয়ে ক্ষমতায় বসেননি।

তাঁদের ব্রিটিশ-আমেরিকান শক্তিগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আনুগত্যের বিনিময়ে গদিতে বসিয়েছিল। আনুগত্যের সেই লিগ্যাসি এসব আরব নেতাদের মধ্যে এখনো প্রবলভাবে রয়ে গেছে। এ কারণে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কখনোই মুখ খোলেন না।

বাস্তবতা হলো, সৌদি আরবের শাসকদের গদির নিরাপত্তা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এটিকে পশ্চিমারা কাজে লাগাচ্ছে। ওয়াশিংটন চায় সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক খোলাখুলিভাবে স্বাভাবিক হোক।

এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী আঞ্চলিক জোট শক্তিশালী করা যাবে। আর সৌদি আরবও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে নিজের নিরাপত্তার জন্য সহায়ক মনে করছে। এর জন্য সৌদি সরকার বলা যায় সবকিছুই করতে রাজি আছে।

একটা সময় ছিল যখন সৌদি বাদশাহ ফয়সাল ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিতে গিয়ে তিনি আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রবল শত্রুতায় জড়িয়েছিলেন। নিজের ভাতিজার গুলিতে বাদশাহ ফয়সালের নিহত হওয়ার পেছনে সিআইএ-মোসাদের হাত ছিল বলেও শোনা যায়।

ক্রিস্টিস নামের একটি নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ‘সালভাতর মুণ্ডি’ নামের একটি পেইন্টিং ৪৫০.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করে। আজ পর্যন্ত এত দামে কোনো পেইন্টিং বিক্রি হয়নি। আর এত দাম দিয়ে এই ছবিটি কিনে নেন মোহাম্মাদ বিন সালমান।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সৌদি রাজপরিবারে শাসকের বদল হয়েছে। সৌদি নীতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে।

নীতির দিক থেকে নজিরবিহীন পরিবর্তন এনেছেন আজকের সৌদি বাদশাহ সালমানের ছেলে মোহাম্মাদ বিন সালমান। সংক্ষেপে অনেকে তাঁকে ‘এমবিএস’ বলেন। তিনি সৌদি আরবকে ‘আধুনিক’ প্রমাণে এক রকম মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

এমবিএস মনে করেন, সৌদি আরবকে আরব বিশ্বের বাইরে, পশ্চিমা বিশ্বেও প্রভাব রাখতে হবে। পশ্চিমের সঙ্গে পশ্চিমা ভাবধারায় তাল মেলাতে হবে।

ক্রিস্টিস নামের একটি নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর নিউইয়র্কে ‘সালভাতর মুণ্ডি’ নামের একটি পেইন্টিং নিলামে বিক্রি করেছিল।

এটি যিশুখ্রিষ্টের একটি ছবি। এই যিশুর চেহারার সঙ্গে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার মতো। এটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা বলে ধারণা করা হয়।

ছবিটি নিলামে ৪৫০.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়। আজ পর্যন্ত এত দামে কোনো পেইন্টিং বিক্রি হয়নি। আর এত দাম দিয়ে এই ছবিটি কিনে নেন মোহাম্মাদ বিন সালমান।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ‘সালভাতর মুণ্ডি’ এত দাম দিয়ে কেনাটা শুধুমাত্র একটি শিল্প বিনিয়োগ না।

এটি এমবিএসের আন্তর্জাতিক, আধুনিক ও আংশিকভাবে পশ্চিমা ভাবধারার প্রতীকী প্রকাশ। যিশুর ছবি কেনার মধ্যে দিয়ে তিনি খ্রিষ্টিয়ানিটির প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা দিয়েছেন বলেও ধারণা করা হয়।

২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল সৌদি আরবের জেদ্দার কর্নিশ সার্কিটে মার্কিন পপ তারকা জেনিফার লোপেজ একটি কনসার্টে পারফর্ম করছিলেন।

গত বছরের এপ্রিলে যখন গাজায় ভয়াবহ আক্রমণ চলছিল তখন ১৯ এপ্রিল সৌদি আরবের জেদ্দার কর্নিশ সার্কিটে অনুষ্ঠিত ফর্মুলা১ গ্র্যান্ড প্রি ইভেন্টের অংশ হিসেবে মার্কিন পপ তারকা জেনিফার লোপেজ একটি কনসার্টে পারফর্ম করছিলেন।

ফর্মুলা১ গ্র্যান্ড প্রি ইভেন্টের পরপরই তিন দিনব্যাপী কনসার্ট সিরিজ চলে। এই অনুষ্ঠানে লোপেজ ছাড়াও উশার ও ডিপলোসহ অনেক আন্তর্জাতিক তারকা পারফর্ম করে গেছেন।

এই ধরনের নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে এমবিএস সৌদি সরকারের বিশ্বদর্শন তো বটেই, এমনকি আরব দর্শনেরও খোলনলচে বদলে দিচ্ছেন। তিনি সৌদি অর্থনীতিকে তেল নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে চান।

সেখানে বিশ্বমানের শিল্প, প্রযুক্তি খাত যোগ করতে চান। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের উত্থান সৌদি নীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেছে। ফলে সৌদি এখন ইসরায়েলকে সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে।

যেহেতু ইসরায়েলের প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, কৃষি, সাইবার নিরাপত্তা, ও উদ্ভাবনী খাত বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে।

সেহেতু সৌদি আরব মনে করছে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে এই প্রযুক্তিগত ও বিনিয়োগ সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ প্রকল্প ত্বরান্বিত করা যাবে।

আমরা ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে দেখি না; আমরা দেশটিকে একটি সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখি।
দ্য আটলান্টিক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মাদ বিন সালমান

২০১৮ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সিবিএস টেলিভিশনের প্রোগ্রাম সিক্সটি মিনিটস-এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় উপস্থাপক নোরা ও’ডোনেল মোহাম্মাদ বিন সালমানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি যে সংস্কারের পথে হাঁটছেন, তা থেকে কেউ কি আপনাকে থামাতে পারবে?’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘একমাত্র মৃত্যু আমাকে থামাতে পারবে।’

এমবিএস মনে করেন, ইসরায়েলের বিরোধিতা করলে পশ্চিমের দিক থেকে যে চাপ আসবে তা তাঁর ভিশন-২০৩০-কে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে ফিলিস্তিন নিয়ে তিনি উচ্চবাচ্য করতে চান না। ২০২২ সালে দ্য আটলান্টিক পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবিএস বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে দেখি না; আমরা দেশটিকে একটি সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখি।’

সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এমবিএস ইতিমধ্যেই কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন: ইসরায়েলি বিমানগুলোকে সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

নেতানিয়াহু যে ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে দৃশ্যত সৌদি সরকারের আপত্তি নেই। আর সৌদির আপত্তি না থাকলে আরব জাহানের বাকি শাসকদের আপত্তি জানানো কঠিন।

মার্কিন টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসন সম্প্রতি ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির সাক্ষাৎকার নেন। সেখানে হাকাবি বলেছেন, বাইবেলে ইহুদিদের জমি ঠিক করাই আছে। তাদের জন্য প্রতিশ্রুত ভূমি রয়েছে। সে কারণে ইসরায়েল যদি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সীমানা বাড়ায়, এমনকি গোটা মধ্যপ্রাচ্য দখলে নিয়ে নেয়, তা হলেও তো অসুবিধার কিছু দেখি না।

আসলে কার্লসন-হাকাবি সাক্ষাৎকার তাই কেবল এক রাষ্ট্রদূতের দৃষ্টিভঙ্গি নয়; এটি এক বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রকল্পের ইঙ্গিত। সেই প্রকল্পের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ইরান। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে এ বাধা ইসরায়েলকে সরাতেই হবে। তার জন্য একযোগে কাজ করবে ‘বিলবোর্ডের বারো ভাইয়া’!

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
    ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com