কোয়েটায় একটি পুলিশ স্টেশনে সশস্ত্র যোদ্ধাদের হামলায় বিধ্বস্ত যানবাহন
কোয়েটায় একটি পুলিশ স্টেশনে সশস্ত্র যোদ্ধাদের হামলায় বিধ্বস্ত যানবাহন

আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণ

বেলুচিস্তানে সশস্ত্রতা উসকে দিল কারা

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানজুড়ে সম্প্রতি দ্রুতলয়ে গেরিলাযুদ্ধের বিস্তার ঘটছে। সেখানকার পরিস্থিতির পূর্বাপর বিশ্লেষণ করেছেন আলতাফ পারভেজ। দুই পর্বের লেখায় আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব

স্বাধিকার আন্দোলনে বালুচদের অনেকগুলো সংগঠন সক্রিয় হলেও এবারের গেরিলা সহিংসতায় বেশি নাম এসেছে বিএলএ বা বেলুচিস্তান লিবালেশন আর্মির। এখানকার সব সংগঠনের মানবসম্পদের বড় অংশ আসছে বিএসও বা বালুচ স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন থেকে। ১৯৬৭ সালে এই সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন ন্যাপ (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি) সমর্থক তরুণেরা। প্রথম সভাপতি ছিলেন আবদুল হাই বেলুচ। 

ন্যাপের গঠনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মাওলানা ভাসানীসহ অনেকের সক্রিয়তা ছিল। পরে অবশ্য বামপন্থীদের আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে উভয় পাকিস্তানে ন্যাপ ভেঙে যায়। ন্যাপের পশ্চিম পাকিস্তান অংশে পশতুনদের প্রাধান্য ছিল। ফলে বালুচদের মাঝে ন্যাপ বেশি দিন প্রাধান্য ধরে রাখতে পারেনি।

তবে তরুণদের মাঝে বিএসও এখনো বেশ জনপ্রিয়। এর অনেকগুলো উপদল রয়েছে—যার মধ্যে ‘বিএসও-আজাদ’কে স্বাধীনতার প্রশ্নে সবচেয়ে আপসহীন বলে মনে করা হয়। ড. আল্লাহ নজরের নেতৃত্বে এই অংশের বিকাশ। এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্রাম বেলুচ। গত দশকে নারী শিক্ষার্থী কারিমা বেলুচের বিএসও সভাপতি হওয়া বেশ নজর পেয়েছিল বিশ্বজুড়ে। বিবিসি তাঁকে ২০১৬ সালের ‘গুরুত্বপূর্ণ ১০০ নারী’র তালিকায় যুক্ত করে। কানাডায় নির্বাসিত থাকাবস্থায় ২০২০ সালে তিনি নিহত হন। 

বর্তমানে বেলুচিস্তানের বিদ্যাপীঠগুলোতে কারিমা মেয়েদের কাছে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার বড় এক উৎস। তবে ছাত্ররাজনীতির ধরনও এখন পাল্টে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ঘরবাড়ি ছেড়ে হঠাৎ উধাও হয়ে গোপন রাজনৈতিক জীবনে চলে যাচ্ছে। অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণীও গেরিলাযুদ্ধে শামিল হচ্ছে।  এসব দেখে ধারণা করা হচ্ছে, বিএলএ বা অনুরূপ অন্যান্য সংগঠনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। সম্প্রতি আত্মঘাতী হামলাকারীদের পরিচিতিমূলক যেসব বিবরণ মিলছে তাতে স্পষ্ট জাতিগত স্বাধিকারের সংগ্রামের নেতৃত্ব ট্রাইবাল নেতাদের হাত থেকে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে চলে গেছে।

গত দুই দশকের বালুচ রাজনীতির বড় সামাজিক রূপান্তর এটাই। এর আরেক পরোক্ষ ফল, সরকার ‘সরদার’দের কাউকে কাছে টেনে সশস্ত্রতা থামাতে পারছে না। সরদারদের পক্ষে সে রকম ভূমিকার সুযোগও কম। সে ক্ষেত্রে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে গুপ্তহত্যার শিকার হবেন তিনি।

আত্মঘাতী তরুণ-তরুণীরা এখানে ‘মজিদ ব্রিগেড’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারও ব্যবহার করে। এই ব্রিগেড গড়ে উঠেছে মজিদ সিনিয়র এবং মজিদ জুনিয়র নামে দুই ভাইয়ের নামে—যাঁরা নিজেরা যথাক্রমে ১৯৭৪ এবং ২০১০ সালে একই ধরনের রাজনৈতিক লক্ষ্যে জীবন দেন। এই দুই ভাই সাধারণ বালুচদের কাছে কিংবদন্তির মতো। মজিদ সিনিয়র গ্রেনেড হাতে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে হত্যা করতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের নামে ব্রিগেড করে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো কোয়েটায় কেন্দ্রীয় এক মন্ত্রিপুত্রের ওপর যে হামলা হয়, তাতে ১১ জন মারা যায়।

► যেসব বিবরণ মিলছে তাতে স্পষ্ট জাতিগত স্বাধিকারের সংগ্রামের নেতৃত্ব ট্রাইবাল নেতাদের হাত থেকে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে চলে গেছে। ► ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মতোই বালুচদের চলমান সশস্ত্রতাও যে ব্যাপক জনসমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তার বড় প্রমাণ আত্মঘাতী হামলার বৃদ্ধি। ► এত দিন চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতির যে একচেটিয়াত্ব ছিল, ওয়াশিংটন তাতে ভাগ বসাতে চাইছে। ঠিক এ সময়ই প্রদেশজুড়ে গেরিলা সশস্ত্রতা বেড়ে যায়। 

এখনকার গেরিলা তৎপরতা কেবল আত্মঘাতী হামলায় সীমিত নেই। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার জগতেও বালুচরা ভীষণ তৎপর। যার কারণে পাকিস্তানের সরকার আগের মতো আর বালুচ এলাকা নিয়ে নিজস্ব প্রচারণায় বিশ্ববাসীকে সন্তুষ্ট রাখতে পারছে না। বিকল্প কথাগুলোও এক্স হ্যান্ডলসহ নানা মাধ্যমে সহজলভ্য এখন। এসব কাজে নেমে প্রদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ক্রমে ‘হারিয়ে যাচ্ছে’ শিক্ষার্থী মুখগুলো। সরকারের নানা এজেন্সিও সন্দেহবশত অনেক তরুণ-তরুণীকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে—যাদের আর পাওয়া যায় না।

সশস্ত্রতার ভূরাজনৈতিক সংযোগ ও তাৎপর্য

বেলুচিস্তানের সীমান্ত হলো মূলত ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে। তবে প্রদেশজুড়ে অশান্তি ও জাতিগত আন্দোলনের জন্য পাকিস্তান সরকার বরাবরই দোষারোপ করে ভারতকে। তারা বিএলএকে বলে থাকে ‘ফিতনা-ই-হিন্দুস্তান’। তবে এ রকম অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠায় নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামান্যই তুলে ধরা হয়েছে এ পর্যন্ত।

ভারতের অভ্যন্তরে নানা জাতির স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার আন্দোলনে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে নয়াদিল্লিও অনেক সময় প্রমাণহীন একই রকম অভিযোগ করে। ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের মতোই বালুচদের চলমান সশস্ত্রতাও যে ব্যাপক জনসমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তার বড় প্রমাণ আত্মঘাতী হামলাকারীর ক্রম বৃদ্ধি।

তীব্র আদর্শিক অনুপ্রেরণা ছাড়া কেউই সমাজের জন্য অকাতরে এভাবে জীবন বিলিয়ে দেয় না। অনেক মাকেও আত্মঘাতী হামলাকারী হিসেবে দেখা যাচ্ছে—যা দক্ষিণ এশিয়ার গেরিলাযুদ্ধের ইতিহাসে বেশ অভিনব। ২০২২ সালে ৩০ বছর বয়সী দুই সন্তানের মা সারি বেলুচ করাচিতে চীনের কূটনৈতিক অফিসে হামলা চালিয়ে এই অধ্যায়ের সূচনা ঘটিয়েছিলেন।

বর্তমানে আত্মঘাতী হামলার পাশাপাশি বিএলএ তাদের তৎপরতায় ক্রমাগত উন্নত সরঞ্জামের ব্যবহার দেখাচ্ছে। এ রকম অস্ত্রপাতির নিশ্চিতভাবে বিদেশি উৎস রয়েছে। কিন্তু সেই উৎস-দেশ নিয়ে রহস্য ও ধূম্রজালের শেষ নেই।

বালুচ নেতাদের অনেকেই কারাগারে, অনেকে দেশছাড়া—নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রায় কারও কোনো সুযোগ নেই সেখানে। সাধারণত ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এবং আফগানিস্তানে লুকিয়ে কাজ করেন বালুচ স্বাধীনতাকামীরা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতারা বালুচদের প্রতি ভারতের সমর্থন নিয়ে বেশি উচ্চকিত হলেও এখন তাঁদের বিশেষভাবে দুশ্চিন্তায় ফেলছে আফগানিস্তানও।

যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার আগে দেশটিতে সচেতনভাবে বিপুল সমরাস্ত্র ফেলে আসে। এসব অস্ত্র যে চোরা বাজারে বেচাবিক্রি হবে এটা তাদের অজানা থাকার কথা নয়। বিএলএর সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে রকেট লঞ্চারসহ উন্নত অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এগুলোর বড় উৎস আফগান চোরাই বাজার হিসেবে ধরা হয়। 

আফগান সরকারের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধাবস্থাও বালুচদের জন্য সেখান থেকে অস্ত্রপাতি জোগাড় সহজ করে দিয়েছে। ট্রেন হাইজ্যাক এবং প্রদেশজুড়ে ফেব্রুয়ারির সর্বশেষ হামলা যেভাবে সমন্বয় করা হয়েছে সেটা, নেতৃত্বের ভৌগোলিকভাবে আশপাশে থাকার ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়া আত্মঘাতী হামলাকারীদের প্রশিক্ষক হওয়ার মতো মানবসম্পদও আফগান তালেবানদের মাঝেই সহজে পাওয়া সম্ভব। 

বিএলএর যে অংশটা সাম্প্রতিক হামলা চালাচ্ছে তার নেতা বশির জেবের ভাই আসলাম বেলুচ ২০১৮ সালে আফগানিস্তানেই নিহত হয়েছিলেন। তার পর থেকে বশির সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সম্প্রতি বিএলএ এক্স হ্যান্ডলে বশির জেবের মোটরসাইকেলে চলাফেরার যেসব ভিডিও ছেড়েছে, সেগুলো আফগান-বেলুচিস্তান পাহাড়ি এলাকায় ধারণকৃত বলেই অভিজ্ঞরা বলছেন।

পাকিস্তানের সামরিক বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা হলো আফগানিস্তানের পশতু তালেবানরা যদি পাকিস্তানের, দুটি প্রদেশে বিদ্রোহীদের সামরিক সহায়তা দিতে থাকে তাহলে কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। আবার সশস্ত্র বাহিনী পোড়ামাটি নীতি নিয়ে বিদ্রোহ দমনে যত বেশি সচেষ্ট হবে, তত বেশি সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে ও জাতীয় রাজনীতিতে সংকট বাড়বে। 

১৯৭১ সালে পুরোনো মানচিত্রের পূর্বাংশে সে রকমই ঘটে। কেবল এবারের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে কয়েক শ মানুষ মারা গেছে—প্রেস নোটের ভাষায় যাদের পরিচয় ‘সন্ত্রাসী’। কোয়েটা থেকে বিভিন্ন শহরের দিকে যাওয়া মহাসড়কগুলোতে শুধু দিনের বেলাতেই স্থানীয়রা চলাফেরার অনুমতি পায়।

এর মাঝেই ১৫ ফেব্রুয়ারির বিএলএ তাদের প্রচারমাধ্যমে (হাক্কাল মিডিয়া) ড্রোন ইউনিট গঠনের কথা জানিয়েছে। যার নাম দিয়েছে তারা ‘কাজী এরো হাইভ রেঞ্জার্স।’ ‘কাজী’ হলেন গত জুনে নিহত বিএলএর কমান্ডার আবুল বাসিত জেহরির ডাকনাম। জেহরি ছিলেন বিএলএর শহুরে গেরিলা কৌশলের অন্যতম প্রশিক্ষক। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বেলুচিস্তান যুদ্ধের দুষ্টচক্রে পড়ে গেছে। কেউই হয়তো আর পিছু হটবে না। বিশ্বের কোনো না কোনো বড় শক্তিও হয়তো এ রকমই চায়! 

সশস্ত্রতার রাজনৈতিক-অর্থনীতি

বেলুচিস্তানের নতুন অস্থিরতার ভূরাজনৈতিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে নতুন করে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। গত ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই এলাকার চাগাই জিলায় খনিজ সম্পদ উত্তোলনে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানান। এ থেকে মনে হচ্ছে, সমুদ্র ও খনিজ সম্পদ মিলে গড়ে ওঠা এই এলাকায় এত দিন চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতির যে একচেটিয়াত্ব ছিল, ওয়াশিংটন তাতে ভাগ বসাতে চাইছে। ঠিক এ সময়ই প্রদেশজুড়ে গেরিলা সশস্ত্রতা বেড়ে যায়। 

বেলুচিস্তানে কপার ছাড়াও সোনার বিপুল মজুত আছে বলে মনে করা হয়। ইরান সন্নিহিত এই এলাকায় জনবসতি খুবই কম। এখানে একটা কথা চালু রয়েছে, বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ সোনার মজুত আছে বেলুচিস্তানের চাগাইয়ে। পুরো পাকিস্তানে চাগাই হলো সবচেয়ে দরিদ্র জেলার একটি। এখানে ৯০ শতাংশ মানুষই দরিদ্র। 

এর মাঝেই কয়েক ডজন প্রাইভেট কোম্পানি সরকার থেকে লাইসেন্স নিয়ে সহজে উত্তোলনযোগ্য এলাকাগুলো থেকে নানা খনিজ তুলছে নিয়মিত। চীনের কোম্পানিও আছে এই তালিকায়। স্থানীয় সম্পদের এ ধরনের বেচাবিক্রির সিদ্ধান্তে স্থানীয় মানুষেরা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইছে। এটাই বালুচ তরুণদের সশস্ত্রতার প্রধান অর্থনৈতিক কারণ।

২৮ বছর আগে চাগাইয়ের পাহাড়ি ভূগর্ভে পাকিস্তান সরকার পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালানো শুরু করে। সেই থেকে এখানকার মানুষ ক্যানসারসহ নানা শারীরিক সমস্যায়ও ভুগছে লাগাতার। পাকিস্তানের অন্যত্র পারমাণবিক বোমার জন্য ব্যাপক গর্ব দেখা যায়। যেদিন বোমার প্রথম পরীক্ষা চালানো হয়, তাকে পাকিস্তান ‘ইউম দিন’ হিসেবে পালন করে। মানে এটা হলো মহত্তম দিন। মুশকিল হলো, চাগাইয়ের মানুষের জীবনে সেটা স্বাস্থ্যগত বিভীষিকা বয়ে এনেছে। 

বেলুচিস্তানে প্রচুর কপার মজুত আছে—যা আমেরিকা বিশেষভাবে পেতে চাইছে এখন। কপার ছাড়াও আছে লিথিয়াম, কোবাল্ট, সোনাসহ বহু মূল্যবান খনিজ। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে বৈশ্বিক খনিজ মজুত থেকে চীনকে দূরে রাখার যে নতুন নীতি নিয়েছেন, তারই অংশ হিসেবে বেলুচিস্তান ওয়াশিংটনের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে—যেমনটা পাচ্ছে মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশ।

তবে কাচিনের মতোই বেলুচিস্তানেও চীনারা হাজির আছে বহু আগে থেকে। অর্থনৈতিক করিডরের অংশ হিসেবে তারা এখানকার গদারে যে গভীর সমুদ্রবন্দর করেছে, সেটা আরব সাগরে বেইজিংয়ের অবস্থান অনেক শক্তিশালী করেছে। গদার অঞ্চল একসময় ওমানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ব্রিটিশদের সহায়তায় ফিরোজ খান নুনের আমলে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান এই জনপদের মালিকানা পায়। ২০০৭ সালে এসে চীন এখানে সমুদ্রবন্দর গড়ার কাজ সম্পন্ন করে। দুবাই-করাচি-মাসকাটের মাঝামাঝি এবং হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় গদারের ভবিষ্যৎ গুরুত্ব আরও বাড়বে বলেই মনে করা হয়।

এসব কারণেই ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ নজর পড়েছে বেলুচিস্তানের দিকে। আর তারই রহস্যময় পার্শ্বফল হিসেবে সশস্ত্রতাও বাড়ছে। ট্রাম্পের বেলুচিস্তান নীতি তেহরানের জন্যও উদ্বেগের। ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত আছে এখানে ইরানের। সীমান্তের ইরান অংশে (সিস্তান-বেলুচিস্তান) জয়সে আল-আদল বলে একটা সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা আছে। আবার পাকিস্তান মনে করে বিএলএ অপর দিকে আশ্রয় পায়। এ নিয়ে উভয় দেশের মাঝে ২০২৪–এর জানুয়ারিতে মিসাইল ছোড়াছুড়ি হয়ে গেছে এক দফা। উভয় দেশ সীমান্তের যার যার অংশে প্রাচীরও তৈরি করছে। এ রকম একটা সংঘাতময় এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের আগমন স্বভাবত বেশ মনোযোগ পাচ্ছে।

পাকিস্তানের পারমাণবিক সমরাস্ত্রের জন্য এই অঞ্চল অতি স্পর্শকাতর। এখানকার ভূগর্ভেই তার পারমাণবিক অস্ত্রগুলো মজুত রাখা আছে। এ রকম এলাকায় বিএলএর আধিপত্য বাড়া ইসলামাবাদের জন্য নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বার্তাও বটে। 

বিশাল এই জনপদকে ইসলামাবাদের পাশাপাশি যেহেতু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের জন্য দরকারি ভাবছে, সে কারণে বালুচদের স্বশাসনের দাবি আদায় সামনের দিনগুলোতে নিশ্চিতভাবে বাড়তি জটিলতায় পড়বে। কারণ, এতে এখানকার মানবাধিকার দলনের প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার আগ্রহ কমে যাবে।

আবার শক্তিধর দেশগুলো যখন বিশ্বের কোনো অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের পাশা খেলায় মেতে ওঠে, তখন স্থানীয়দের জন্য মরিয়া হয়ে মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। বেলুচিস্তানজুড়ে তাই আগামী দিনে রক্তপাতের শঙ্কাই কেবল অনুমান করা যায়। এখানে মানুষ খুব অসহায়। তারই ছাপ পড়েছে স্থানীয় তরুণদের মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি করিম দস্তির এই কথায়: 

তারা বলল সব কিছুর স্রষ্টা আছে

এই বিশাল ভূভাগে

আমার খোদা কোথায়

যার জন্য আমি এভাবে শিকলবদ্ধ?

আলতাফ পারভেজ গবেষক ও লেখক

মতামত লেখকের নিজস্ব

[প্রথম পর্ব: বেলুচিস্তানে ‘২৫ মার্চ’ কি শুরু হয়ে গেছে]