আমাদের সমাজে প্রবাদবাক্যের ছড়াছড়ি। সম্ভবত অন্যান্য সমাজেও এ রকম আছে। প্রতিটি বাক্য বা প্রবচনের উৎস হচ্ছে সমাজের কোনো না কোনো অসংগতি কিংবা উৎসব, সমস্যা কিংবা সমাধান, ভালো কিংবা মন্দ। বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাস (ডিসেম্বর-জানুয়ারি), নতুন ধান ঘরে আসে, পিঠাপুলি ও খেজুরের রসের উৎসব হয়। গৃহস্থের কাছে এটি খুশির সময়। একই সময়ে দিনমজুর বা গরিব মানুষের কাজ থাকে না। তীব্র শীতে খাবার ও কাপড়ের অভাব দেখা দেয়। তাদের কাছে এই মাস মানেই দুর্দশা।
একই পরিস্থিতি বা সময়ে একজনের জন্য আনন্দ ও সমৃদ্ধি আসে, আরেকজনের জন্য তা হয়ে ওঠে দুঃখ ও ধ্বংসের কারণ। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির উক্তি নয়; বরং বাংলার কৃষিজীবী সমাজ থেকে উদ্ভূত একটি প্রবাদ। এ থেকে একটা উপসংহার টানা যায়—সমাজে বৈষম্য আছে; একই সময়ে কারও সুখ, কারও দুঃখ। অর্থাৎ একের লাভ, অন্যের ক্ষতি। এ পটভূমিতেই তৈরি হয়েছে প্রবাদবাক্য—কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ।
আমাদের দেশে সেতু মানে উন্নয়ন। নতুন সেতু তৈরি হলে যাত্রীদের সুবিধা হয়, কিন্তু নৌকার মাঝি কাজ হারায়। আমাদের দেশে এ রকম অনেক পেশা হারিয়ে গেছে। এখন আর ঢেঁকি নেই, ঘানি নেই, বলদে টানা লাঙল নেই। এটাও ‘কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ’। তারপরও সমাজ থেমে থাকে না। বিকল্প তৈরি হয়ে যায়। এই যেমন শহরাঞ্চলে পোশাক তৈরির কারখানা যত তৈরি হচ্ছে, গ্রামের বিনা পারিশ্রমিকের গার্হস্থ্য নারী মজুরেরা শহরে এসে কারখানায় চাকরি নিচ্ছেন। এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়। আমি অনেককে বলতে শুনেছি, গার্মেন্টস সেক্টরে শ্রম শোষণের মাত্রা খুব বেশি। মজুরি যা মেলে, তাতে জীবন চলে না। আমি বুঝতে পারি, এটা প্রমাণ করতে পারলে তার ভালো একটা থিসিস হয়। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুশি হন। কে না জানে, আমাদের সমাজে নানাভাবে দারিদ্র্য–বাণিজ্য হয়। ইউরোপে হতদরিদ্র নেই। তারা এটা নিয়ে গবেষণা করতে আমাদের দেশে আসে।
এর উল্টো দিকও আছে। গ্রামে যে নারীর জীবন ছিল দাসত্বের, শহরের কারখানায় এসে সে স্বাধীনতার স্বাদ পায়। তার হাতে কিছু কাঁচা টাকা আসে। এটা দিয়ে সে তার পছন্দের জিনিস কিনতে পারে। ভোর হলেই দেখা যায় শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে নারী, হাতে ঝুলছে টিফিন ক্যারিয়ার বা খাবারের পুঁটুলি, ঋজু ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে কর্মস্থলের দিকে। ৫০ বছর আগেও এ দৃশ্য দেখা যেত না। তারা বাঁধা পড়ে ছিল সনাতন গার্হস্থ্য জীবনে।
একজন আদর্শ কৃষকের কী থাকে? একখণ্ড জমি, এক জোড়া হালের বলদ, আর একটা বউ। স্বামী-সন্তানের সেবা করবে, কোনো কাজে স্বামী নারাজ হলে তার কিল-চড়-লাথি খাবে। তারপর একদিন মরে যাবে। সে যে একটা মানুষ, এটি প্রথম সে আবিষ্কার করে একটা কারখানায় এসে। ইউরোপে এ জিনিসকেই বলা হয়েছে শিল্পবিপ্লব, যেখানে হাজার বছরের গ্রামীণ সমাজকাঠামো ভেঙেচুরে খানখান হয়ে গেছে। মানুষ ভূস্বামীর দাসত্ব থকে পালিয়ে শহরের বস্তিতে উঠেছে। ৩০০ বছরের ব্যবধানে তারা এমন একটা সমাজ তৈরি করেছে, যেখানে বিলিয়নিয়ার থাকলেও ভিক্ষুক নেই। আমাদের দেশে গৃহকর্মীর দাম এত চড়া যে অনেককে গার্মেন্টস সেক্টরকে গালাগাল করতে দেখি, যারা মনে করে এই কারখানাগুলোর কারণে এখন সস্তায় গৃহকর্মী পাওয়া যায় না। কী সর্বনাশ!
এটাই জীবনের বৈপরীত্য—কারও লাভ, কারও ক্ষতি। একজন ব্যবসায়ী নতুন প্রযুক্তি এনে বাজার দখল করে, তার লাভের অঙ্ক বাড়ে। কিন্তু ছোট দোকানদার ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। শহরে নতুন বাস এলে যাত্রীদের সুবিধা হয়, রিকশা-টেম্পোওয়ালা কাজ হারায়। যুদ্ধের ময়দানে বিজয়ীর পতাকা ওড়ে, কিন্তু পরাজিতের ঘরে শোকের ছায়া নেমে আসে।
দেশে যখন একটা রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে, অনেক সময় তার ঝাপটায় চারদিক তছনছ হয়ে যায়। রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা মানে শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর হতাশা। একদল মানুষের কাছে এটি মুক্তির বার্তা, অন্যদের কাছে ভয় আর ক্ষতির প্রতীক। যেমন ঝড়ের পর গাছ ভেঙে পড়ে, আবার নতুন কুঁড়িও জন্ম নেয়—তেমনি রাজনৈতিক ঝড় সমাজকে ভেঙে আবার গড়ে তোলে।
ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়, রাজনৈতিক ঝড়ঝাপটা কখনো স্বাধীনতার জন্ম দিয়েছে, কখনো আবার বিভেদের দেয়াল তুলেছে। আন্দোলন, বিপ্লব, নির্বাচন—সবই এই ঝড়ের অংশ। মানুষের কণ্ঠস্বর যখন জোরে ওঠে, তখন পুরোনো কাঠামো ভেঙে যায়, নতুন পথ তৈরি হয়।
তবে ঝড়ের মতোই রাজনীতির ঝাপটা সাময়িক। ঝড় শেষে আকাশ যেমন পরিষ্কার হয়, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সমাজে আসে স্থিতি। কিন্তু সেই স্থিতি কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করে মানুষের স্বভাব আর চেতনার ওপর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও নৃশংসতা দেখে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। লিখেছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’ নামে একটি প্রবন্ধ, যার দুটি লাইন এ রকম: আজ মানবতার মহাসমুদ্রের মহাসংকটের দিনে আমাদের আশা, আমাদের বেদনা এক সুতোয় বাঁধা।
একটা বড় রকমের পালাবদল ঘটে গেলে কী হয়, তা আমরা আজ চোখের সামনে দেখছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একদল জমি হারিয়েছিল। তাদের ফেলে যাওয়া জমিটি ফলবাগানে ভরে ওঠেনি। বছরের পর বছর জমে থাকা হিংসা, বিদ্বেষ, দলান্ধতা এখনো থিকথিক করছে। একটা দল পালিয়েছে, লুকিয়েছে, ধরা পড়ে পিটুনি খাচ্ছে, আর আরেকটা দল তাদের দখলে থাকা সবকিছুতে হানা দিচ্ছে, যা পারছে দখল করছে—বাগান, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ, টিভি চ্যানেল, মসজিদের দানবাক্স, সরকারি সংস্থার চেয়ার। এ প্রসঙ্গে রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতার কটি লাইন উদ্ধৃত না করে পারছি না:
দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অবধি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে
অবশেষে যথাক্রমে গাছপালা, নদী-নালা,
গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত, নর্দমার জলের প্রপাত,
চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব-প্রধান নারী,
উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ি—
আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ।
সমাজের একটি অংশ অনেক দিন লুটে খেয়েছে। আজ তারা নেই। তার জায়গায় এসেছে আরেক দল। একটা বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি।
আমার এক বন্ধু ব্যবসা করে খায়। একসময় ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিল। ব্যবসা করলেও সংস্কৃতি বিসর্জন দেয়নি। তার সততা নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তোলেনি। তার কাছে একজন একটা কার্ড পাঠিয়েছে। তথাকথিত বিজনেস কার্ড। কার্ডে পেশার উল্লেখ নেই। আছে কোনো একটি দলের সদস্য পরিচয়। বন্ধুটি খোঁজ নিয়ে দেখল, সে একটি দলের জেলা কমিটির ৪৪ নম্বর সদস্য। লোক দিয়ে কার্ড পাঠিয়ে দিয়েছে। চাঁদা চায়। বন্ধুটি বলল, চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করব না। দরকার হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেব। বললাম, আপনি এলাকার কোনো নেতা-মন্ত্রীকে বলুন। তাঁদের চেনেন নিশ্চয়ই। জবাবে সে বলল, বলে লাভ নেই। তারা কিছু করবে না। এই রাজনীতিটাই দাঁড়িয়ে আছে চাঁদাবাজির ওপর।
তারপর সে আক্ষেপ করে বলতে লাগল, এ কেমন দেশে বাস করছি আমরা। আমার শ্রম আর পুঁজি দিয়ে ব্যবসা করব। সে জন্য চাঁদা দিতে হবে? আমার জমিতে আমার টাকায় বাড়ি বানাব। সে জন্য চাঁদা দিতে হবে? তারপর সে মোক্ষম কথাটা বলল—এরা হচ্ছে সমাজের বর্জ্য—বায়োলজিক্যাল ওয়েস্ট। কথাটা আমার মনে ধরল। এরা পঙ্গপালের মতো জন্মায়। এদের নির্মূল করা যায় না। তারপর সে এমন একটা সমাধানের কথা বলল, শুনে আমার এত দিনের পূর্বধারণা ধাক্কা খেল। বলল, আমাদের দরকার একজন ক্রুয়েল অনেস্ট ডিক্টেটর। সে নিষ্ঠুর হবে, কিন্তু চোর, বদমাশ, লুটেরা হবে না। সে এসব জঞ্জাল ধ্বংস করবে। এ ছাড়া আর উপায় নেই।
আমি তো থ। আমার মগজে–মননে আছে টেমস নদীর পাড় থেকে তুলে আনা ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসি। আমার মুখে জবাব ছিল না।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব