অভিমত–বিশ্লেষণ

আপনার বাচ্চাকে অঙ্কটার সঙ্গে একটু থাকতে দিন

শিশুদের গ্যাজেট বা স্ক্রিন ব্যবহার নিয়ে আগে থেকেই নানা আপত্তি আছে। অনেক দেশে আইন করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে এআইয়ের ব্যবহার। শিক্ষায় এআইয়ের ব্যবহার কীভাবে হবে, এর ইতিবাচক–নেতিবাচক প্রভাব, স্কুলে এআই ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নীতিও কেমন হতে পারে, তা নিয়ে লিখেছেন মুনির হাসান

মুনির হাসান

৪ সেপ্টেম্বর সকালে প্রথম আলো হাতে নিয়ে চোখে পড়ল নিউইয়র্কের মেয়রের একটি ঘোষণা। নিউইয়র্ক শহরের সরকারি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী আগামী এক বছর এআই ব্যবহার করতে পারবে না। মেয়র জোহরান মামদানি বলছেন, শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার ক্ষমতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক রক্ষাই এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য। এক বছর পর এর প্রভাব মূল্যায়ন করে ঠিক করা হবে স্কুলে এআই ব্যবহারের ভবিষ্যৎ নীতি।

পড়তে পড়তে মনে পড়ল আগস্ট মাসের শুরুতে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ ম্যাথ ও সায়েন্স অলিম্পিয়াডের (বিডিএমএসও) এবারের আয়োজনের সময় অভিভাবকদের সঙ্গে কথোপকথনের কথা। একজন অভিভাবক তাঁর ছেলের গণিতের পারদর্শিতার কথা বলতে গিয়ে বললেন, তাঁর ছেলে যখনই কোনো অঙ্ক সমাধান করতে পারে না, তখন চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে সেটি ‘করে ফেলে’ বটে! বাচ্চাদের অঙ্কও তাহলে এখন চ্যাটজিপিটি করে দিচ্ছে। 

কিন্তু কাজটা কি ঠিক হচ্ছে?  

শিশুরা ভুল না করলে কীভাবে শিখবে

অভিভাবকদের বলেছি, বাচ্চারা যখন কোনো অঙ্ক বা সমস্যা সমাধান করতে বসে, তখন তাদের একটু সময় দিন। না পারলে সঙ্গে সঙ্গে সমাধানটা বলে দেবেন না। এমনকি কীভাবে শুরু করতে হবে, সেটাও সব সময় বলে দেওয়ার দরকার নেই। বাচ্চাকে সমস্যার সঙ্গে একটু থাকতে দিন।

সে হয়তো ভুল করবে। একভাবে চেষ্টা করে হবে না, অন্যভাবে করবে। ছবি আঁকবে, আঙুলে গুনবে। একটা রাস্তা ধরে কিছুদূর গিয়ে বুঝবে, এই পথে হবে না। আবার শুরু করবে। দশ মিনিট পরেও হয়তো উত্তর বের করতে পারবে না।

এমনটা হলে আমাদের বড়দের তখন অস্থির লাগে। মনে হয়, আহা, এইটুকু বুঝতে পারছে না! একটু বলে দিলেই তো হয়।

কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা অন্য রকম। একটা অঙ্কের সঠিক উত্তর বের করাটাই সব সময় শেখা নয়। উত্তর খুঁজতে গিয়ে শিশুটি যে অনুমান করছে, পরীক্ষা করছে, ভুল করছে, ভুলটা বুঝতে পারছে এবং নতুন একটা পথ খুঁজছে—শেখাটা অনেক সময় ঘটছে এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেই।

আজকে নিউইয়র্কের মেয়র মনে করিয়ে দিলেন এআইয়ের সময়ে এ কথাগুলোই নতুন করে জোরেশোরে ভাবতে হবে।

প্রশ্নের সঙ্গে থাকাটা কেন জরুরি 

কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের অনলাইন বাছাই পরীক্ষা ছিল। ইচ্ছা করে আমরা প্রতিটি ক্যাটাগরিতে এমন কিছু সমস্যা রেখেছি, যা কিনা সেই ক্যাটাগরির জন্য প্রযোজ্য নয়। আমরা দেখলাম, অনেক শিক্ষার্থীই এআই ব্যবহার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবকের সহযোগিতাতেই সেটি হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিতে কারও কারও ১৫ মিনিট সময়ও লাগেনি!

এত কম সময়ে প্রশ্নগুলো ঠিকমতো পড়া, বোঝা, চিন্তা করা এবং উত্তর দেওয়া সম্ভব কি না, সেটিই একটি প্রশ্ন। মনে করার সংগত কারণ আছে, কোনো কোনো শিক্ষার্থী প্রশ্নের ছবি তুলে এআইকে দিয়েছে এবং পাওয়া উত্তরটি জমা দিয়েছে। প্রথম প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই পরীক্ষার সততা নিয়ে। এভাবে বাছাই পরীক্ষা নেওয়া যাবে কী করে? ভবিষ্যতে আমাদের কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে? কিন্তু পরে আমার কাছে তার চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন মনে হয়েছে। 

শিশুটি প্রশ্নটির সঙ্গে থাকল কখন?

১৫টি প্রশ্ন থেকে সে হয়তো ১৫টি উত্তর পেয়েছে। কিছু নম্বরও পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্নগুলো নিয়ে যদি তাকে ভাবতেই না হয়, তাহলে ওই ১৫টি প্রশ্ন থেকে সে কী শিখল?

বাড়ির কাজে নম্বর বাড়ছে, শেখাও কি বাড়ছে?

সম্প্রতি চীনের একটি বড় গবেষণা এ প্রশ্নটিকে আরও জোরালো করেছে। সেখানে সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ২৬ হাজার ৮১১ শিক্ষার্থীর ৩০ মাসের তথ্য গবেষকেরা বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা যাচ্ছে, এআই ব্যবহারের পর বাড়ির কাজের নম্বর বেড়েছে ১৮ শতাংশ এবং বাড়ির কাজ করতে সময় কমেছে ৩০ শতাংশ। 

গণিত উৎসবে মন দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে এক শিক্ষার্থী।

কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে দেখা যাচ্ছে একই শিক্ষার্থীর মাসিক পরীক্ষায় নম্বর ২০ শতাংশ কমেছে। বলা বাহুল্য পরীক্ষায় এআই ব্যবহারের সুযোগ নেই। চূড়ান্ত পরীক্ষাতেও একই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বাড়ির কাজের খাতায় যে উন্নতি দেখা গেছে, তার সবটা শিক্ষার্থীর নিজের শেখায় রূপান্তরিত হয়নি। গবেষণাটি এখনো পূর্ণাঙ্গ হয়নি, তবে সতর্ক হওয়ার মতো প্রশ্ন এটি অবশ্যই তুলেছে।

শিক্ষাবিজ্ঞানে প্রোডাক্টিভ স্ট্রাগল বা শেখার জন্য চেষ্টা করা বলে একটি ধারণা আছে। সব চেষ্টা অবশ্যই ফলপ্রসূ নয়। কোনো কিছু না বুঝে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা শেখা নয়। কিন্তু নিজের সামর্থ্যের একটু ওপরে থাকা সমস্যার সঙ্গে লড়াই করা, ভুল করা, ফিডব্যাক পাওয়া, আবার চেষ্টা করা—এ কষ্টটুকু শেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এআইয়ের একটা বিপদ হলো, চাইলে সে এই মধ্যবর্তী অংশটুকুই নাই করে দিতে পারে। কারণ, সে সরাসরি উত্তর দিতে পারে। মাঝখানে প্রশ্ন বোঝা নেই, অনুমান নেই, ভুল নেই, আবার চেষ্টা করাও নেই। কাজ শেষ। শেখা?

গণিত শেখা নিয়ে একটি গবেষণা

আরেকটি গবেষণার কথা বলা যায়। পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা তুরস্কের নবম থেকে একাদশ শ্রেণির এক হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে
গণিত শেখার একটি গবেষণা করেছেন। শিক্ষার্থীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়।

একটি দল এআই ছাড়া প্রচলিত পথে অনুশীলন করেছে, দ্বিতীয় দল ব্যবহার করেছে চ্যাটজিপিটির মতো এআই। আর তৃতীয় দলকে দেওয়া হয়েছে একটি বিশেষভাবে উন্নয়নকৃত এআই টিউটর, যেটি সরাসরি উত্তর না দিয়ে সংকেত, পাল্টা প্রশ্ন করে। দেখা গেল অনুশীলনের সময় জিপিটি ব্যবহারকারীদের ফল এআই ছাড়াদের তুলনায় ৪৮ শতাংশ ভালো হলেও পরে এআই সরিয়ে পরীক্ষা নিলে তারাই এআই ছাড়াদের চেয়ে ১৭ শতাংশ খারাপ করেছে। অন্যদিকে তৃতীয় গ্রুপটি যারা কিনা এআই টিউটর ব্যবহার করেছে, তাদের ওপর এত নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। এই পার্থক্যটা আগামী দিনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ দুই গবেষণা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এআইকে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এআই কি আমার হয়ে চিন্তা করছে, নাকি আমাকে চিন্তা করতে সাহায্য করছে? প্রথম ক্ষেত্রে এআই খুবই পটু, দক্ষ, উত্তর দেওয়ার মেশিন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এটি হয়ে উঠতে পারে একটি দক্ষ টিউটর বা চিন্তার সঙ্গী।

শিশুর কাজ শিশুকেই করতে দিন। তাকে ভাবতে দিন। চিন্তা করতে দিন। এর মধ্যে দিয়েই সে শিখবে।

চিন্তা করার কাজটাও এআইকে দিয়ে দিচ্ছি?

বেশ কিছুদিন আগে করা ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটির) একটি ছোট গবেষণার কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। সে গবেষণায় তিনটি দলকে রচনা লিখতে দেওয়া হয়।

একটি দল এলএলএম বা এআই ব্যবহার করেছে, দ্বিতীয় দলটি সার্চ ইঞ্জিন বা গুগল ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে তৃতীয় দলটি কোনো ডিজিটাল টুল ব্যবহার করেনি। রচনা লেখার সময় শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের কার্যাবলি লক্ষ করা হয়। দেখা গেল যারা কোনো ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করেনি, তাদের মস্তিস্ক অন্যদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল। এমনকি এলএলএম ব্যবহারকারীদের নিজেদের লেখা পরে মনে করার ক্ষেত্রেও তুলনামূলক সমস্যা দেখা গেছে।

গবেষণাটি ছোট ও প্রাথমিক বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়তো নেওয়া যায় না। কিন্তু আগের প্রশ্নটিই থেকে যাচ্ছে—কাজ সহজ করতে গিয়ে আমরা কি চিন্তা করার কাজটাও এআইকে দিয়ে দিচ্ছি?

এ ক্রান্তিকালে শুধু শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের নিয়ম শেখালেই হবে না। শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে। আগে সন্তান একটা অঙ্ক না পারলে হয়তো মা–বাবা পাশে বসে অঙ্কটা করে দিতেন। এখন আরও সহজ। মুঠোফোন বের করে ছবি তুলে এআইকে দিলেই হলো। দুই ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য ভালো। আমরা সন্তানকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু সাহায্য করা আর তার হয়ে কাজটা করে দেওয়া এক জিনিস নয়।

একজন ভালো শিক্ষক সব সময় উত্তরটা বলে দেন না। তিনি হয়তো জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কীভাবে শুরু করার কথা ভাবছ?’ অথবা বলেন, ‘এই জায়গাটা আরেকবার দেখো।’ কখনো শুধু একটা ধারণা দেন। 

এআইয়ের ব্যবহারও হয়তো তেমন হতে পারে। কোনো অঙ্ক নিয়ে তাকে বলা যায়, ‘উত্তরটা বলে দিয়ো না। আমাকে একটা ধারণা দাও।’ নিজের সমাধান দেখিয়ে বলা যায়, ‘কোথায় ভুল করেছি, শুধু সেটা বলো।’ কিংবা বলা যায়, ‘আমাকে এমন একটা প্রশ্ন করো, যাতে পরের ধাপটা আমি নিজেই বের করতে পারি।’

মূল চ্যালেঞ্জ এআই থেকে দূরে রাখা নয়

শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করবে কি না, সেই বিতর্কের সময় সম্ভবত ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে। সে নিউইয়র্কের মেয়র যা–ই বলুন।
তিনি স্কুলে ঠেকাতে পারলেও বাসায় ঠেকাতে পারবেন না। শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করছে এবং আরও বেশি করবে—বাড়ির কাজ করবে, বিজ্ঞান শিখবে, অঙ্ক করবে, রচনা লিখবে, প্রোগ্রামিং করবে।

কাজেই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ এআই থেকে তাদের দূরে রাখা নয়। বরং এআই থাকার পরও চিন্তা করার অভ্যাসটা কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সেটা নিয়ে ভাবা। 

বিডিএমএসওর সেই অভিভাবকদের কাছে ফিরে যাই। বাচ্চাটি একটা অঙ্ক নিয়ে বসে আছে। পারছে না। ভুল করছে। আঙুলে গুনছে। কাগজে আঁকিবুঁকি করছে। আপনার মনে হচ্ছে একটু বলে দিলেই তো হয়ে যায়।

বলবেন না।

উত্তর পেতে তার একটু দেরি হোক। কারণ, উত্তর পাওয়ার আগের ওই সময়টুকুতেই হয়তো তার আসল শেখাটা হচ্ছে।

বাচ্চাকে অঙ্কটার সঙ্গে একটু থাকতে দিন।

মুনির হাসান প্রথম আলোর পরামর্শক ও বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি

* মতামত লেখকের নিজস্ব