অনেক অনুন্নত অর্থনীতির একটা রোগ এমন হয়, যখন মাথাপিছু আয় একটা স্থিতিশীল ভারসাম্যমূলক পরিস্থিতিতে গিয়ে আটকে যায়। এই আয় দিয়ে জীবনধারণের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো যায় বটে, কিন্তু সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করার সংস্থান থাকে না। আয়ের কিছু যদি আদৌ উদ্বৃত্ত থাকেও, তার খুব সামান্য অংশই নিট বিনিয়োগের খাতে প্রবাহিত হয়।
যদি মূলধনের পরিমাণ, অর্থাৎ পণ্য ও সেবা উৎপাদনে ব্যবহৃত কারখানা ও যন্ত্রপাতি, জমি ও ভবন, প্রাকৃতিক সম্পদ ইত্যাদি বৃদ্ধিও পায়, তার সঙ্গে জনসংখ্যাও বাড়তে থাকে সমানতালে। ফলে শ্রমিকপ্রতি মূলধনি সরঞ্জাম তথা উৎপাদনের উপকরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় না। যদি মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক ধরা হয়, তাহলে বলা যায়, এই অর্থনীতিগুলোতে কোনো প্রবৃদ্ধি ঘটে না। এই ধরনের অর্থনীতি সম্পর্কে বলা যায়, এগুলো ‘নিম্ন স্তরের ভারসাম্য ফাঁদ’-এ (লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম ট্র্যাপ) আটকা পড়ে আছে।
এখন থেকে সত্তর বছর আগে ওপরের তত্ত্বটি দিয়েছিলেন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ রিচার্ড আর নেলসন। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, কেন অনুন্নত বা নিম্ন আয়ের দেশগুলো প্রায়ই দারিদ্র্য ও স্থবিরতার এক দীর্ঘস্থায়ী চক্রে আটকা পড়ে থাকে।
কারণ, মাথাপিছু আয় সামান্য বৃদ্ধি পেলে জন্মহার বেড়ে যেতে পারে অথবা মৃত্যুহার কমে যেতে পারে; অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মোট জাতীয় আয় বা পুঁজি গঠনের হারকে ছাড়িয়ে যায়, যা মাথাপিছু আয়কে টেনে নামিয়ে জীবনধারণের আগের ন্যূনতম ভারসাম্য পর্যায়ে ফিরিয়ে আনে। এভাবেই অর্থনীতি একটা ফাঁদে আটকে পড়ে, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
অতি সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) বিশ্লেষণে বাংলাদেশের অর্থনীতির এমনই কাঠামোগত ফাঁদে পড়ার কথা উঠে এসেছে। এই বিশ্লেষণে নেলসনের ‘নিম্ন স্তরের ভারসাম্য ফাঁদ’-এর কথা না বললেও তিনটি ফাঁদের কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে পরিবারের আর্থিক দুর্দশার কারণে ঋণ করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে খাওয়ার প্রবণতা। দ্বিতীয়টি, বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া; আর তৃতীয়টি, রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার ফাঁদ।
পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এই তিন ফাঁদ অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ, প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। এই শ্রেণি এমন এক ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’ অবস্থানে রয়েছে, যারা যেকোনো সময় আবার দারিদ্র্যের চক্রে পড়ে যেতে পারে। দেশের মাঝারি ও চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৯ এবং ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। অর্ধেক পরিবার দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে নিয়মিত চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তাদের সঞ্চয় এবং আটকা পড়ছে ঋণের জালে।
এই উপসর্গের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনিয়োগ স্থবিরতা। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রবৃদ্ধির হার কমে ৩ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সরকারি তথ্য অনুযায়ীও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত কমে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরে ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
নেলসনের ‘নিম্ন স্তরের ভারসাম্য ফাঁদ’ কিংবা পিপিআরসির ‘কাঠামোগত ফাঁদ’—যেভাবেই বলা হোক না কেন, বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ স্থবিরতা, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, নিম্নগামী জিডিপি আর রাজনৈতিক-প্রশাসনিক দুর্বলতা, এই উভয় ধরনের ফাঁদের অস্তিত্বের সত্যতাকে স্বীকার করে। পিপিআরসির পক্ষ থেকে সরকারকেও এই সত্যতা স্বীকার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রোগকে অস্বীকার করে তার চিকিৎসা কখনোই সম্ভব নয়।
বিনিয়োগ পরিস্থিতির এমন হতাশাজনক হারের কারণে কমে গেছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিও। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধির হার ধরেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী এই প্রবৃদ্ধির হার হবে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা গত হবে গত ৩৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
পিপিআরসির জরিপে দেখা গেছে, একদিকে দারিদ্র্যের হার যেমন বাড়ছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ, যার ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। টানা কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মারাত্মকভাবে। আইএমএফ মনে করছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১১ শতাংশের ঘর ছুঁয়ে ফেলবে। আর সেটা হবে বিগত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০১০-১১ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ।
পিপিআরসির আরেকটি উদ্বেগ হচ্ছে শাসনব্যবস্থার ফাঁদ। রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ব্যাপক ঋণনির্ভরতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও সরকারি ব্যয়ে চরম অদক্ষতার কারণে অপচয় ঘটেছে রাষ্ট্রীয় সম্পদে।
আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ ও ৭ শতাংশের ঘর থেকে কিছুতেই উঠতে পারছে না। ফলে উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার মতো আয় সরকারের নেই। তাই বাজেটের খরচ মেটানোর জন্য হাত পাততে হয় বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছে। পরবর্তী সময় এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তার জন্য আবারও ঋণ নিতে হয়। অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা না বাড়িয়ে ক্রমাগত ঋণের ফাঁদে জড়াতে হচ্ছে আমাদের।
নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অন্যতম হলেও পৃথিবীতে আরও কিছু দেশ আছে, যাদের এই অনুপাত আরও কম, যেমন আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ লিবিয়া, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ইত্যাদি। কারণ, এসব দেশের মূল রাজস্ব আসে তেল বিক্রি থেকে, জনগণের করের টাকা থেকে নয়। সুদান, ইয়েমেন বা ইথিওপিয়ার কর-জিডিপি অনুপাতও আমাদের চেয়ে কম।
এদের মধ্যে সুদানে রয়েছে সোনা ও তেল, ইয়েমেনেরও রয়েছে তেল। অথচ অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, যুদ্ধ ইত্যাদি কারণে এই দেশগুলোর কর-জিডিপি অনুপাতও বাংলাদেশের চেয়ে কম। তবে এই তুলনায় এমন ভাবা যাবে না যে আরব দেশগুলোর অবস্থা আমাদের চেয়ে খারাপ। পিপিআরসির জরিপেও বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্বলতা অদক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
নেলসনের ‘নিম্ন স্তরের ভারসাম্য ফাঁদ’ কিংবা পিপিআরসির ‘কাঠামোগত ফাঁদ’—যেভাবেই বলা হোক না কেন, বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ স্থবিরতা, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, নিম্নগামী জিডিপি আর রাজনৈতিক-প্রশাসনিক দুর্বলতা, এই উভয় ধরনের ফাঁদের অস্তিত্বের সত্যতাকে স্বীকার করে। পিপিআরসির পক্ষ থেকে সরকারকেও এই সত্যতা স্বীকার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রোগকে অস্বীকার করে তার চিকিৎসা কখনোই সম্ভব নয়।
এই ফাঁদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য নেলসনের কয়েকটি পরামর্শ ছিল। যেহেতু জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে ক্ষুদ্র বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যায় না, তাই ব্যাপক বিনিয়োগ বা ‘বিগ পুশ’ দিয়ে বিনিয়োগের দৃশ্যমান ইতিবাচক ভূমিকা নিশ্চিত করা, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, আধুনিক ও কার্যকর উৎপাদন পদ্ধতি প্রয়োগ করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থান বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধির হার বাড়ানো, সামাজিক-রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রবণতাকে উৎসাহিত করা। এই সংস্কারের মধ্যে রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা ও আহরণের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।
একইভাবে অর্থনীতির ফাঁদগুলো থেকে বের হয়ে আসার জন্য পিপিআরসির পরামর্শের মধ্যে রয়েছে: অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এবং সবার জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন-সরবরাহসেবা ও পরিচর্যাসেবাকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে কারিগরি দক্ষতা ও ডিজিটাল জ্ঞান বৃদ্ধি করা, ক্ষুদ্র উদ্যোগকে বড় ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং সরকারি সেবার স্বচ্ছতা, সময়সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা।
উল্লেখ্য, এসব পরামর্শের আলোকে কিছু উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি হলেও স্বল্প মেয়াদে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধি করে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো। তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এটিকে। তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে কথার ফুলঝুরির বদলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সর্বাত্মক ও কার্যকর প্রয়াস, যাতে এসব ফাঁদ থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ফারুক মঈনউদ্দীন লেখক ও ব্যাংকার
fmainuddin@hotmail.com
মতামত লেখকের নিজস্ব