ইয়েমেনের আল-জাওফ এলাকায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলার সময় গুলি ছুড়ছেন ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনের আল-জাওফ এলাকায় সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর ওপর হামলার সময় গুলি ছুড়ছেন ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মতামত

গোয়েন্দা যুদ্ধে বিপাকে হুতিরা, হাতছাড়া হতে পারে জয়

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টের পতন কিন্তু কেবল হুতিদের বিপুল সদস্যসংখ্যার কারণে ঘটেনি, এটি ছিল মূলত রাশিয়া ও ইরানের একটি যৌথ সামরিক কমান্ড ব্যবস্থার ফলাফল। সেখানে রাশিয়ার মহাকাশভিত্তিক ‘জিওইন্ট’ (ভূস্থানিক গোয়েন্দা তথ্য) এবং ‘সিগইন্ট’ (সংকেত গোয়েন্দা তথ্য) ব্যবহারের সক্ষমতাকে ইরানের নেতৃত্বাধীন একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল (সি২) কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল, যা মূলত হুতিদের যুদ্ধক্ষেত্রের সিদ্ধান্তগুলোকে সহায়তা করত।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় তারিক সালেহের ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস’(এনআরএফ)-এর ভেতরে মানুষের অনুপ্রবেশ, যা সেই পুরো প্রযুক্তিগত তথ্যকে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব সুবিধায় পরিণত করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় আমার তৈরি করা জিওইন্ট ও সিগইন্ট মেলবন্ধন প্রযুক্তি ‘প্রজেক্ট অরোরা’-র মাধ্যমে আমি সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডানের ওপর রাশিয়ান সামরিক নজরদারি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেছিলাম।

এই প্রকল্পের একটি বিশেষ অংশ (এসএপি) পুরো রাশিয়ান স্যাটেলাইট নজরদারিকে একটি একক বহুমুখী ব্যবস্থা হিসেবে উন্মোচন করেছিল। এখান থেকেই বেরিয়ে এসেছিল, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যেসব নির্ভুল হামলা চালিয়েছিল, সেগুলোর পেছনে কীভাবে রাশিয়ার এই নজরদারি কাজ করেছিল।

আমার এই গবেষণাই পরবর্তী সময় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার স্যাটেলাইট সহায়তা নিয়ে সিএনএনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

উন্নত মহাকাশভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য (আইএসআর) কেবল একটি সাধারণ সহায়তা ব্যবস্থা নয়; বরং হামলার আগেই যুদ্ধের ময়দানের স্পষ্ট চিত্র তৈরি করে দিতে সক্ষম, ইরান যুদ্ধের সময় বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। রাশিয়ার ‘জিওইন্ট’ প্রযুক্তি স্পষ্ট করে দিয়েছিল সামরিক বাহিনীর অবস্থান, যোগাযোগের পথ, সদর দপ্তর এবং রসদ আদান-প্রদানের চিত্র। আর ‘সিগইন্ট’ উন্মোচন করেছিল ইলেকট্রনিক সংকেত, যোগাযোগের ধরন এবং কমান্ড কাঠামোর অভ্যন্তরীণ রূপ।

ফলে সামরিক বাহিনীর চলাচল কিংবা তাদের অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তের স্থিতিশীল ছবি হিসেবে নয়; বরং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া গতিশীল রূপ হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছিল। ইরান যুদ্ধে স্যাটেলাইট তথ্যের এই বহুমুখী ব্যবহারের ফলেই ইরানি বাহিনী নিজেদের হামলাগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে পেরেছিল।

তবে ইয়েমেনে এই কাজের গতিপথ ঠিক করে দেওয়ার মূল দায়িত্বটি পালন করেছে ইরান। তারা রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে হুতিদের আঞ্চলিক সামরিক তথ্য ও মাঠপর্যায়ের মানবসূত্রের যোগসূত্র ঘটায়।

এর ফলে তারিক সালেহের বাহিনী কীভাবে কাজ করছে, তার বিস্তারিত চিত্র ফুটে ওঠে: কোন সদর দপ্তরগুলো সক্রিয় আছে, কোথায় মাঠপর্যায়ের রিপোর্টের সঙ্গে বাস্তব অবস্থানের ফারাক রয়েছে এবং কোন অঞ্চলগুলোয় সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।

হুতিদের সহায়তাকারী বর্তমান ব্যবস্থাটি অনেক বেশি জটিল। রাশিয়া স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করে, আর ইরান সেই তথ্যকে হুতিদের কমান্ড ও ছকে যুক্ত করে।

এমনকি এনআরএফ এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর (জেএফসি) মধ্যে কোথায় যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে, তা-ও ধরে ফেলেছিল তারা। এই দুর্বলতাগুলো কাজে লাগিয়েই তারা উপকূলীয় পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

ঠিক এই জায়গাতেই তাদের প্রধান প্রতিরক্ষাদেয়ালটি ভেঙে পড়েছিল। একদিকে জেএফসি সদর দপ্তরের সঙ্গে এনআরএফের একটি বড় অংশের যোগাযোগের পথ তৈরি হয়েছিল, অন্যদিকে নিজেদের ওপরের সারির নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের আরেকটি যোগাযোগের পথ বজায় ছিল।

কিন্তু যখন এই দুটি পথই অবিশ্বাস্য ও বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে, তখন ভুল তথ্য ওপরের দিকে পৌঁছাতে থাকে এবং বিভ্রান্তিকর ও হেরফের করা নির্দেশ নিচের দিকে আসতে শুরু করে।

এর ফল হয় মারাত্মক। একজন এনআরএফ কমান্ডার শত্রুকে ঠেকানোর নির্দেশ গ্রহণ করার পরপরই নিজের অবস্থান ছেড়ে পিছিয়ে যান। অপর একজন কমান্ডার ভুল রিপোর্ট দেন যে একটি অ-এনআরএফ ইয়েমেনি দল সামরিক বিমানঘাঁটি খালি করে দিয়েছে, অথচ সেখানে তখনো সেনাসদস্যরা অবস্থান করছিলেন।

লোহিত সাগরের উপকূলজুড়ে হুতি যোদ্ধাদের অগ্রগতি উদ্‌যাপন। গতকাল ইয়েমেনের রাজধানী সানায়

এর ফলে নিজেদের অনুগত বাহিনীর অবস্থান নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমান্ড একটি ভুল বার্তা পায় এবং হামলার কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটে। মোকায় অবস্থানরত একটি সৌদি বিশেষ বাহিনীর দল প্রথম বুঝতে পারে যে মাঠপর্যায়ের আসল পরিস্থিতির সঙ্গে সামরিক যোগাযোগের কোনো মিল নেই।

সৌদি বিমান হামলার পূর্ণ প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় তারা মুক্তভাবে বিমান হামলা চালাতে পারছিল না। এর মধ্যে নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যখন দেখা যায় কিছু এনআরএফ ব্রিগেড সক্রিয় করার সময় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বায়োমেট্রিক নিবন্ধিত সদস্যই অনুপস্থিত ছিল।

মাসব্যাপী নিবন্ধনের পর এই অনুপস্থিতি সেনাদলকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। জাবাল আল-নারের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির চারপাশে সমন্বয় ব্যাহত হওয়ায় হুতিরা পৌঁছানোর আগেই এনআরএফের অনেক ইউনিট তাদের অবস্থান ছেড়ে সরে যেতে বাধ্য হয়।

সেই বিপর্যয়ই সামরিক অভিযানের মূল শিক্ষণীয় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। এখন প্রধান উত্তরাঞ্চলীয় সেনাদলগুলোর সঙ্গে যৌথ সৌদি-ইয়েমেনি এবং সৌদি-পাকিস্তানি জেটিএসি টিম যুক্ত করা হয়েছে, যারা মাঠপর্যায়ের বাহিনীর সঙ্গে জেএফসির মূল স্ট্রাইক সিস্টেমের নির্ভরযোগ্য সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।

এর সঙ্গে সৌদি ওএমএলটি সরাসরি জেএফসির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং স্বাধীনভাবে সেনাসংখ্যা, অবস্থান ও প্রস্তুতির তথ্য যাচাই করছে। একই সঙ্গে, কমান্ডের ইতিবাচক যাচাইকরণ, গোপনীয় তথ্য আদান-প্রদান এবং বিকল্প সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে মোকায় তৈরি হওয়া দুর্বলতাগুলো বন্ধ করা হচ্ছে।

সৌদি আরব এর আগেও ভিন্ন একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একই কৌশল ব্যবহার করেছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, জেএফসির সামরিক কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স সফলভাবে দক্ষিণ ইয়েমেনে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি) দেওয়া আবুধাবির কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল ব্যবস্থা চিহ্নিত ও অকার্যকর করে দেয়।

একই সময়ে সামরিক লিয়াজোঁ ও টার্গেটিং কাঠামোর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির সঠিক চিত্র বজায় রাখা সম্ভব হয়। বাহ্যিক সাহায্য উঠে যাওয়ার পরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের টাস্কফোর্স এবং তাদের সহযোগী বাহিনীগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের মুখে দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয়।

ইয়েমেনের সানায় সৌদি দূতাবাসের দেয়ালে স্থানীয়দের আঁকা একটি গ্রাফিতি। এতে দেখানো হয়েছে হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেন উপকূলে ইসরাইয়েলি জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছেন

তবে হুতিদের সহায়তাকারী বর্তমান ব্যবস্থাটি অনেক বেশি জটিল। রাশিয়া স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করে, আর ইরান সেই তথ্যকে হুতিদের কমান্ড ও ছকে যুক্ত করে।

তবে এই উচ্চ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থারও কিছু নির্দিষ্ট দুর্বলতা রয়েছে—এটি পুরোপুরি সুরক্ষিত যোগাযোগ, বিশেষায়িত কর্মী, ইন্টেলিজেন্স-ফিউশন নোড, কারিগরি উপদেষ্টা এবং সানার সঙ্গে মূল যুদ্ধক্ষেত্রের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমানে সেই দুর্বলতাগুলোই সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সানাভিত্তিক ইরানি নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমান্ড ও কন্ট্রোল–কাঠামোর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানা হয়। মাঠপর্যায়ের সুনির্দিষ্ট তথ্যে জানা গেছে, হুতিদের বড় বড় ক্ষতির মধ্যে অন্তত ২ জন মেজর জেনারেল, ৭ জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এবং ৩২ জন কর্নেল নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া মেজর জেনারেল পদের চেয়েও বড় কর্মকর্তাদের এ অভিযানে নিরপেক্ষ বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার প্রবল ইঙ্গিত রয়েছে, সঙ্গে তাঁদের সহযোগী বিদেশি কর্মীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে এই বিষয়ক নির্দিষ্ট তথ্যগুলো কৌশলগত কারণেই এ মুহূর্তে চেপে যাওয়া হচ্ছে।

তবে এই নিহত ব্যক্তির সংখ্যার থেকেও এর প্রভাব কতটা পড়েছে, সেটাই এখন মূল বিষয়। সানায় জেএফসির নিখুঁত বিমান হামলায় হুতিদের উচ্চপর্যায়ের কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাদের সামনের সারির কমান্ড স্ট্রাকচার পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ কারণে গোয়েন্দা তথ্য গ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যকার সংযোগটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

ঠিক এ কারণেই হুতিদের অগ্রযাত্রা এখন আর পশ্চিম উপকূলের সামরিক সাফল্যের মতো গতি পাচ্ছে না। যেসব যোগাযোগের দুর্বলতাকে তারা অতীতে কাজে লাগিয়েছিল, সেগুলো এখন শক্তিশালী করা হয়েছে; আর তাদের নিজেদের বাহ্যিক সহায়তায় পরিচালিত কমান্ড নেটওয়ার্কটি দিন দিন অন্ধ ও উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে।

কাজেই পশ্চিম উপকূলের পরাজয়টি সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর জন্য একটি স্থায়ী দুর্বলতা হয়ে থাকেনি; বরং তারা এটিকে একটি বড় শিক্ষা হিসেবে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জেএফসি তাদের পুরো ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করেছে। হুতিদের অব্যাহত সামরিক তৎপরতা সৌদির দীর্ঘদিনের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। ফলে যে বড় সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে, তা এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন হুতিদের বাহ্যিক কমান্ড সহায়তার ওপর ইতিমধ্যেই বড় ধরনের আঘাত হানা হয়েছে।

এটাই হলো সবচেয়ে বড় নির্ণায়ক পার্থক্য। বড় আকারের সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান, স্থল ও নৌ অভিযান পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হওয়ার আগেই হুতিদের মূল চালিকা শক্তি রাশিয়া-ইরান জোটের যৌথ ব্যবস্থাটিকে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। আর এর বিপরীতে মোকা সীমান্তে প্রকাশ পাওয়া নিজেদের সাময়িক কৌশলগত ভুলগুলোকে সৌদি পরিচালিত জেএফসি ইতিমধ্যেই শুধরে নিয়েছে।

  • নওয়াফ ওবাইদ কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধ বিভাগের সিনিয়র ফেলো।

    আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।