
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিল সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম উত্তপ্ত ও মেরুকৃত এক রাজনৈতিক লড়াই প্রত্যক্ষ করছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যকার নির্বাচনী প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
যদিও অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও ঘরোয়া নানা সংকট ব্রাজিলীয় ভোটারদের মূল চিন্তার বিষয়, তবুও ব্রাসিলিয়া থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক ইস্যু আচমকাই এই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ইস্যুটি হলো ফিলিস্তিন।
সর্বশেষ ডেটাফোলহা জরিপ অনুযায়ী, ব্রাজিলজুড়ে এখন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম দফায় ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) প্রার্থী লুলার ঝুলিতে ৩৯ শতাংশ ভোট যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে লিবারেল পার্টির (পিএল) প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো ৩৫ শতাংশ সমর্থন নিয়ে খুব বেশি পিছিয়ে নেই।
লুলা ও ফ্লাভিও বলসোনারোর এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন পুরো লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্র এক আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনা থেকে শুরু করে চিলি কিংবা কলম্বিয়া—সমগ্র অঞ্চলে ডানপন্থার এক শক্তিশালী পুনরুত্থান ঘটেছে।
জাভিয়ের মিলেইয়ের আর্জেন্টিনা, হোসে অ্যান্টোনিও কাস্টের চিলি এবং কলম্বিয়ায় ডানপন্থী সরকারের উত্থানের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মিত্র নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভেনেজুয়েলাও এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অঞ্চলের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের এই সাধারণ নির্বাচন কেবল দেশের সর্বোচ্চ পদে কে বসবেন, সেই প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং ব্যালট বাক্স থেকে ব্রাজিলের কোন রূপটি বেরিয়ে আসবে এবং অঞ্চলটির এই গভীর পরিবর্তনশীল ভারসাম্যে ব্রাজিল বিশ্বমঞ্চে নিজেকে কীভাবে অবস্থান করাবে—এ নির্বাচন তা-ও নির্ধারণ করবে।
আর এই বহুমাত্রিক রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফিলিস্তিন, বিশেষ করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষার প্রশ্নটি—দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে এক সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ডানপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে ইসরায়েলের সঙ্গে ব্রাজিলের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বহুগুণ শক্তিশালী করবেন এবং ২০২৭ সাল থেকেই তেল আবিব থেকে ব্রাজিলের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করবেন। এর মাধ্যমে তিনি ব্রাসিলিয়াকে পুরোপুরি ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ব্রাজিলের এই পরবর্তী নির্বাচন শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করবে না; এটি এটাও ঠিক করে দেবে যে গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশ ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কীভাবে কথা বলবে।
অন্যদিকে লুলা দা সিলভা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ব্রাজিলীয় নীতি ধরে রেখেছেন। দ্বি–রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থনে অবস্থান নিয়ে তিনি গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করে আসছেন।
উল্লেখ্য, ব্রাজিল ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং আজও ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুসরণে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্রাজিলের এই ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক অবস্থান বহাল রয়েছে।
তাই ফিলিস্তিন ইস্যুটি ব্রাজিলের নির্বাচনে এখন আর কেবল কোনো দূরবর্তী পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; ব্রাজিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে কেমন ভূমিকা পালন করতে চায়, সেই বৃহৎ বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে এটি। এক দিকে রয়েছে স্বাধীনতা, বহুপক্ষীয়বাদ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক ঐতিহ্য।
অন্য দিকে রয়েছে উগ্র ডানপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি, যা ব্রাজিলকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অক্ষের কাছাকাছি নিয়ে যাবে এবং কয়েক দশক ধরে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রককে পরিচালিত করা মৌলিক নীতিগুলোকে পুনর্গঠন করবে।
আয়তন ও জনসংখ্যা উভয় দিক থেকেই লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সীমান্ত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের এই পরবর্তী নির্বাচন শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করবে না; এটি এটাও ঠিক করে দেবে যে গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যতম প্রভাবশালী এই দেশ ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে কীভাবে কথা বলবে।
এই দুই অবস্থানের মধ্যকার ব্যবধানটা বেশ স্পষ্ট। লুলা জয়ী হলে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্র ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির নীতিতে ব্রাজিল অবিচল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে; আর ফ্লাভিও বলসোনারোর জয় ব্রাজিলকে সরাসরি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্বার্থের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে।
মিডল ইস্ট মনিটরকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ব্রাজিলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রান্সিসকো রেজেক বলেন, ব্রাজিলীয় রাজনৈতিক ডান ও বামপন্থীদের মধ্যকার আদর্শিক দ্বন্দ্বে ফিলিস্তিন প্রশ্নটি এখন ‘সবচেয়ে নাটকীয় ও সংবেদনশীল বিষয়ে’ পরিণত হয়েছে।
তাঁর মতে, এই বিরোধের মূলে রয়েছে ব্রাজিলের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ভবিষ্যৎ।
রেজেকের মতে, ব্রাজিলের বামপন্থী এবং মূলধারার মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখনো এমন একটি কূটনৈতিক ঐতিহ্য বহন করছে যা ‘স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও অনানুগত্যের’ পাশাপাশি ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পরম শ্রদ্ধার’ ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই নীতিগুলো নৈতিকতা ও মানবিকতার সংমিশ্রণে ব্রাজিলের রাজতন্ত্রের যুগ থেকেই দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালিত করে আসছে।
রেজেক উল্লেখ করেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোও তাঁর চার বছরের মেয়াদে এই ঐতিহ্যকে পুরোপুরি ছিন্ন করতে পারেননি। এর্নেস্তো আরাউজো যখন ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, সেই সময়টিকে ‘একটি চরম লজ্জাজনক অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করে রেজেক বলেন, শেষ পর্যন্ত বলসোনারো আরাউজোকে সরিয়ে কার্লোস ফ্রাঙ্কাকে আনেন, যিনি ব্রাজিলের ঐতিহাসিক কূটনীতি ও প্রথার প্রতি অনুগত একজন পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন।
রেজেকের এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এল, যখন ওয়াশিংটন পুরো লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রভাব পুনর্দখল করতে চাইছে এবং আর্জেন্টিনার জাভিয়ের মিলেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ব্রাজিলে ফ্লাভিও বলসোনারো তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির ওপর জোর দিচ্ছেন যা ব্রাসিলিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েরই অতি ঘনিষ্ঠ করবে, যা লুলার গ্লোবাল সাউথমুখী ও বহুপক্ষীয় নীতির ঠিক বিপরীত।
রেজেকের মতে, এই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তন ব্রাজিলের নির্বাচনী বিতর্কে ফিলিস্তিনকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এই ইস্যু এখন একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে—ব্রাজিল কি তার ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখবে, নাকি আমেরিকান ও ইসরায়েলি অক্ষের দিকে পুরোপুরি হেলে পড়বে?
ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থীদের পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে রেজেক বলেন, এই রাজনৈতিক গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটে সবচেয়ে বিতর্কিত ও ঘৃণিত শক্তিগুলোর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করছে। রেজেক ট্রাম্প ও মিলেইয়ের মতো নেতাদের বিরুদ্ধে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন যে তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডকে মদদ দিয়ে যাচ্ছেন।
রেজেক ফ্লাভিও বলসোনারোর সেই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন, যেখানে তিনি জয়ী হলে ব্রাজিলিয়ান ইসরায়েলি কনফেডারেশনের প্রধানকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। রেজেক এটিকে ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানের চেয়ে সংগঠিত জায়নবাদী লবিকে শ্রদ্ধা জানানোর একটি প্রয়াস’ বলে মন্তব্য করেন।
ব্রাজিলের বামপন্থী এবং মূলধারার মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখনো এমন একটি কূটনৈতিক ঐতিহ্য বহন করছে যা ‘স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও অনানুগত্যের’ পাশাপাশি ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পরম শ্রদ্ধার’ ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই নীতিগুলো নৈতিকতা ও মানবিকতার সংমিশ্রণে ব্রাজিলের রাজতন্ত্রের যুগ থেকেই দেশটির পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালিত করে আসছে।
রেজেকের দৃষ্টিতে, গাজা সংঘাত ব্রাজিলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনকে সবচেয়ে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। গাজায় যা ঘটছে, তাকে তিনি মানবজাতির ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ঘৃণ্য গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে পশ্চিমারা নিষ্ক্রিয় হয়ে এই সহিংসতা প্রত্যক্ষ করছে, যা এখন লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
রেজেকের এই বক্তব্য পরিষ্কার করে যে ফিলিস্তিন কেন ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতির বিষয় হয়ে থাকেনি; এটি এখন বিশ্বের বুকে ব্রাজিলের অবস্থান নির্ধারণের মূল উপাদানে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন একটাই—ব্রাজিল কি আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয়র দিকে দাঁড়াবে, নাকি উগ্র ডানপন্থীদের মতো ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্বার্থ রক্ষায় শামিল হবে?
তবে রেজেক আশা প্রকাশ করেন, ব্রাজিলের শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পররাষ্ট্রনীতিতে এত বড় ধরনের বিপর্যয় রোধ করতে সক্ষম হতে পারে। গভীর রাজনৈতিক বিভাজন থাকা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বাস করেন যে ভবিষ্যতে একটি ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় এলেও ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক নীতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
রেজেক বলেন, ‘এমনকি সরকার ও কংগ্রেস—উভয় স্থানেই যদি এক চরম ডানপন্থী শক্তি জয়ী হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে, তবুও আমাদের পররাষ্ট্রনীতি তার ঐতিহ্যগত মর্যাদা ও সংযম ধরে রাখতে পারবে।’
ইমান আবুসিদু, মিডল ইস্ট মনিটরের ব্রাজিল প্রতিনিধি।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত