মাহা মির্জার বিশ্লেষণ

মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সামনে অশনিসংকেত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কীভাবে দেশের ওষুধশিল্পের জন্য অশনিসংকেত তা নিয়ে লিখেছেন মাহা মির্জা

মার্কিন চুক্তির মেধাস্বত্ব আইন-সংক্রান্ত ২.৬ ধারাটা দিয়ে শুরু করি: ‘বাংলাদেশ শ্যাল প্রোভাইড আ রোবাস্ট স্ট্যান্ডার্ড অব প্রটেকশন ফর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি। বাংলাদেশ শ্যাল প্রোভাইড ইফেকটিভ সিস্টেমস ফর সিভিল, ক্রিমিনাল অ্যান্ড বর্ডার এনফোর্সমেন্ট অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস অ্যান্ড শ্যাল এনশিওর দ্যাট সাচ সিস্টেমস কমব্যাট অ্যান্ড ডেটার দ্য ইনফ্রিংমেন্ট অর মিসঅ্যাপ্রোপ্রিয়েশন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি...’

 অর্থাৎ মার্কিন চুক্তিটি ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট (আইপি)’ বা মেধাস্বত্ব আইনের ‘রোবাস্ট ইমপ্লিমেন্টেশন’ চাইছে, চাইছে বাংলাদেশ ‘পেটেন্ট’ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করুক।

তাতে কার লাভ, কার ক্ষতি?

আমরা জানি আমাদের ওষুধশিল্পের সঙ্গে মেধাস্বত্ব আইনের একটা জটিল সম্পর্ক আছে। দেশে উৎপাদিত ৯০ শতাংশ ‘জেনেরিক’ ওষুধের কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে (বেশির ভাগেরই পেটেন্ট নেই)। এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের (ইনগ্রেডিয়েন্ট) মধ্যে কোনটির আইপি লাইসেন্স আছে, কোনটির নেই, কোনটির ‘পেটেন্ট’ লঙ্ঘিত হয়েছে, কোনটির হয়নি, এটা কীভাবে নির্ণয় করা সম্ভব? কে করবে, কীভাবে করবে? এটা কার কাজ? এটা আর যাই হোক কোনোভাবেই বন্দর কর্তৃপক্ষ বা কাস্টমসের কাজ নয়। তা হলে এই কাজটি করবে কে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চমকে উঠতে হয়।

কাঁচামাল বা পণ্য আমদানিতে বিদেশি কোম্পানির ‘আইপি রাইট’ লঙ্ঘিত হলে বাংলাদেশের কাস্টমস যেন সেটা ‘পাকড়াও’ করতে পারে, এই উদ্দেশ্যে অনেক দিন আগে থেকেই বন্দর কাস্টমসের সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকানরা আমাদের কাস্টমসের সব ডিজিটাল তথ্যের অধিকার চাইছে, আইপি আইনের ‘ডিজিটাল এনফোর্সমেন্ট রাইট’ চাইছে। অর্থাৎ তারা আমাদের বন্দর ও কাস্টমসের সব ডেটা হাতে নিয়ে বসে থাকবে এবং উৎপাদকদের আমদানি করা কাঁচামালের লেবেল অনুসরণ করতে পারবে। অর্থাৎ প্রযুক্তি জাপানিদের, সিদ্ধান্ত আমেরিকানদের, স্বার্থ বহুজাতিক কোম্পানির, কিন্তু বাংলাদেশ কাস্টমস বিদেশিদের এজেন্ট হয়ে নিজের দেশের উৎপাদকদের ধরপাকড়ের কাজটি করবে!

পেটেন্ট: ‘ধরপাকড়’ ইস্যু, নাকি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-বিচারিক ইস্যু?

‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি’ আইন একটি রাজনৈতিক ইস্যু। ‘গ্লোবাল সাউথ’ এবং ‘গ্লোবাল নর্থে’র মধ্যে এই নিয়ে শত বছর ধরে ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে। পণ্য বা ওষুধের মেধাস্বত্ব প্রয়োগ হবে কি হবে না, কোথায় হবে, কতটুকু হবে, এটা একটা দরিদ্র দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং স্থানীয় শিল্পের অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। কাজেই এটিকে শুধু একটা কাস্টমস ইস্যু বা প্রশাসনিক ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

কাঁচামালের পেটেন্ট নির্ণয় আন্তর্জাতিকভাবেই ঝামেলাপূর্ণ বিষয়। হাজারো মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। সেই হিসাবে এটি একটি জুডিশিয়াল বা বিচারিক ইস্যুও। আফ্রিকায় এইডস বা টিবির ওষুধের অভাবে অজস্র রোগীর মৃত্যুর পরে ওষুধ উৎপাদনে পেটেন্ট আইনের কঠোর প্রয়োগের বিরুদ্ধে আফ্রিকা জুড়েই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।

এই মাত্রার একটি স্পর্শকাতর এবং তুমুল বিতর্কের বিষয়কে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লেন্স থেকে দেখা জরুরি, দেশে দেশে পেটেন্ট-সম্পর্কিত আইনি লড়াইয়ের ইতিহাসগুলোও ঘেঁটে দেখা প্রয়োজন।

অথচ চুক্তিতে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার মেধাস্বত্বের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জরুরি আলাপগুলোকে বিচার্য-বহির্ভূত করে এটাকে শুধু একটি পুলিশি ইস্যুতে নামিয়ে এনেছে। ব্যাপারটা এ রকম যে জাপান থেকে ট্র্যাক করবে, সচিবালয় থেকে ঢালাও নির্দেশ দেওয়া থাকবে—সবাইরে ধরো, আর কাস্টমস গ্রেপ্তার করবে। অথচ প্রতিটি পেটেন্ট ইস্যু গভীর পর্যবেক্ষণ করার দাবি রাখে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিসের টেকনিক্যাল এবং আইনগত (লিগ্যাল) দক্ষতার ঘাটতি আছে। একেকটি নতুন আবিষ্কারের পেটেন্ট অধিকার কে, পাবে কে পাবে না—এটা নির্ধারণের জন্য যে অর্থনৈতিক-সামাজিক-বিচারিক বিচক্ষণতা, আইনি প্রশিক্ষণ, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল এবং জনস্বার্থের বোঝাপড়া প্রয়োজন, সেটা আসলেও নেই। আবার এ-সংক্রান্ত মামলাগুলো মোকাবিলা করার মতো দক্ষ আইনজীবীরও অভাব আছে। এটা যে শুধু টেকনিক্যাল বিষয় নয়, বরং একটা ‘জনস্বার্থ বনাম ব্যবসায়িক মুনাফা’ ইস্যু (পাবলিক ইন্টারেস্ট বনাম প্রফিট), সেটা বোঝার সক্ষমতায় ঘাটতি আছে এখানে।

এ রকম অপ্রস্তুত অবস্থায় আমরা আমাদের নিজেদের ওষুধ কোম্পানিগুলোর আইপি-রাইট লঙ্ঘনকে খপ করে ধরে ফেলার আমেরিকান/জাপানি প্রশিক্ষণ পাওয়াকে ‘প্রযুক্তির হস্তান্তর’ হিসেবে প্রচার করছি? বিশ্বজুড়ে পেটেন্ট বা ট্রেডমার্ক ইস্যুগুলোর মীমাংসা করতে দীর্ঘ কোর্ট লড়াইয়ের প্রয়োজন পড়ছে, অথচ মার্কিন চুক্তির মাধ্যমে আমরা আমাদের কোর্টের সার্বভৌমত্বকে তুলে দিচ্ছি আমেরিকার হাতে?

জেনেরিক ওষুধ কী এবং কেন? এলডিসি থাকার সুবিধা কী?

এলডিসি থাকার সুবিধা হলো, ‘জেনেরিক’ ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কোম্পানির পেটেন্ট ও লাইসেন্স নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে বলে রাখা ভালো, জেনেরিক ওষুধের কাঁচামাল বা উপাদান ব্র্যান্ডের ওষুধের মতোই হুবহু এক থাকে। সাধারণত ব্র্যান্ডের ওষুধের পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেই অন্যরা এই ওষুধ উৎপাদন করে। তখনই এটাকে বলা হয় জেনেরিক। এলডিসি হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে পেটেন্ট ফি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই বাংলাদেশের। এ দেশের শত শত ওষুধ কোম্পানির বিকাশই ঘটেছে, জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন করে, মেধাস্বত্ব আইনের ছাড় নিয়ে।

আমাদের ওষুধশিল্পের বড় শক্তি হলো, এটি একটা ‘হাই ভলিউম-লো মার্জিন’ উৎপাদন শিল্প। এ ছাড়া ওষুধের দাম কয়েক দশক ধরে জনগণের আওতায় থাকাটা আমাদের ওষুধনীতির (১৯৮২) একটা অনন্য অর্জন। আমরা পাড়ার দোকান থেকে ৫০ টাকায় জেনেরিক ড্রাগস কিনছি, এদিকে আমেরিকা বা ইউরোপে এই দাম হয়তো শতগুণ বেশি। আমাদের ওষুধশিল্প দেশের প্রায় সম্পূর্ণ চাহিদা মেটাচ্ছে (৯৭ শতাংশ), আবার ১০০টি দেশে রপ্তানিও করছে। ওষুধশিল্পের এই জরুরি বিকাশটা সম্ভব হয়েছে এলডিসি হিসেবে পেটেন্ট আইনের শিথিলতা বা ছাড়ের কারণেই।

এখন বাংলাদেশকে যদি এলডিসি থেকে বের করা যায়, অথবা আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আইপি ফি পরিশোধ করতে বাধ্য করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের শত শত কোম্পানির পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে সস্তায় ওষুধ উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। আমেরিকা সেটাই চায়। চুক্তিতে সেটা স্পষ্ট।

এদিকে দেশের ১৮২টি ওষুধ কোম্পানির বেশির ভাগই ছোট কোম্পানি। আমেরিকার শর্ত অনুযায়ী কঠোর মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হলে ছোট কোম্পানিগুলোর পক্ষে পেটেন্ট ফি দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে, ২০ কোটি মানুষের ওষুধের নিরাপত্তা চলে যেতে পারে হাতে গোনা কয়েকটি বড় কোম্পানি এবং বিশেষ করে বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানিগুলোর হাতে।

পেটেন্ট নির্ণয় জটিলতা

দেশে অনেক প্রয়োজনীয় ও বহুব্যবহৃত ওষুধ আছে। ধরলাম, এমন একটি ওষুধ তৈরি করতে কাঁচামাল হিসেবে সল্ট-১ আমদানি করতে হয়। এখন এলডিসির সুবিধা থাকায় দেশিও কোম্পানি এখন পর্যন্ত এটি পেটেন্ট ফি ছাড়াই আমদানি করতে পারে। কিন্তু চুক্তি কার্যকর হলে ওমিপ্রাজল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত এই লবণ বা এর কাছাকাছি যেকোনো উপাদানের পেটেন্ট করা থাকলে আমাদের ওষুধ কোম্পানিগুলোকে পেটেন্ট ফি পরিশোধ করতে হবে।

এভাবে প্রতিটি নতুন ওষুধ, নতুন কাঁচামাল, অথবা পুরোনো কাঁচামালের নতুন সংস্করণ—এমন নানাবিধ পেটেন্টের বাধা পেরিয়ে উৎপাদন করতে হলে দেশের ওষুধ শিল্পের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে। যে কারণে আমাদের বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোই বলছে, এই চুক্তি ‘রিভিউ’ করারও সুযোগ নেই। চুক্তির মেধাস্বত্ব আইনের প্রতিটি ধারাই পুরো ওষুধশিল্পের জন্য বিপর্যয়মূলক।

জনস্বার্থ বনাম কোম্পানির মেধাস্বত্ব

বিশ্বের অনেক দেশ এখন মেধাস্বত্ব আইন করছে যথেষ্ট বিচক্ষণতার সঙ্গে এবং পেটেন্ট-বিষয়ক জটিলতাগুলো মোকাবিলা করে। স্থানীয় ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য এবং ‘অ্যাকসেস টু মেডিসিন’-এর আদর্শ ধরে চলে।

ব্রাজিল, মিসর বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও তাদের পেটেন্ট অফিসকে বহু বছর ধরে প্রশিক্ষিত করেছে জাতীয় স্বার্থের বোঝাপড়া থেকেই। এই দেশগুলোর পেটেন্ট অফিস ‘জনস্বার্থ’ এবং ‘কোম্পানির স্বার্থে’র মাঝামাঝি একটা ভারসাম্য বজায় রাখার দক্ষতা অর্জন করেছে।

 নাটকো বনাম রোশ: পেটেন্ট বনাম পাবলিক ইন্টারেস্ট

ভারতীয় কোম্পানি নাটকো রিসডিপ্লাম নামের একটি মেরুদণ্ডের ওষুধ উৎপাদন করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই ওষুধের মূল পেটেন্ট সুইস কোম্পানি রোসের। রোস মামলা করে বসল—এই ওষুধ তৈরি করতে হলে ভারতীয় কোম্পানিকে রয়্যালটি পরিশোধ করতে হবে। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর ভারতীয় হাইকোর্ট নাটকোর পক্ষেই রায় দেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করার অধিকার পায় নাটকো।

 নাটকো জেনেরিক সংস্করণ তৈরি করার পর দেখা গেল প্রতি বোতলে খরচ পড়ছে ১৫ হাজার রুপি, যেখানে একই ওষুধ রোস বিক্রি করত ছয় লাখ রুপিতে। অর্থাৎ স্থানীয় উৎপাদনের ফলে ওষুধের খরচ কমেছে ৯৭ শতাংশ! খেয়াল করুন, ভারতীয় কোর্ট বিদেশি কোম্পানির পেটেন্ট অধিকারের পক্ষে রায় দিলে ভারতীয় জনগণ এত সুলভে এই দুর্লভ ওষুধটি পেত না। কোর্টের এই সিদ্ধান্তকে তাই মেধাস্বত্ব আইনের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী রায় হিসেবে দেখা হয়। এই রায় একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: জনস্বার্থ আগে, কোম্পানির স্বার্থ পরে।

ওষুধের দাম বাড়বে কি?

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষ!

সম্প্রতি ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট রিভিউ’তে চারজন গবেষক মিলে দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোকে পেটেন্ট ফি দিতে হলে দেশে উৎপাদিত ইনসুলিনের দাম ১১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এ ছাড়া কেমোথেরাপি ড্রাগ, অনকোলোজি বা ক্যানসারের ওষুধ, হেপাটাইটিস সি ওষুধের দাম বাড়বে। এদিকে বাংলাদেশের মার্কেট মনিটরিং কাঠামোটি অত্যন্ত দুর্বল। অনিয়ন্ত্রিত মার্কেটে প্রশাসনিক এবং ‘জুডিশিয়াল’ অপ্রস্তুতির কারণে জেনেরিক ওষুধের দাম ১০০০ শতাংশ পর্যন্তও বৃদ্ধি পেতে পারে। শুধু দাম বাড়া নয় অনেক ওষুধ দুষ্প্রাপ্যও হয়ে উঠবে। বেশি দাম দিয়েও পাওয়া যাবে না।

এমনিতেই বাংলাদেশের ‘আউট-অব-পকেট’ মেডিকেল খরচ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এখন ২০ টাকার জেনেরিক ওষুধ যদি ৫০০ টাকায় কিনতে হয়, জনস্বাস্থ্য খাতে দুর্যোগ নামবেই।

ওষুধশিল্পকে বিপদে ফেলার পেছনে কে?

খেয়াল করুন, মার্কিন চুক্তি আমাদের এলডিসি হওয়ার সুবিধাগুলো কেড়ে নিচ্ছে। এলডিসি থাকার ফলে ডব্লিউইউটিইউ-এর আওতায় বাংলাদেশ যে সুবিধাগুলো পেয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতায় সেই জরুরি সুবিধা এবং পলিসি তৈরির সার্বভৌমত্ব নিজের ইচ্ছায় বিসর্জন দিয়ে এসেছে ‘টিম বাংলাদেশ’। উল্টো আরও নতুন ১৫টি শর্ত ঘাড়ে করে নিয়ে এসেছে।

আমেরিকা শর্ত, স্যাংশন, ট্যারিফ চাপাবেই। এটা আমেরিকার পুরোনো অভ্যাস।

কিন্তু নিজ আগ্রহে নিজের দেশের স্থানীয় প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এল কারা? এই চুক্তির পক্ষে গোপনে ও প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছে কারা?

দেশীয় পোশাকশিল্প, স্থানীয় পোলট্রি ও ডেইরি শিল্প, ওষুধশিল্প এবং কৃষি খাতের যাবতীয় অর্জনকে বিসর্জন দিয়ে এই চুক্তি কার্যকর করতে দীর্ঘদিন ধরে আটঘাট বেঁধে কাজ করলেন কারা?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইকোনমিক রিলেশন ডিভিশন (ইআরডি), অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা (যিনি বর্তমান সরকারের মন্ত্রী) এবং ইআরডির কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই চুক্তি করতে এতটা মরিয়া ছিলেন কেন? এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, তাঁদের অনেকেই আবার হাসিনা সরকারের আমলেও বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়ার জন্য প্রচারণা চালিয়েছেন।

হাসিনা সরকারের হিসাব আলাদা ছিল। প্রবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে রুজি, রুটি, কর্মসংস্থান ও জনস্বাস্থ্যের মতো জরুরি ইস্যুগুলো বাদ দিয়ে অন্তঃসারশূন্য মধ্য আয়ের গরিমায় ডুবে ছিল গোটা রাষ্ট্র। জিডিপির পরিসংখ্যানে কারচুপি করা হয়েছে, মানব উন্নয়ন সূচকগুলো ভুলভাবে দেখানো হয়েছে এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মতো অপ্রয়োজনীয় সূচকের ওপর দাঁড়িয়ে এলডিসি থেকে উত্তরণের খালি কলসি-মর্যাদার পেছনে ছুটেছে সরকার।

অথচ কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন নাগরিক মাত্রই মানবেন যে এত বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষ এবং এত ভয়াবহ বেকারত্ব নিয়ে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হলে আমাদের স্থানীয় উৎপাদকেরা একের পর এক বাণিজ্যসুবিধা হারাবেন। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, কোটি কোটি গরিবের দেশে এলডিসির সব সুবিধা ছেড়ে এত অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বাধ্যবাধকতা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করার মতো জাতীয় স্বার্থবিরোধী বন্দোবস্ত করলেন যাঁরা, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।

  • মাহা মির্জা লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব