শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) সকালে প্রথম আলো হাতে নিয়েই চোখ আটকে গেল শীর্ষ সংবাদে। ‘নারীর প্রতি বৈষম্য বেড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এবারের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট নিয়ে নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। পড়তে পড়তে কয়েকটি সংখ্যায় এসে আটকে গেলাম।
প্রথমে ভালো খবর। শিক্ষায় বাংলাদেশ বেশ ভালো করেছে। শিক্ষায় নারী-পুরুষ সমতার স্কোর এখন ৯৬ দশমিক ১ শতাংশ, যা বাংলাদেশের এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া সামগ্রিক অবস্থানে বড় পতনের পরও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবার ওপরে। মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান—সবাই বাংলাদেশের পেছনে। অর্থাৎ আমাদের অর্জন নেহাতই খারাপ নয়।
তবে একই রিপোর্টের অন্য দিকও আছে। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগে ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৪১ শতাংশ, যেখানে পুরুষের ৭৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। পেশাজীবী ও কারিগরি কর্মীদের মধ্যে নারী ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের মধ্যে নারী মাত্র ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ!
৬ দশমিক ১৬ শতাংশ সংখ্যাটায় এসে আমার কয়েক দিন আগের একটি সন্ধ্যার কথা মনে পড়ল। ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বৈশ্বিক বাজার নিয়ে আউটসোর্স টু বিডি আয়োজিত অনুষ্ঠান ফ্যাসিলিটেড করেছি। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রায় ৮০ জন শীর্ষ পর্যায়ের মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা হলো সফটওয়্যার ব্যবসা, আন্তর্জাতিক বাজার, ভবিষ্যতের সুযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ অনেক কিছু নিয়ে। তবে খেয়াল করেছি প্রায় ৮০ জনের মধ্যে ১ জনও নারী নেই!
কিছুদিন ধরে আমরা বাংলাদেশ এআই অলিম্পিয়াডের গত তিন বছরের হিসাব দেখছি। ২০২৪ সাল থেকে আমাদের ছেলেমেয়েরা আন্তর্জাতিক এআই অলিম্পিয়াডগুলোতে যাচ্ছে। এই তিন বছরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেওয়া ২৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে মাত্র ১ জন!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীকে বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও আমরা চাই আমাদের ছেলেমেয়েরা এই নতুন প্রযুক্তি শিখুক, নতুন কিছু তৈরি করুক এবং নতুন পৃথিবী নির্মাণের অংশ হোক। কিন্তু সেই প্রস্তুতিতে আমাদের মেয়েরা কোথায়?
প্রশ্নটা আমার খুব পরিচিত। কারণ, প্রায় ১০ বছর আগে আমরা একই প্রশ্ন করেছিলাম।
২০১৫ সালের দিকে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার একটি হিসাব আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। আইসিপিসি ঢাকা অঞ্চলের প্রাথমিক পর্বে শত শত দলের মধ্যে শুধু মেয়েদের নিয়ে গড়া দল ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। তখন বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের উদ্যোগে আমরা #মিসিংডটার নামে একটা উদ্যোগ নিই। উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মেয়েরা কোথায়, তা খোঁজা। সেখান থেকে মেয়েদের জন্য প্রোগ্রামিং ক্যাম্প, জাতীয় গার্লস প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, মেন্টরদের সঙ্গে যুক্ত করা, সফল নারীদের সামনে আনা হয়েছে। মেয়েরা যেন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নিজের চোখে দেখতে পারে সেখানে কী ধরনের কাজ হয়, সেই ব্যবস্থাও ছিল। কখনো ছোট প্রশিক্ষণ, কখনো আবাসিক ক্যাম্প।
২০১৮ সালে অধ্যাপক নোভা আহমেদ, তামান্না মোতাহার, শারমিন কবির এবং আমি ‘সাপোর্টিং মিসিং ডটারস’ নামে একটি গবেষণাপত্র লিখি। সেখানে মাঠের কাজের পাশাপাশি মেয়েদের সঙ্গে আমাদের আলোচনার অভিজ্ঞতাও ছিল।
একটি মেয়ে বিজ্ঞান পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল, প্রকৌশলী হলো, এতেই গল্প শেষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম চাকরিতে যাওয়ার সময় কী হলো? কয়েক বছর পর কী হলো? বিয়ে বা সন্তান হওয়ার পর কী হলো? কর্মজীবনে বিরতি পড়লে ফিরে আসার পথ আছে কি? নেতৃত্বে যাওয়ার সুযোগ আছে কি?
আমরা দেখেছি, একজন মেয়ে কম্পিউটারবিজ্ঞান বা প্রকৌশলে ভর্তি হয়ে গেলেই তার বাধাগুলো শেষ হয়ে যায় না। শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষাগারেও মেয়েদের সক্ষমতা নিয়ে আগে থেকে তৈরি ধারণা কাজ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি মেয়েদের হাতে দেওয়ার সময়ও দ্বিধা দেখা যায়। মেয়েরা অনেক সময় সমস্যায় পড়ে প্রশ্ন করতেও সংকোচ বোধ করে। নারী প্রোগ্রামিং মেন্টর তখন খুব কম ছিল। একটি মেয়ের কথা সেই গবেষণাপত্রে আছে।
কোনো একটি অনুপ্রেরণামূলক আয়োজনের পর সে বলেছিল, এ ধরনের কথা শুনলে তার খুব ভালো লাগে। তারপর কিছুদিন গেলে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কথাটা সম্ভবত আজও সত্যি। অনুপ্রেরণা একা যথেষ্ট নয়।
আমাদের উদ্যোগের কিছু ফলও আমরা দেখেছিলাম। মেয়েদের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ বাড়ল। নতুন মেন্টর তৈরি হলো। একজন অংশগ্রহণকারী পরে আরেকজনের মেন্টর হলো। আমাদের গবেষণায় আমরা দেখেছিলাম, একবার প্রাথমিক বাধাটা অতিক্রম করা গেলে এই প্রক্রিয়া একধরনের ইতিবাচক ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
তারপর সময় বদলেছে। প্রোগ্রামিংয়ের সঙ্গে এসেছে ডেটাবিজ্ঞান, মেশিন লার্নিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অথচ এআই অলিম্পিয়াডের হিসাব সামনে রেখে মনে হলো, পুরোনো প্রশ্নটা আবার ফিরে এসেছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের রিপোর্ট নিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের একটি মন্তব্য দৃষ্টি কেড়েছে। তিনি বলেছেন, অর্থনীতিতে নারীদের জন্য সুযোগ আগের মতোই আছে বা বেড়েছে, কিন্তু তাঁদের অংশগ্রহণ কমেছে। তাঁর মতে, সুযোগের কোনো ঘাটতি নেই। সুযোগ থাকা আর একজন নারীর পক্ষে সেই সুযোগ গ্রহণ করা কি একই কথা?
চাকরি নারী-পুরুষ সবার জন্য উন্মুক্ত হতে পারে। কিন্তু সেই চাকরির জন্য অন্য শহরে থাকতে হলে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা, সন্তান হওয়ার পর কাজে ফেরার সুযোগ, শিশুযত্নের ব্যবস্থা, কয়েক বছর কর্মজীবনের বাইরে থাকলে ফিরে আসার পথ কিংবা কর্মক্ষেত্রে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুসরণ করার মতো নারী—এসবই কি একজন নারী প্রকৌশলী দেখতে পান?
এগুলোকে চাকরির সুযোগের বাইরের বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোই হয়তো ঠিক করে দেয়, কাগজে থাকা একটি সুযোগ একজন নারীর জন্য সত্যিকারের সুযোগ হয়ে উঠবে কি না।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে যেসব দেশে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি, সেখানে কী হয়েছে? কোনো একটি জাদুকরি সমাধান কিন্তু পাওয়া যায়নি। দেশভেদে ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনীতির পার্থক্যও অনেক।
তবে কয়েকটি বিষয় বারবার সামনে এসেছে। কোথাও রাষ্ট্রীয় চাকরি ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নারীদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবনের পথ তৈরি করেছে। কোথাও সুলভ শিশুযত্নের ব্যবস্থা সন্তান হওয়ার পরও নারীদের কাজে থাকতে সাহায্য করেছে। কোথাও মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং বিরতির পর কাজে ফেরার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বদলানো হয়েছে। আবার কোথাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণকে শুধু নারী-পুরুষ সমতার বিষয় হিসেবে নয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবেও দেখা হয়েছে।
এখানেই ১০ বছর আগের আমাদের চিন্তার সঙ্গে আজকের চিন্তার মৌলিক পার্থক্য। তখন আমাদের মনোযোগের বড় অংশ ছিল—মেয়েদের কীভাবে এই জগতে আনা যায়। এখন তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন যোগ হয়েছে—আসার পর কীভাবে তাদের ধরে রাখা যায়।
একটি মেয়ে বিজ্ঞান পড়ল, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল, প্রকৌশলী হলো, এতেই গল্প শেষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম চাকরিতে যাওয়ার সময় কী হলো? কয়েক বছর পর কী হলো? বিয়ে বা সন্তান হওয়ার পর কী হলো? কর্মজীবনে বিরতি পড়লে ফিরে আসার পথ আছে কি? নেতৃত্বে যাওয়ার সুযোগ আছে কি?
মেয়েদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আসতে উৎসাহ দিতে হবে। বৃত্তি দরকার হতে পারে, তবে মেন্টর ও অনুসরণ করার মতো মানুষ দরকার। একই সঙ্গে দেখতে হবে, কর্মক্ষেত্র কেমন, সন্তান হওয়ার পর কাজে ফেরার সুযোগ আছে কি না, শিশুযত্নের ব্যবস্থা আছে কি না, প্রয়োজনমতো নমনীয়ভাবে কাজ করার সুযোগ আছে কি না এবং কর্মজীবনে বিরতির পর ফিরে আসার পথ কতটা সহজ।
আর দরকার তথ্য। কোন পর্যায়ে কত মেয়ে আছে, কোথায় সংখ্যাটা কমছে এবং কেন কমছে—এসব নিয়মিত না মাপলে আমরা সমস্যার সমাধানও অনুমানের ভিত্তিতে করতে থাকব।
এত কিছুর পরও বাংলাদেশের গল্পটা কেবল পিছিয়ে পড়ার গল্প নয়। মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন বড়। দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক সূচকে বাংলাদেশ এখনো সবার ওপরে। এ অর্জনই বরং দেখায়, আমরা চাইলে পরিবর্তন সম্ভব।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ছবিটা স্বস্তির নয়। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আটটি অঞ্চলের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান সপ্তম। বর্তমান অগ্রগতির গতি ধরে এই অঞ্চলের নারী-পুরুষ ব্যবধান পুরোপুরি দূর হতে আরও ১৪৯ বছর লাগতে পারে বলে তাদের হিসাব।
তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি জাতীয় গড় আমাদের বলে না, যাত্রাপথের ঠিক কোন বাঁকে একটি মেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার দিকে তাকিয়ে আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, আমাদের মেয়েরা কোথায়? ২০১৮ সালে তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করেছি, কী তাদের আটকে দেয়।
২০২৬ সালে এআই অলিম্পিয়াডের দিকে তাকিয়ে আবার দেখছি, আমাদের মেয়েরা সেখানে খুবই কম। আর প্রায় একই সময়ে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রায় ৮০ জন শীর্ষ মানুষের একটি ঘরে বসে দেখছি, সেখানে একজন নারীও নেই।
কাজেই শুধু ‘আমাদের মেয়েরা কোথায়’ জিজ্ঞেস করলে হবে না। জিজ্ঞেস করতে হবে, কোথায় হারাল?
স্কুলের পর? বিশ্ববিদ্যালয়ে? প্রথম চাকরিতে? কয়েক বছর চাকরি করার পর? বিয়ের পর? সন্তান হওয়ার পর? নাকি নেতৃত্বের দরজায় এসে?
প্রতিটি বাঁকের উত্তর আলাদা হতে পারে। আর উত্তর আলাদা হলে সমাধানও আলাদা হতে হবে।
১০ বছর আগে আমরা আমাদের মিসিং ডটারদের খুঁজতে শুরু করেছিলাম। এবার যে পথে আমাদের মেয়েরা হারিয়ে যায়, সেই পথই বদলাতে হবে।
মুনির হাসান প্রথম আলোর পরামর্শক এবং বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি