ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর বেকায়দায় রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধ শুরু করার পর বেকায়দায় রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

মতামত

‘প্যাক্স আমেরিকানা’র দিন শেষ, এরপর কী হবে?

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। শান্তির মধ্যেই যুদ্ধের আশঙ্কা, আবার যুদ্ধের মধ্যেই শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি যেন যুদ্ধের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্থির শান্তি।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ৬০ দিনের আলোচনা শুরু করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি; বরং লড়াই চলেছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের হামলা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এতে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও হুমকির মুখে পড়েছে।

ইরানের ওপর হাজার হাজার বিমান হামলা চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি আবার খুলতে তেহরানকে বাধ্য করতে পারেনি। ইরান বলছে, চার দশকের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে তারা এই অবরোধ প্রত্যাহার করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র উল্টো আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ মাত্রার নিষেধাজ্ঞাকেও আরও বাড়ানো হচ্ছে। তবু ইরান আত্মসমর্পণের কাছাকাছি যায়নি। এতে নিজেদের সামরিক আগ্রাসনের পরিণতি সামলানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে।

পুরো অঞ্চলেই এখন শক্তিকে আর শক্তির প্রতীক বলে মনে হচ্ছে না; বরং তা অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠছে। গাজায় যুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উপায় নয়; যুদ্ধই যেন সেখানে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল যে অতিরিক্ত ও ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করছে (লেখকদের ভাষায় যা ‘গাজা ডকট্রিন’), তার লক্ষ্য শুধু হামাস নয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবস্থাকেও আঘাত করা হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননেও একই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। সেখানে দুটি যুদ্ধবিরতি ও একটি শান্তিচুক্তি থাকা সত্ত্বেও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে লেবাননের সার্বভৌমত্ব কার্যত উপহাসে পরিণত হয়েছে।

অনেকে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘শক্তিই ন্যায়’—এই নগ্ন নীতি প্রাধান্য পেয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর অসাধারণ হস্তান্তর এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ভণ্ডামিপূর্ণ হলেও আগে যে আনুষ্ঠানিক সম্মান দেখাত, সেটিও এখন অনেকটাই পরিত্যাগ করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন ইরাকে হামলার আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে কোনো ধরনের পরামর্শ বা অনুমোদনের ভানও করছে না। ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া আন্তর্জাতিক পরামর্শের বিষয়টি যেন গুরুত্বই হারিয়েছে।

ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন একটি মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ড। সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি এবং লেখা রয়েছে—‘মহান বিজয়, হরমুজ প্রণালি’। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তবে এটি পুরোপুরি নতুন কোনো পরিবর্তন নয়; বরং আগের নীতিরই আরও চরম রূপ। ড্রোন হামলায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে গুয়ানতানামো বে-তে অনির্দিষ্টকাল আটক—এক প্রজন্ম ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই যুদ্ধপরবর্তী ‘নিয়মভিত্তিক’ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যেটি একসময় তারা প্রতিষ্ঠা করেছিল। শুধু নিয়মের সর্বজনীন প্রয়োগ সীমিত করা হয়নি; প্রয়োজন হলে নিয়মকে ব্যবহার না করার সুযোগও তৈরি করা হয়েছে। লেখকদের মতে, বিশ্বজুড়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ট্রাম্প নীতির পথ আগেই তৈরি হয়েছিল গাজায় গণহত্যার ঘটনায় আগের মার্কিন প্রশাসনের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে।

তবে প্রকাশ্য সামরিক শক্তিনির্ভর নীতির একটি পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সেটি ট্রাম্পের প্রত্যাশিত পরিবর্তন নয়। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য শক্তিশালী করার বদলে তা দুর্বল করেছে। যুদ্ধ ও শান্তির সীমারেখা যখন এমন এক যুদ্ধবিরতিতে মিলিয়ে যায়, যেটি পুরোপুরি যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়, আর মাসের পর মাস বোমাবর্ষণের পরও যখন বিজয় আসে না, তখন সামরিক শক্তিকে আর শক্তি বলে মনে হয় না। মনে হয় অর্থহীন ধ্বংসযজ্ঞ।

যে যুদ্ধ প্যাক্স আমেরিকানা তথা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে, সে যুদ্ধই আরও টেকসই একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার জন্য জায়গা তৈরি করতে পারে। এই নতুন ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে অধিকার, সংযম, মর্যাদা, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান।

চলমান যুদ্ধ কোনো কার্যকর বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে পারে না। কাঁচা শক্তি প্রয়োগ করলে প্রতিরোধ তৈরি হবেই। যুদ্ধাপরাধ আন্তর্জাতিক নিন্দা ডেকে আনবে। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে শর্তসাপেক্ষ করা গেলেও দীর্ঘদিন আধিপত্য ধরে রাখা যায় না। তাই এখন বড় প্রশ্ন হলো, এরপর কী?

সামরিক শক্তিনির্ভর নীতি গভীর অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। কিন্তু এর ব্যর্থতা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। এর ভিত্তি হতে পারে নতুন ধরনের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, যেখানে সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান থাকবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বজনীন অধিকার, পারস্পরিক সংযম এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে শক্তিশালী করবে। যৌথ সম্পদ, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মূল্যবোধের বিষয়ে সিদ্ধান্তও সম্মিলিতভাবে নেওয়া হবে। এমন ব্যবস্থা এখনো আকাঙ্ক্ষার বিষয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রতিটি দেশেরই এতে স্বার্থ রয়েছে।

এই নতুন ব্যবস্থায় জাতিসংঘ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে না। তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করা হয়েছে, কিন্তু যে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তার সমালোচনা করা হয়নি। ফলে কূটনীতির পক্ষে নতুন রক্ষকদের প্রয়োজন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আর এর সম্ভাবনাও ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।

বাব আল-মানদেব প্রণালির ইয়েমেন উপকূলের কাছে। হুতিদের হুমকির মুখে এ নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে গেছে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক এর একটি উদাহরণ। এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান ও কাতারের নেতৃত্বাধীন একটি জোট। এতে মিসর, সৌদি আরব ও তুরস্কও সহায়তা করেছে। এটি ২০১৫ সালের ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ নিয়ে আলোচনার চেয়ে বড় পরিবর্তন। ওই চুক্তিতে ইরানের সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্ত ছিল।

বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০১০ সালে ব্রাজিল ও তুরস্ক ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি বিনিময়ের একটি সমঝোতা করেছিল। পরে জেসিপিওএতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো দ্রুত সেই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে। তখন ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেলসো আমোরিম আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘প্রচলিত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো তাদের বিশেষ মর্যাদা সহজে ভাগ করে নিতে চায় না।’

আরেকটি উদাহরণ হলো মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ কাঠামো। এর লক্ষ্য হলো অভিন্ন নীতির ভিত্তিতে আরও স্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা। এর মধ্যে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকারও রয়েছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং অন্য দেশগুলোর যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার মধ্যে এই চুক্তির কার্যকারিতা এখন পরীক্ষা হচ্ছে। তবে বৃহত্তর প্রবণতাটি স্পষ্ট। আরও বহুত্ববাদী একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই বেশি করে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সেখানে কমছে।

হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মানদেব প্রণালিও এখন কার্যত বন্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জবাবে যে অসম শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, তার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা শুধু চরম সহিংসতাই দেখছি না, দেখছি চরম মাত্রার ক্ষমতার অপব্যবহারও।

তবে যে যুদ্ধ প্যাক্স আমেরিকানা তথা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে, সে যুদ্ধই আরও টেকসই একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার জন্য জায়গা তৈরি করতে পারে। এই নতুন ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে অধিকার, সংযম, মর্যাদা, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান।

  • পেদ্রো আব্রামোভাই ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনসের কর্মসূচিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জুলিয়া সাকর একই প্রতিষ্ঠানের বিশেষ উপদেষ্টা।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ