
ক্ষমতা মানুষের ভেতরে একধরনের কর্তৃত্ববোধ তৈরি করে। এই বোধ থেকে তাঁরা মনে করেন যে অন্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ বা বিচার করা তাঁদের দায়িত্ব। ক্ষমতায় গেলে মানুষ কেন বদলে যায়, তা নিয়ে লিখেছেন শওকত হোসেন
ক্ষমতায় গেলে মানুষ বদলে যায়। রাজনৈতিক ভাষণে, অর্থনৈতিক নীতিতে কিংবা সামাজিক বক্তব্যে ক্ষমতাবানেরা মুখে মুখে অনেক নৈতিকতার কথা শোনান। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের আচরণ সেই নৈতিকতার সঙ্গে মেলে না।
এ নিয়ে জোরিস ল্যামারস, ডিডেরিক এ স্ট্যাপেল এবং অ্যাডাম ডি গ্যালিনস্কি নামের তিন বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ২০১০ সালে একটি গবেষণা করেছিলেন। ‘ক্ষমতা ভণ্ডামি বাড়ায়: যুক্তিতে নৈতিকতা, আচরণে অনৈতিকতা’ (পাওয়ার ইনক্রিজেস হিপোক্রেসি: মোরালাইজিং ইন রিজনিং, ইমমোরালিটি ইন বিহেভিয়ার) নামের সেই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির (এপিএস) জার্নাল সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স-এ। এটিকে মনোবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী ও মর্যাদাপূর্ণ জার্নাল মনে করা হয়। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা মানুষকে নৈতিক দ্বিচারিতা বা ভণ্ডামির দিকে ঠেলে দেয় কি না, সেটি বোঝা।
গবেষকেরা পাঁচটি পরীক্ষা করেছিলেন। তাতে দেখা গেছে, ক্ষমতাবানেরা অন্যদের প্রতারণাকে তুলনামূলকভাবে বেশি নিন্দা করেন, কিন্তু প্রতারণায় জড়ানোর প্রবণতা তাঁদের মধ্যেই বেশি। আবার ক্ষমতাবানেরা অন্যদের নৈতিক অপরাধকে নিজেদের একই ধরনের অপরাধের তুলনায় অনেক বেশি কঠোরভাবে মূল্যায়ন করেন। ক্ষমতাবানদের এই আচরণকেই বলা হয়েছে নৈতিক দ্বিচারিতা বা ভণ্ডামি। অর্থাৎ এমন এক আচরণ, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্যদের জন্য কঠোর নৈতিক মানদণ্ড আরোপ করেন, কিন্তু নিজে তা মানেন না।
এর ব্যাখ্যায় গবেষকেরা বলেছেন, ক্ষমতা মানুষের ভেতরে একধরনের কর্তৃত্ববোধ তৈরি করে। এই বোধ থেকে তাঁরা মনে করেন যে অন্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ বা বিচার করা তাঁদের দায়িত্ব। ক্ষমতা মানুষকে ব্যক্তিগত লাভ, পুরস্কার এবং সুবিধার দিকে বেশি মনোযোগী করে তোলে। সামাজিক নিন্দা বা নৈতিক চাপ তখন তাঁদের কাছে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে নিজের ক্ষেত্রে তাঁরা সহজেই নৈতিক মানদণ্ড শিথিল করেন।
সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন কোভিডের সময় নাগরিকদের জন্য কঠোর লকডাউন চাপিয়েছিলেন। পরে ফাঁস হয় যে তিনি তাঁর দলবল নিয়ে লকডাউনের মধ্যেই ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পার্টি করেছেন। এর নাম এখন ‘পার্টিগেট স্ক্যান্ডাল’।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি কখনোই তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেনের মামলায় হস্তক্ষেপ করবেন না। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তিনি ছেলেকে বিনা শর্তে মাফ করে দিয়েছিলেন।
এ তো গেল দুই উন্নত দেশের দুটি উদাহরণ, যাঁরা নৈতিকতাকে উচ্চ আসনে রাখেন বলে জনশ্রুতি আছে। বাংলাদেশের উদাহরণ দেওয়া শুরু করলে এই লেখা আর শেষ হবে না। বাংলাদেশে নৈতিক ভণ্ডামির লিখিত সাক্ষ্য দেয় রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো। দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন বিচার বিভাগ, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা—এসব হচ্ছে বহুল প্রচারিত লিখিত প্রতিশ্রুতি। ক্ষমতায় যাওয়ার পরে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনা এখানেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান নৈতিক ভণ্ডামির বড় উদাহরণ।
সাম্প্রতিক সময়ের কথাও বলা যায়। বৈষম্য দূর, মতপ্রকাশের অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা—এ রকম অনেক দাবিতেই ছাত্র-জনতা গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। অনেকই আগে যা বিশ্বাস করতেন, তাঁরাই এখন উল্টো আচরণ করছেন।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে, ‘আমার যে বন্ধুরা পৃথিবীকে বদলাবে বলে ছিল/ত্বরা সইতে না পেরে/এখন তারে নিজেরাই নিজেদের বদলে ফেলেছে।’
জুলাই আন্দোলনের পরে এ রকম বন্ধুদের দেখার অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়তো হয়েছে। এই যেমন রাজনৈতিক বিবেচনায় দলের নেতা-কর্মীদের টিভি চ্যানেলের লাইন্সেস দেওয়ার বিরুদ্ধে যাঁরা আগে সোচ্চার ছিলেন, তাঁরাই এখন অভিযোগ করছেন এই কাজটি তাঁদের করতে দেওয়া হয়নি।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। তিনি বলেছিলেন, ‘পাওয়ার ইজ দ্য আলটিমেট অ্যাফ্রোডিজিঅ্যাক’। এর সহজ বাংলা হচ্ছে, ‘ক্ষমতাই হলো শ্রেষ্ঠ কামোদ্দীপক’। এই যে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা নিজেদের নিয়ে এভাবে ভাবেন, এটাই ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সমস্যা।
ওয়েলস ফার্গো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় ব্যাংক। ব্যাংকটিতে একবার ভয়াবহ জালিয়াতি হয়েছিল। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ওয়েলস ফার্গো গ্রাহককে না জানিয়েই তাঁদের নামে প্রায় ২০ লাখ ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ক্রেডিট কার্ড খুলেছিল। গ্রাহকেরা জানতেনই না যে তাঁদের নামে বাড়তি অ্যাকাউন্ট আছে, অথচ তাঁরা ঠিকই ওই সব অ্যাকাউন্টের ফি বা চার্জ দিচ্ছিলেন।
তখন ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন জন স্ট্যাম্প। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেস শুনানিতে জবাবদিহির জন্য তাঁকে ডাকা হয়েছিল। সেখানে তাঁর বিস্ময়কর আচরণ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়। কেননা, তাঁর আচরণের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি বা নিজেদের কৃতকর্মের কোনো অনুশোচনাই ছিল না। তিনি শান্তভাবেই বসে ছিলেন। গবেষকদের মতে, এটি আসলে জন স্ট্যাম্পের কোনো অভিনয় ছিল না। বরং দীর্ঘ সময় ধরে অতিমাত্রায় ক্ষমতার শীর্ষে থাকার ফলে তাঁর মস্তিষ্কের অন্যের অনুভূতি বোঝার অংশটি, যাকে বলা হয় ‘মিররিং প্রসেস’, যেটি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল।
আসলে ক্ষমতায় যাওয়ার পর মানুষের আচরণ বদল বা প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়া বিশ্বব্যাপী একটি চিরন্তন রাজনৈতিক সংকট।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় যে এক হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হলো, এর কোনো অনুশোচনা তাঁদের মধ্যে নেই। এবার বোঝা গেল কেন নেই।
এর অর্থ সমস্যা আসলে ক্ষমতাবানদের মস্তিষ্কেই। সুখবিন্দর এস ওভির নেতৃত্বে তিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ‘পাওয়ার চেঞ্জেস হাউ দ্য ব্রেন রেসপন্ডস টু আদারস’ নামে একটি গবেষণা করেছিলেন ২০১৩ সালে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল মস্তিষ্কের স্তরে ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে তা দেখা। গবেষণায় ‘মোটর রেজোন্যান্স’ নামক একটি প্রক্রিয়ার ওপর ক্ষমতার প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। মোটর রেজোন্যান্স হচ্ছে এমন একটি বিষয়, যেখানে আমরা যখন কাউকে কোনো কাজ করতে দেখি, আমাদের মস্তিষ্কের সেই অংশগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, আমরা নিজে সেই কাজটি তখন একইভাবে করি। দেখা গেছে, ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে এটি কাজ করে না।
গবেষণা অনুযায়ী, যাঁরা নিজেদের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মনে করেছিলেন, অন্যের কাজের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া ছিল সবচেয়ে কম। আর ক্ষমতাহীনদের ছিল সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ ক্ষমতা যত বেশি, অন্যের কাজের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া বা সহমর্মিতা তত কম।
ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডাচের কেল্টনার দীর্ঘ ২০ বছরের গবেষণার ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে মানুষ যখন ক্ষমতায় বসে, তখন তার মস্তিষ্কে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা তাকে অন্যের প্রতি কম সহানুভূতিশীল করে তোলে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে মানুষ যে সহানুভূতি, পরোপকার এবং সামাজিক দক্ষতার মাধ্যমে অন্যদের মন জয় করে; ক্ষমতায় আসার পর ঠিক সেই গুণগুলোই সে হারিয়ে ফেলে। এ নিয়ে ২০১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বইয়ের নাম দ্য পাওয়ার প্যারাডক্স: হাউ উই গেইন অ্যান্ড লুজ ইনফ্লুয়েন্স।
আসলে ক্ষমতায় যাওয়ার পর মানুষের আচরণ বদল বা প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়া বিশ্বব্যাপী একটি চিরন্তন রাজনৈতিক সংকট। ক্ষমতাসীনদের আচরণ নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত গবেষণাটি সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড ডেভিড ওয়েনের।
তিনি একে বলেছেন ‘হিউব্রিস সিনড্রোম’। হিউব্রিস শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে। এর অর্থ অতিরিক্ত অহংকার, এমন আত্মম্ভরিতা যা সীমা লঙ্ঘন করে এবং নিজের ক্ষমতা ও অবস্থান সম্পর্কে অন্ধ আত্মবিশ্বাস।
ডেভিড ওয়েন দেখিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে ‘হিউব্রিস সিনড্রোম’ বা ক্ষমতার অহংকারজনিত এক বিশেষ মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এটি কোনো সাধারণ মানসিক রোগ নয়, বরং এটি একটি ‘অবস্থানগত অসুস্থতা (ইলনেস অব পজিশন)’। এর ফলে নেতারা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন এবং অন্যদের তুচ্ছজ্ঞান করতে শুরু করেন। তিনি ১০০ বছরের যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ২৬ জন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জীবন, সিদ্ধান্ত ও আচরণ বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করেছিলেন। পরে ইরাক যুদ্ধের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারকে নিয়ে আলাদা একটি বই লিখেছেন। নাম হচ্ছে, দ্য হিউব্রিস সিনড্রোম: বুশ, ব্লেয়ার অ্যান্ড দ্য ইনটক্সিকেশন অব পাওয়ার।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রুই হলো নিয়ন্ত্রণহীন আত্মবিশ্বাসী নেতা। এর নিরাময় হিসেবে ডেভিড ওয়েন বলেছেন, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণই এর আসল চিকিৎসা। এ জন্য যা করতে হবে—ক্ষমতার মেয়াদ নির্ধারণ করা, শক্তিশালী সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ ও প্রতিষ্ঠান তৈরি, সমালোচনাকে উৎসাহ দেওয়া এবং সব কাজে ‘হ্যাঁ বলা মানুষ’দের দূরে রাখা
ডেভিড ওয়েন হিউব্রিস সিনড্রোমের ১৪টি লক্ষণের কথা বলেছেন। যেমন নিজের ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত মহিমা ও ইতিহাসের সঙ্গে একাকার করে দেখা, নিজের সিদ্ধান্তকে সব সময় সঠিক মনে করা, সমালোচনা ও ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে দেখা, নিজের বিশ্বাসকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে অতিরিক্ত আত্মম্ভরতায় রূপ নেওয়া, নিজেকে বিশেষ ব্যক্তি বলে ভাবা, ক্ষমতাকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে মনে করা, নিয়ম ও আইনকে নিজের জন্য প্রযোজ্য না ভাবা, বিশেষজ্ঞদের কথা উপেক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তে অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখানো, সাফল্যকে নিজের কৃতিত্ব দেখানো, ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে আরও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠা, সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং ক্ষমতা ছাড়া নিজের পরিচয় কল্পনা করতে না পারা।
এবার পাঠক মিলিয়ে দেখতে পারেন।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রুই হলো নিয়ন্ত্রণহীন আত্মবিশ্বাসী নেতা। এর নিরাময় হিসেবে ডেভিড ওয়েন বলেছেন, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণই এর আসল চিকিৎসা। এ জন্য যা করতে হবে—ক্ষমতার মেয়াদ নির্ধারণ করা, শক্তিশালী সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ ও প্রতিষ্ঠান তৈরি, সমালোচনাকে উৎসাহ দেওয়া এবং সব কাজে ‘হ্যাঁ বলা মানুষ’দের দূরে রাখা।
লেখার শুরুতে যে তিন মনোবিজ্ঞানীর কথা বলেছিলাম, তাঁরা লিখেছেন, নৈতিক ভণ্ডামি আসলে ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই নিহিত। ক্ষমতার কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নৈতিক ভণ্ডামি অনিবার্য হয়ে ওঠে। এতেই বাড়ে ক্ষমতার অপব্যবহার।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদ লর্ড অ্যাকটন ১৮৮৭ সালে তাঁর বন্ধু ম্যান্ডেল ক্রাইটনকে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে উক্তিটি করেছিলেন, যা আজও বিশ্বরাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত বাক্যগুলোর একটি।
তিনি লিখেছিলেন, ‘ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতির দিকে ঠেলে দেয়, আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষকে পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে। যাঁদের আমরা মহান ব্যক্তি বলে দেখি, তাঁরা প্রায়ই ভালো মানুষ হন না, এমনকি তাঁরা যখন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদে না থেকেও শুধু প্রভাব খাটান; আর যখন তাঁদের হাতে শাসনক্ষমতা এসে পড়ে, তখন তাঁদের দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া আরও নিশ্চিত হয়ে যায়।’
২০০৩ সালে প্রকাশিত দ্য লজিক অব পলিটিক্যাল সারভাইভাল বইটিকে আধুনিক রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে ধরা হয়। এই বইয়ের লেখক চার বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, যাঁরা রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করেছেন গাণিতিক অর্থনীতির মাধ্যমে। তাঁরা বলেছেন, ভালো সরকার গঠনের জন্য কেবল সৎ নেতা নয়, প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে টিকে থাকতে হলে জনগণের কল্যাণে কাজ করা ছাড়া বিকল্প থাকে না।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এসব বিষয় নিয়ে বহু লেখালেখি ও গবেষণা আছে। এর সবকিছুরই মূল কথা হলো, উপায় হচ্ছে কাঠামো বা সিস্টেমে বদল আনা। কেননা, কেবল সৎ মানুষ বসালেই সবকিছুর বদল হয় না। এ জন্য ভালো ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দরকার। ভালো প্রতিষ্ঠান, সঠিক কাঠামো এবং জবাবদিহির জায়গা তৈরি করতে না পারলে ক্ষমতায় যিনি বসবেন, তিনিই বদলে যাবেন, হয়ে উঠবেন অহংকারী, যা পর্যায়ক্রমে আরেকজন স্বৈরাচারেরই জন্ম দেবে। আর তাঁদের পাশে সব কাজে ‘হ্যাঁ–বলা’ মানুষেরও তো অভাব নেই।
শওকত হোসেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন
*মতামত লেখকের নিজস্ব