আজ থেকে ৪৫ বছর আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ওই দিন ভোর সাড়ে পাঁচটা অথবা তার একটু পরে তৎকালীন আর্মি অপারেশন ডাইরেক্টর প্রয়াত মেজর জেনারেল (তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার) আবদুল ওয়াহেদ আমাকে ফোন করে তাৎক্ষণিকভাবে সেনা সদর অপারেশন ডাইরেক্টরেটে আসতে বলেন। আমি ওই ডাইরেক্টরেটের অপারেশন সেকশনে লে. কর্নেল পদে ছিলাম।
ওই সময়ে প্রায়ই অফিসে যাওয়ার ডাক আসত। মাঝেমধ্যে গভীর রাতেও যেতে হতো শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের আগমনের কারণে। তিনি ওই সময়ে পুনর্গঠিত সামরিক বাহিনীর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের জন্য লাগসই রণনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন ও নির্দেশনা দিতেন। ওই সব নির্দেশনা নিয়ে কাজ করার প্রধান দায়িত্ব ছিল এই ডাইরেক্টরেটের। করিডরে দেখা হলে স্মিত হেসে বলতেন, ‘কেমন আছ?’ বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিতাম, ‘স্যার, আপনার দোয়া।’ তিনি সবার জন্য একটা স্মিত হাসি দিয়ে ব্রিফিং রুমে চলে যেতেন।
এই স্বল্পভাষী মানুষটির সঙ্গে আমাদের বাঙালি ক্যাডেটদের পরিচয় হয় ১৯৬৬ সালের প্রথম দিকে, পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলের দ্বিতীয় কোম্পানিতে। ওই সময়ে দুজন বাঙালি প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন ভিন্ন প্লাটুনে। একজন তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান (পরে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি) এবং অন্যজন প্রয়াত ক্যাপ্টেন (পরে মেজর জেনারেল) আবদুল মান্নাফ। জিয়াউর রহমানের নাম ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় থেকেই শুনেছি।
ওই সময়ে জিয়াউর রহমান ১ম ইস্ট বেঙ্গল ইউনিটে লাহোর ফ্রন্টে যুদ্ধরত ছিলেন। ওই ইউনিটের বীরত্বগাথা আজও পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা রয়েছে। ওই যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর হাত থেকে লাহোর শহরকে বাঁচিয়েছিল এই বাঙালি পল্টন। যুদ্ধের পরে যত দিন এই বেঙ্গল রেজিমেন্ট লাহোরে ছিল, তত দিন লাহোরবাসী অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে পল্টনের সদস্যদের গ্রহণ করেছেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের প্রজন্মের অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। ওই প্রজন্মের সামরিক অফিসার এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবার কাছেই জেনারেল জিয়া, রাষ্ট্রপতি জিয়া এক অনুপ্রেরণা ও আদর্শবাদী নেতা হিসেবে চিরজীবী হয়ে থাকবেন।
যাহোক, ১৯৮১ সালের ৩১ মে। ওই দিন সকালে কোনো রকমে সেনা সদরে পৌঁছালাম। তিনতলায় অফিসে যেতে যেতে সিঁড়িতে দেখা হলো তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার (পরে জেনারেল) ওয়াহেদের সঙ্গে। তিনি কয়েকটি ফাইল হাতে নিয়ে নামতে নামতে বললেন যে আমি যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি এবং কী ঘটেছে তার বিবরণ নিই। তিনি আরও বললেন যে সার্কিট হাউসে হামলা হয়েছে রাষ্ট্রপতিকে হত্যার উদ্দেশ্যে। ওনার কথা শুনে ওখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার যত দূর মনে পড়ে, রাষ্ট্রপতি সাধারণত রাতে ঢাকার বাইরে থাকেন না। তাহলে কীভাবে কী হলো? এর পরের ঘটনা তো কারও অজানা নয়। তাই বিবরণে গেলাম না (আমার বই রক্তাক্ত অধ্যায় এবং রক্তাক্ত দিনগুলো দ্রষ্টব্য)।
আমি চেষ্টা করেছিলাম চট্টগ্রামে কী ঘটেছে তা জানার জন্য। জানা গেল যে রাষ্ট্রপতি প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ঢাকায় ফিরতে পারেননি এবং পার্টির অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় সমাধানের জন্য ওখানেই থেকে গিয়েছিলেন। ক্রমেই জানতে পারলাম যে চট্টগ্রামে সেনা বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে এবং সার্কিট হাউস আক্রমণে রাষ্ট্রপতিসহ আরও দুজন অফিসার নিহত হন।
পরে জানা যায় যে বিদ্রোহে সৈনিকেরা নন, চট্টগ্রাম ডিভিশনের অফিসাররা জড়িত ছিলেন, যাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন জিয়াউর রহমানের পরিচিত। এমনকি রাষ্ট্রপতির তৎকালীন পিএসও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে। এ ষড়যন্ত্র ও হত্যাকাণ্ডের অনেক বিবরণ বিভিন্ন লেখকের বইতে উঠে এসেছে। আমরা যারা জিয়াউর রহমানকে ১৯৬৬ সাল থেকে চিনি এবং পরে উপসেনাপ্রধান, সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখেছি, কখনো ভাবিনি তিনি এভাবে নিহত হবেন। এ কারণে তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনায় আমি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিলাম।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল জিয়া বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। সেই সময় তিনি দেশকে নিশ্চিত ধ্বংসের পথ থেকে বাঁচিয়েছিলেন। সেদিন তাঁর পাশে ঢাকা সেনানিবাসে আমিসহ ২০–২৫ জন কর্মকর্তা দাঁড়িয়েছিলাম। সেই সময় অনেক কর্মকর্তা কর্নেল আবু তাহেরের তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার হাতে নিহত হয়েছিলেন। সেদিন শুধু ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরেও সৈনিকেরা প্রতিরোধ করেছিলেন; নস্যাৎ হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ব্যর্থ অভ্যুত্থান। এই ব্যর্থতার কারণ ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াকে বন্দী করে অভ্যুত্থান ঘটানো। খালেদ মোশাররফ এমনকি তাহেরও হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে সৈনিক ও তরুণ অফিসারদের মধ্যে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। (রক্তাক্ত দিনগুলি দ্রষ্টব্য)।
জিয়ার জনপ্রিয়তা এবং ইমেজ গড়ে উঠেছিল শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার হিসাবেই নয়; বরং একজন সৎ, দক্ষ ও অকুতোভয় সৈনিক হিসেবে। তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দেশপ্রেম ছিল অতুলনীয়, যা এ দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। অনেকেই তাঁর বিপক্ষে থাকা সত্ত্বেও তিনি কারও প্রতি বিদ্বেষ রাখেননি, তিনি যোগ্যদের প্রাপ্য সম্মান দিয়েছেন।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরেও চট্টগ্রাম বিদ্রোহ এবং বিদ্রোহীদের পরাস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল সৈনিকদের অসহযোগিতা। চট্টগ্রামের সাধারণ সৈনিকেরা এমন একজন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডকে গ্রহণ করতে পারেননি। চট্টগ্রামের অভ্যুত্থান এবং জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর সাধারণ সৈনিকদের কাছ থেকে অভ্যুত্থানকারীরা কোনো সহযোগিতা পাননি।
জিয়ার হত্যাকাণ্ডের এক মাস পর জুলাই মাসে আমি যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজে যোগ দিই। সেখানে ৯০টি দেশের ১২০ জনের বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন, যার মধ্য আফ্রো-এশীয় দেশের কর্মকর্তাই বেশি ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি দেশের কর্মকর্তা আমার কাছে একই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কারা এবং কেন মুসলিম বিশ্বের এমন একজন বরেণ্য নেতাকে হত্যা করল?’ এর কোনো উত্তর আমার কাছে ছিল না।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, মুসলিম দেশগুলোতে তো বটেই, সমগ্র আফ্রো-এশীয় দেশগুলোতে জিয়াউর রহমান দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। মনে থাকার কথা যে ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দুটি মুসলিম দেশ ইরাক-ইরানের মধ্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। ওই সময় মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তানের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউল হকের সঙ্গে আরও দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে তিনজনের একটি কমিটি করা হয়েছিল। সেখানে গিনির রাষ্ট্রপতি আহমেদ সেকুতুরে ছাড়াও ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
এ কমিটি বহুবার দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা ও শান্তি স্থাপনের জন্য কাজ করছিল। রাষ্ট্রপতি জিয়ার তৎপরতা বাংলাদেশকে বিশ্বনেতৃত্বের কাতারে উন্নীত করিয়েছিল, আফ্রো-এশীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশের ভিন্ন পরিচয় তুলে ধরেছিল। সে সময় থেকেই বাংলাদেশের সামরিক কূটনীতির সূত্রপাত হয়েছিল।
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন দ্বার উন্মুক্ত করেন। তিনি ১৯৭৭ সালে প্রথম গণচীন সফর করেন এবং সেই সময় থেকেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সামরিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। ওই সময় থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। শুধু চীনেই নয়, তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রেও যে সম্মান দেখানো হয়েছিল, তা–ও ছিল বিরল। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাকে জোরালো করেছিল। তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য সার্কের ধারণা এবং প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষানীতি নিয়ে জিয়াউর রহমানের চিন্তাভাবনা ছিল সুদূরপ্রসারী। মনে পড়ে ১৯৭৫-৭৬-এর ডিসেম্বর-জানুয়ারি। সামরিক মহড়ার সময় জিয়া গ্রামগঞ্জে নিরাপত্তার জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বা ভিডিপি গঠন করেন। এটি ছিল শহীদ জিয়ার সুদূরপ্রসারী চিন্তাধারা।
পরিশেষে বলতে হয়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের প্রজন্মের অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। ওই প্রজন্মের সামরিক অফিসার এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবার কাছেই জেনারেল জিয়া, রাষ্ট্রপতি জিয়া এক অনুপ্রেরণা ও আদর্শবাদী নেতা হিসেবে চিরজীবী হয়ে থাকবেন।
ড. এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব