বিরূপাক্ষ পালের কলাম

প্রথম বাজেটে গণিতের চেয়ে নিশানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ

বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে সবচেয়ে বড় ক্ষত রাজস্ব দুর্বলতা। এ নিয়ে বিশ্লেষকদের রাতে ঘুম নেই। গণিত আর মিলছে না। কিন্তু একটি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার নিশানাগুলো জনতাকে বুঝিয়ে দেওয়া। সে বিচারে বাজেট খুব একটা বেপরোয়া নয়।

একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রথম শর্ত হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে জ্ঞান ও সুনামভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা। সে ক্ষেত্রে বিএনপি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদেই সুবিচার করতে পারেনি। কিন্তু শিক্ষায় সর্বোচ্চ মনোযোগ নিবিষ্ট করে তাদের প্রতিশ্রুতির একটি বড় নিশানা ঠিক রেখেছে। স্বাস্থ্য খাতও ভালো বরাদ্দ পেয়েছে, যার গুরুত্ব জ্ঞানী–গুণীর দেড়-বাৎসরিক সরকার বুঝতে পারেনি।

নতুন বাজেটে রাজস্ব দুর্বলতা যে খুবই প্রকট, তা বলা যায় না। কারণ, ২০২৭ অর্থবছরের মোট বাজেটের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে। এটি মোট ব্যয়ের ৭৪ শতাংশ। চলমান ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের রাজস্ব আয় হতে পারে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ।

এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেটের রাজস্ব আয় ছিল মোট ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ। এটি কম হওয়ার কারণ অদক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের নানামুখী মনোযোগ, জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতা ও বিনিয়োগের অধঃপতন। তবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের বিচারে এই বাজেট খুব একটা লাইনচ্যুত হয়নি। এটি আগের বাজেটের রেলগাড়িতে কয়েকটি নতুন বগি যুক্ত করেছে। সে অর্থে এটি আমলাদেরই আগের স্প্রেডশিটের ওপর কিছু সাহসী কাজ। আনুপাতিক বিন্যাস একই রয়েছে। তবে বাজেটের প্রস্তুতকর্মে ঝুঁকি বা চাপ ছিল মূলত তিনটি।

প্রথম ঝুঁকি ছিল বন্ধ কলকারখানা কীভাবে চালু করা হবে, তার বরাদ্দ-ভাবনায়। যেহেতু অধ্যাপক ইউনূসের মব-যুগীয় নৈরাজ্যে এগুলো ঘটেছে, সেহেতু এগুলোর দায় সরকারের ঘাড়েই বর্তায়। কৌশলে সেটি ঠেলে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘাড়ে।

দ্বিতীয় ঝুঁকি ছিল ইউনূস সরকারের আমলে উসকে দেওয়া পে স্কেলের ‘অকাল’ আগুন। এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক কার্যতালিকার মধ্যে ছিল না। নিশ্চিত বিদায় অনুমান করেই তাঁরা এই সুরের আগুন লাগিয়ে গেলেন। বেতন বৃদ্ধি সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা বটে। কিন্তু সেটি একটি নির্বাচিত সরকারের হাতেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। কারণ, এখানে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আদায়ের সিদ্ধান্ত থাকে। ঔচিত্যের সব কাজ একটি উন্নত দেশও একসঙ্গে করতে পারে না। তাকে অগ্রাধিকারের তালিকা তৈরি করতে হয়। তাই বিএনপি সরকার ধাপে ধাপে পে স্কেলের বাস্তবায়ন চাইছে।

তৃতীয় চাপ হচ্ছে ইউনূস আমলের ব্যাপক অনাদায়ি রাজস্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই তা প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। ওই সরকার দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নকর্ম সাধন না করলেও পরিচালন ব্যয়ে কোনো সাশ্রয় আনতে পারেনি। এই অদক্ষতা আর অপচয়ের খেসারত দিয়ে বাজেটকে প্রচলিত ধারায় টেনে তোলার কঠিন কাজটি করেছে এই সরকার। সে অর্থে অর্থমন্ত্রী জনাব চৌধুরী অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারেন। কিন্তু বাজেটের একেবারে প্রথম অধ্যায়ে অতীতের দোষারোপ, ধ্বংসস্তূপের দাবি ও প্রতিটি খাত নিয়ে হতাশার বিলাপ তার প্রাপ্য ধন্যবাদকেও অনেকটা খেলাপি বানিয়ে ফেলেছে।

বিএনপির রেখে যাওয়া ২০০৬ সালের প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি ২০২৪ সালে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার হলো কী করে? কী করে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করল? অর্থমন্ত্রীর কাছে এগুলোর কোনো গোপন জবাব রয়েছে কি? আমরা জানলে উপকৃত হতাম এবং ধ্বংসস্তূপ বা ভঙ্গুর—এ–জাতীয় ‘ন্যারেটিভ’ সানন্দে গ্রহণ করে নিতাম।

পৃথিবীর আদর্শ বাজেট বক্তৃতার প্রথম অধ্যায়ে থাকে নিশানার কথা, রাজনৈতিক দর্শনের বার্তা ও অর্থনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই ধ্রুবতারার সন্ধান। থাকে আশাবাদী সুর। অর্থমন্ত্রী প্রথম অধ্যায়ের অষ্টম ধারায় বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক ইঞ্জিন বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ক্রমেই দুর্বল হতে হতে একেবারে ধ্বংস হয়েছে।’ এটির ইংরেজি অনুবাদ বিদেশিদের কাছে এক ভয়াবহ বার্তা দেবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই জিডিপির আধা শতাংশ থেকে আরও নেমে গেলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

এই বাক্য দিয়ে যদি রিয়েলটি শোর ধাঁধা বানানো যায়, তাহলে এর উত্তরে যে দেশগুলোর নাম আসবে, এরা হলো হাইতি, সুদান, ইয়েমেন, কঙ্গো কিংবা আফগানিস্তান। ঘুণাক্ষরেও কেউ বাংলাদেশের নাম অনুমান করবেন না। বরং গত দেড় দশকে কোন কোন দেশ জিডিপির ভালো প্রবৃদ্ধি (সাধারণত গড়ে ৫ শতাংশের ওপর) অর্জন করেছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের নাম আসবে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১০ থেকে ২০২৪-এর ১৫ বছরের কালপর্বে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ। এই একই দেড় দশকে গড় প্রবৃদ্ধি চীনের ছিল প্রায় পৌনে ৭ শতাংশ, বাংলাদেশ ও ভারতের ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ, অর্থাৎ সমান সমান, ভিয়েতনামের ৬ দশমিক ১২ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ও সিঙ্গাপুরের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬, পাকিস্তানের ৩ দশমিক ৫ ও শ্রীলঙ্কার ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রায় সোয়া ৬ শতাংশ, অর্থাৎ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেও বাংলাদেশ যদি ধ্বংসস্তূপ হয়ে যায়, তাহলে বাকিরা তো বোমার ছাই। অর্থমন্ত্রী শব্দচয়নে নিজের দেশের সঙ্গে সুবিচার করেননি। ‘ফ্যাসিস্ট’ শাসনকে ঠেঙাতে গিয়ে দেশীয় জনতার শ্রমে ও ঘামে অর্জিত জিডিপিকে অস্বীকার করলেন?

বিএনপির রেখে যাওয়া ২০০৬ সালের প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি ২০২৪ সালে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার হলো কী করে? কী করে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করল? অর্থমন্ত্রীর কাছে এগুলোর কোনো গোপন জবাব রয়েছে কি? আমরা জানলে উপকৃত হতাম এবং ধ্বংসস্তূপ বা ভঙ্গুর—এ–জাতীয় ‘ন্যারেটিভ’ সানন্দে গ্রহণ করে নিতাম।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে এই সরকারের প্রথম বাজেট থেকেই যে মনোযোগ উদ্ভাসিত হয়েছে, তা অনেক প্রত্যাশার ফল। বিএনপি শিক্ষাকে আধুনিক, সংস্কৃতিসম্পন্ন, ক্রীড়ামোদী, বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে চাইছে, যা বহির্জগতে দেশের ছেলেমেয়েদের নিয়োগযোগ্য করে তুলবে। সংগীতশিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে কিছু বিরোধিতাও দৃশ্যমান।

এ ক্ষেত্রে বিএনপি ‘মঙ্গল’–এর পরিবর্তে ‘বৈশাখী’ প্রবর্তন স্টাইলে পিছিয়ে যাবে কি না, তা দেখার বিষয়। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সংগীতের বাজার দিন দিন বড়ই হচ্ছে। ২০১২ সালের ১৪ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক সংগীতের বাজার ২০২৫ সালে ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। খোদ সৌদি আরব ২০২৪ সালেই ৯ হাজার সংগীতশিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়েই সৌদি ভিশন ২০৩০ ঠিক করা হয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষায়ও বহির্বিশ্বে ভবিষ্যতের নিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বাজেটে এর কৌশলগত লক্ষ্য ও পরিভাষা বিদ্যমান। তবে এই নিশানায় ছন্দপতনও ঘটছে। কিছুদিন আগে শিক্ষামন্ত্রী পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার বন্দনায় বিগলিত হলেন।

যে দেশের প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক এবং প্রবণতা-রেখায় তা দিন দিন নিম্নগামী, সে দেশের শিক্ষা কি বাংলাদেশের উন্নয়নকে আরও ঊর্ধ্বস্তরে নিয়ে যাবে? নির্বাচিত সরকারের শিক্ষামন্ত্রী কি ইউনূস আমলের উপদেষ্টাদের বয়ান নকল করছেন? পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা যে তাদের জন্যও শিক্ষণীয়, এমন স্বীকৃতি দিচ্ছে। বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত তাদের মূলধারার পত্রিকাগুলো ঘেঁটে দেখলেই তার প্রমাণ মিলবে।

বাজেটের একটি বড় নিশানা ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন। বর্তমানের জিডিপি ৫০১ বিলিয়ন ডলার ধরলে এই ট্রিলিয়ন স্পর্শ করার জন্য প্রয়োজন প্রতিবছর ৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর যা অবস্থা, তাতে এই ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির গল্প অনেকটা রূপকথার মতো লাগছে। তার চেয়ে কিছুটা বাস্তববাদী হয়ে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হার ধরলে জিডিপির ট্রিলিয়ন ছুঁতে লাগবে ১১ বছর, অর্থাৎ ২০৩৭ সাল। ‘বেটার লেট দেন নেভার’ বাস্তবতায় না হয় এই বছরটিই হোক সংশোধিত নিশানা!

ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক

*মতামত লেখকের নিজস্ব