
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ঢাকসু নেতার শিশু নিপীড়নের ঘটনার পর থেকে কেবলই আমাদের পণ্ডিত স্যারের কথা মনে পড়ছে। তিনি আমাদের বাংলা ব্যাকরণ পড়াতেন। একাত্তরে বাগেরহাট গণহত্যার শিকার না হলে এ বছর তাঁর এক শ বছর পূর্ণ হতো।
একদিন তিনি ভাব সম্প্রসারণ করতে একটি প্রবাদবাক্য দিলেন, ‘ধরাকে শরা জ্ঞান’। আমি লিখেছিলাম, ধরা মানে পৃথিবী আর শরা মানে মাটির ঢাকনা। ব্যাখ্যায় লিখেছিলাম, ক্ষমতার দিগ্ভ্রান্তিতে অনেকে দিগম্বর হয়ে ধরণি অর্থাৎ পৃথিবীকে মাটির শরা ভেবে দম্ভ দেখায়...ইত্যাদি। অন্যরা কী লিখেছিল, মনে নেই।
তবে স্যার হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘নতুন ব্যাখ্যা’। তারপর ক্লাসের মধ্যেই আমাকে নাঙ্গা না করে বুঝিয়ে বলেছিলেন, ‘ধরাকে শরা জ্ঞান’ প্রবাদটির অর্থ হলো, মানুষ যখন নিজের ভুল ধারণা, অল্প জানা বিষয় বা কুসংস্কারকেই প্রকৃত জ্ঞান বলে মনে করে, তখন তাকে ধরাকে শরা জ্ঞান বলা হয়। এতে মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয় এবং বিভ্রান্তিতে পড়ে। এই প্রবাদ আমাদের সাবধান করে দেয় যেন যাচাই ছাড়া কোনো ধারণাকে জ্ঞান বলে গ্রহণ না করি।
স্যারকে অনেক ধন্যবাদ। পণ্ডিত স্যারের ঝুলিতে অসংখ্য প্রবাদবাক্য ও বাগধারা গচ্ছিত ছিল। শাস্তি দিতেন ছড়া কেটে। আমাদের এক সহপাঠী ছিল অজুহাতের ওস্তাদ। ড্রেস ছাড়া স্কুলে আসা, স্কুল পালানো, পড়া না করে আসার কারণগুলো এমন ইনিয়েবিনিয়ে ব্যাখ্যা করত যে চোখে পানি চলে আসত। তাকে নিয়ে স্যারের ছড়া ছিল—
‘দুষ্ট লোকের মিষ্ট কথা,
দীঘল-ঘোমটা নারী,
পানার তলার শীতল জল—
তিনিই মন্দকারী।’
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কঠোর শাস্তি পাওয়া শিশুরা রাগ ভেতরে জমিয়ে রাখে। বড় হয়ে তারা সেই রাগ অন্যদের ওপর ঝাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ ছোটবেলায় কঠোর শারীরিক শাস্তি পেয়েছে, তারা বড় হয়ে বেশি সহিংস, অপরাধপ্রবণ ও সমাজবিরোধী আচরণ করতে পারে।
'ক্যামোফ্ল্যাজ’ বা বর্ণচোরা (ছদ্মবেশ) বোঝাতে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট বাগধারা খুব কমই আছে। বুঝতে কিছুমাত্র অসুবিধা হয় না। পৌরাণিক ভারতে রূপান্তরের অন্যতম উদাহরণ বিশ্বামিত্র। রাজর্ষি থেকে তিনি মহান ঋষিতে পরিণত হন। রামায়ণ, মহাভারতসহ নানা পুরাণে তাঁর জীবনকাহিনি পাওয়া যায়।
রাজা কৌশিক কঠোর তপস্যার মাধ্যমে একসময় রূপান্তরিত হয়ে ব্রাহ্মর্ষির মর্যাদা লাভ করেন। বলা হয়, তিনি ঋগ্বেদের বহু সূক্তের দ্রষ্টা বা রচয়িতা। বিশ্বাস করা হয়, গায়ত্রী মন্ত্র তাঁরই দর্শিত মন্ত্র। সূর্যদেবকে উদ্দেশ করে রচিত গায়ত্রী মন্ত্র একটি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মন্ত্র-যা মানুষের বুদ্ধিকে আলোকিত করার প্রার্থনা।
গায়ত্রী মন্ত্রের বাংলা ভাবার্থ অনেকটা এমন—
‘আমরা সেই পরম আলোকময় ঈশ্বরের ধ্যান করি,
যিনি এই পৃথিবী, আকাশ ও স্বর্গলোককে আলোকিত করেন।
তিনি যেন আমাদের বুদ্ধিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।’
(সহ আস্মাকম বুদ্ধিম সম্যক মার্গে মার্গদর্শনং করোতু।)
বিশ্বামিত্রের তপস্যা, সংযম ও আত্মসংযুদ্ধের কাহিনি সুবিদিত। আবার তিনিই ছিলেন রাম ও লক্ষ্মণ ভ্রাতৃদ্বয়ের অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষাগুরু। বলা বাহুল্য, কলিযুগের বিশ্বামিত্রদের চেয়ার দখলের তপস্যা থাকলেও সংযম ও আত্মসংযুদ্ধের কোনো বালাই নেই। আধুনিক বিশ্বামিত্ররা বরং পরিণত হচ্ছেন গৌতম বুদ্ধের যুগের অঙ্গুলিমালে।
অঙ্গুলিমাল আদতে ছিলেন সাধারণ ঘরের মানুষ। ওস্তাদরা তাঁকে বানিয়ে ফেলেন ‘সাহসী’ মানুষে। সে যুগে দস্যুতার মাধ্যমে—আজকের ভাষায় যেমন ব্যাংকের টাকা মারা হয়, অনেকে জীবিকা নির্বাহ করত। ব্যাংকের টাকা মারলে যেমন বাঁটোয়ারা দিতে হয়, তেমনি সে যুগেও আয়-রোজগার থেকে গুরুদক্ষিণা দিতে হতো।
অঙ্গুলিমাল ঠিক করলেন, তিনি এমন গুরুদক্ষিণা দেবেন, যা কেউ কখনো দেয়নি। এক হাজার মানুষের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে মালা বানানোর ‘প্রজেক্ট’ নিলেন। একের পর এক মানুষের ওপর আক্রমণ, কখনো হত্যা করে, আঙুল সংগ্রহ করতে থাকলেন। প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন, ৯৯৯টি জোগাড় হয়ে গিয়েছিল।
অঙ্গুলিমাল হাজার আঙুল উদ্যাপনের আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। শেষ শিকারের অপেক্ষা ছিল। কিন্তু তা আর হয়নি। শেষ আঙুলটি সংগ্রহের আগেই মহামতি গৌতম বুদ্ধ তাঁর মৌন ভেঙে অঙ্গুলিমালকে পাপাচার থেকে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হন।
আশা করি, আমাদের প্রক্টর ও ভিসিরাও তাঁদের মৌন বিসর্জন দিয়ে এগিয়ে আসবেন।
শিশুদের অপমানের কোনো শাস্তি নেই।
শিশুকে নানা কৌশলে ভয় দেখানো, অপমান করা, মাত্র প্যান্ট পরতে শেখা শিশুটির প্যান্ট টেনে খুলে দিয়ে আনন্দ পাওয়া; সামান্যতেই কান ধরে ওঠবস করানো বা মাটির সঙ্গে নাক ঘষতে বাধ্য করা—এসব অনাচারকে অনেক অভিভাবক ‘সামান্য শাস্তি’, ‘স্বাভাবিক’ বা ‘প্রথা’হিসেবে মেনে নেন।
পাঠকদের নিশ্চয়ই ছবিটির কথা মনে আছে। ১৬ এপ্রিল ২০২৪ ছবিটি প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। ঈদের দিন শিশুরা গিয়েছিল সদ্য চালু হওয়া শিশুপার্কে। ঢাকার শাহবাগে শিশুপার্ক চালু হওয়ার পর সপ্তাহে এক দিন আর ঈদের দিন সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার রেওয়াজ ছিল। বলা বাহুল্য, শরীয়তপুরে সে রেওয়াজের বালাই ছিল না।
ঈদের দিন সরল বিশ্বাসে কিছু শিশু পার্কে ঢুকে পড়েছিল। তাদের পকেটে টিকিট কেনার পয়সা ছিল না, কিন্তু হাউশ ছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, তাদের ‘তর সয়নি’। হয়তো সুনীলের বাবার মতো কেউ তাদের কাঁধে হাত রেখে বলেনি, ‘দেখিস, একদিন আমরাও…।’
এই ‘অনুপ্রবেশ’কে চুরি বলেছিলেন সেখানকার ইউএনও। খেয়ালি বিচারের রায় হয়েছিল, দুই ঘণ্টা কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা। কেউ প্রতিবাদ করেনি। সবাই সেটাকে ঈদের বাড়তি বিনোদন হিসেবেই নিয়েছিল। শিশুরা যে লজ্জায় আর স্কুলে ফেরেনি, সে কথা আমাদের অনেকেরই অজানা।
কেন শিশু নিগ্রহের পথ বেছে নেন প্রাপ্তবয়স্করা?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কঠোর শাস্তি পাওয়া শিশুরা রাগ ভেতরে জমিয়ে রাখে। বড় হয়ে তারা সেই রাগ অন্যদের ওপর ঝাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ ছোটবেলায় কঠোর শারীরিক শাস্তি পেয়েছে, তারা বড় হয়ে বেশি সহিংস, অপরাধপ্রবণ ও সমাজবিরোধী আচরণ করতে পারে।
যেসব মা–বাবা নিজেরাও ছোটবেলায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের সন্তানদের ওপর একই বা আরও কঠোর শাস্তি দেওয়ার আশঙ্কা বেশি। যদিও সব ক্ষেত্রেই তা ঘটে না, তবে শক্তিশালী পরিসংখ্যানগত এবং অনেক ক্ষেত্রে কারণগত সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখায় যে শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তি কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা। এই চক্র ভাঙতে হলে আইন, শিক্ষা, পরিবার ও সমাজ—সব স্তরে সমন্বিত নীতি ও কার্যক্রম প্রয়োজন। প্রয়োজন সাংঘর্ষিক ও বৈষম্যমূলক পরিবেশ থেকে আসা প্রাপ্তবয়স্কদের মনোসামাজিক সহায়তা দেওয়া। যুদ্ধ থেকে ফেরা মুক্তিযোদ্ধাদের মনোসামাজিক সহায়তা না দেওয়ার ফল আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক, গবেষক
ই-মেইল: wahragawher@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব