হাসপাতালের শয্যা বাড়লেও অনেক সময় রোগীদের শয্যা পাততে হয় মেঝেতে। মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল
হাসপাতালের শয্যা বাড়লেও অনেক সময় রোগীদের শয্যা পাততে হয় মেঝেতে। মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল

মতামত

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি: শুধু বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার

বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন স্বাস্থ্য খাতকে আর কেবল একটি সামাজিক সেবা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তার একটি মৌলিক উপাদান। একটি অসুস্থ জাতি কখনো উৎপাদনশীল হতে পারে না; একটি দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা কখনো শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না।

তাই স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বাস্তব প্রশ্ন হলো—এই বাজেট কি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবে, নাকি এটি শুধুই আরেকটি সংখ্যাগত বৃদ্ধি হয়ে থাকবে?

স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ: ব্যয় নয়, অর্থনৈতিক লাভ

বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ওইসিডির বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ অর্থনীতিতে বহুগুণ রিটার্ন প্রদান করে। একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী বেশি উৎপাদনশীল, কম কর্মঘণ্টা হারায়, কম চিকিৎসা ব্যয় বহন করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের সামাজিক ব্যয় কমিয়ে আনে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখ লাখ পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে। Out-of-Pocket Expenditure এখনো মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। অর্থাৎ চিকিৎসার ব্যয় বহনের প্রধান দায়ভার এখনো রোগী ও তার পরিবারের ওপর। এটি শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

তাই স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি কেবল হাসপাতাল নির্মাণ বা নতুন যন্ত্রপাতি কেনার বিষয় নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি কৌশলগত বিনিয়োগ।

বাজেট বৃদ্ধি ইতিবাচক, তবে এখনো অপর্যাপ্ত

বর্তমান বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর কর ও শুল্ক হ্রাস রোগীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় এখনো জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে যে ধাপে ধাপে এটি জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশও ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের তুলনায় বেশি সরকারি বিনিয়োগ করছে।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি স্বাস্থ্যকে সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করছি?

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা: সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো কার্যকর Gatekeeping System-এর অনুপস্থিতি। একজন রোগী সাধারণ জ্বর, কাশি বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্যও সরাসরি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চলে যান। ফলে তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলো অপ্রয়োজনীয় রোগীর চাপে জর্জরিত।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন একটি GP বা Family Physician-ভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মডেলের সুপারিশ করেছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে দক্ষ জেনারেল প্র্যাকটিশনার, উপজেলা পর্যায়ে শক্তিশালী সেকেন্ডারি কেয়ার এবং জেলাপর্যায়ে বিশেষায়িত সেবা গড়ে তোলা গেলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দক্ষতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী না করে কোনো দেশই Universal Health Coverage অর্জন করতে পারেনি। তাই বাজেটের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এই খাত।

উপজেলা হাসপাতাল: ১০১ শয্যার বাইরে ভাবতে হবে

অনেক সময় উপজেলা হাসপাতালের উন্নয়ন বলতে শুধু শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি বোঝানো হয়। কিন্তু একটি হাসপাতালের কার্যকারিতা শয্যাসংখ্যা দিয়ে নয়, সেবার মান দিয়ে পরিমাপ করা হয়।

উপজেলা হাসপাতালকে প্রকৃত অর্থে আধুনিক সেকেন্ডারি কেয়ার সেন্টারে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে থাকবে ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা, অ্যানেসথেসিয়া ও সার্জারি সুবিধা, রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ডিজিটাল ইমেজিং, মাতৃ ও নবজাতক সেবা, টেলিমেডিসিন এবং NCD ক্লিনিক।

শুধু ভবন নির্মাণ নয়, দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ ও অসংক্রামক রোগ: আগামী দশকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে রোগের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক এবং কিডনির রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে।

প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়। অথচ অধিকাংশ রোগী রোগের শেষ পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য আসেন। এতে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়।

তাই বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করতে হবে জাতীয় ক্যানসার রেজিস্ট্রি, স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিং, জেলা পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তকরণ কেন্দ্র, রেডিওথেরাপি সম্প্রসারণ, প্যালিয়েটিভ কেয়ার এবং ক্যানসার গবেষণায়। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তাবিত Cancer Research Institute-এর মতো উদ্যোগগুলোকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর এবং ব্যয়সাশ্রয়ী

উপায়গুলোর একটি হলো শক্তিশালী তামাক করনীতি। অথচ এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও তামাক কর কাঠামোতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার দেখা যায়নি। সরকারকে আগামী বাজেটে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট একীভূত করে ১০ শলাকার সর্বনিম্ন মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ এবং প্রতি শলাকায় অন্তত শূন্য দশমিক ৮ টাকা নির্দিষ্ট কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এতে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন সম্ভব, যা ক্যানসার স্ক্রিনিং, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যবিমা, NCD প্রতিরোধ কর্মসূচি এবং ক্যানসার গবেষণায় বিনিয়োগ করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি রোগ প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ আরও জরুরি।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা: ভবিষ্যতের ভিত্তি

একবিংশ শতাব্দীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ডিজিটাল হবে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইউনিক হেলথ আইডি, ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড (EHR), ই-প্রেসক্রিপশন, ডিজিটাল রেফারেল সিস্টেম এবং এআইভিত্তিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে সেবার মান ও স্বচ্ছতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি দুর্নীতি হ্রাস, ওষুধের অপচয় কমানো, রোগীর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের পূর্বশর্ত।

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি: বাজেট বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় বাধা

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাজেট বৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। সরঞ্জাম ক্রয়, ওষুধ সরবরাহ, নির্মাণকাজ এবং জনবল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন বাধ্যতামূলক ই-জিপি, স্বাধীন অডিট, হাসপাতালভিত্তিক কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং নাগরিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।

মানবসম্পদ: স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি

একটি হাসপাতালের মূল শক্তি ভবন নয়; তার মানবসম্পদ। নার্স, মিডওয়াইফ, ফার্মাসিস্ট, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট এবং চিকিৎসকদের জন্য একটি আধুনিক ও আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক, গবেষক এবং স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের দেশে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দক্ষ জনবল ছাড়া কোনো স্বাস্থ্য সংস্কার সফল হতে পারে না।

স্বাস্থ্যবিমা ও আর্থিক সুরক্ষা

বাংলাদেশে Universal Health Coverage অর্জন সম্ভব হবে না যদি স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু না হয়। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন জাতীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা তহবিল, স্বাস্থ্য কার্ড এবং সামাজিক স্বাস্থ্যবিমা কাঠামোর সুপারিশ করেছে।

ক্যানসার, কিডনির রোগ, হৃদ্‌রোগ এবং অন্যান্য ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হলে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা অপরিহার্য।

রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে এখন প্রায় সব রাজনৈতিক দলই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যবিমা, বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধির কথা বলছে। এটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

তবে প্রকৃত রূপান্তর ঘটবে তখনই যখন এসব প্রতিশ্রুতি নির্বাচনী ইশতেহারের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের রোডম্যাপে রূপ নেবে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং বাজেট বরাদ্দ—এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

শেষের কথা

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাস্থ্য অঙ্গীকার এবং জনগণের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশাকে একত্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। কিন্তু কেবল অর্থ বরাদ্দ নয়; প্রয়োজন সুশাসন, বিকেন্দ্রীকরণ, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যবিমা, দক্ষ মানবসম্পদ, ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রতিরোধভিত্তিক জনস্বাস্থ্য নীতি।

কারণ, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নয়, তার জনগণের স্বাস্থ্যে নিহিত। বাংলাদেশের আগামী দিনের উন্নয়নের গল্প লিখতে হলে সেই গল্পের কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকে স্থান দিতেই হবে।

  • প্রফেসর ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন সাবেক সদস্য, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন, চেয়ারম্যান, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়