সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব করে পিটিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে।
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মব করে পিটিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে হত্যা করা হয়েছে।

মতামত

সাতক্ষীরায় মব করে হত্যা: উসকানিদাতা প্রকাশ্যে, পুলিশ-প্রশাসন কেন নিষ্ক্রিয়

আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ধর্ম অবমাননার অভিযোগ’ তুলে মব সৃষ্টি করা ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

প্রথম দফায় পিটুনির পর ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে আবারও তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়। পরে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান বলে গণমাধ্যমের সংবাদে উঠে এসেছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, শামীম মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না, কয়েক দিন আগে তিনি বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।

শামীমের ঘটনা প্রমাণ করছে, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা যেন সবচেয়ে সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত ‘মবলিঞ্চিং’-এর (গণপিটুনি) তরিকা হয়ে উঠছে। এই গণপিটুনির অতি সাম্প্রতিক কিছু ভয়াবহ নজির স্মরণ করা যাক।

উল্টো বিভিন্ন সময় হামলার ঘটনা বা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে জায়েজ করতে দেখা গিয়েছে মন্ত্রীদের। এটা আমাদের সামষ্টিক ট্র্যাজেডি যে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের মতো প্রাথমিক দাবিগুলো এত বছর পরও ঘুরেফিরে তুলতে হচ্ছে।  

গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমের দরবারে একদল লোক হামলা চালায় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ইসলাম সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামের সনাতন ধর্মাবলম্বী এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরে তাঁর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

আবার গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয়ে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র কবর, বাড়ি ও দরবারে হামলা চালানো হয়। এমনকি নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে মহাসড়কের পদ্মার মোড় এলাকায় এনে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে পবিত্র কোরআন অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে আবু ইউনুস মোহাম্মদ শহীদুন্নবী নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

বিগত পাঁচ-ছয় বছরের ঘটনাবলি আমলে নিয়ে দৃঢ়ভাবেই এ দাবি করা যায়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ধারাবাহিকভাবেই নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জানমালের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। এসব ঘটনার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ছক স্পষ্টত দৃশ্যমান। প্রক্রিয়াটি বেশ নির্ধারিত: প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়; সেটাকে কেন্দ্র করে গণ-অসন্তোষ বা মব তৈরি করা হয় এবং সবশেষে হিংস্র কায়দায় হামলা চালানো হয়। এই পুরো প্রক্রিয়া মোটেই গোপনে ঘটে না, বরং অত্যন্ত প্রকাশ্যে ঘটে।

এটা ঠিক যে বাংলাদেশে কখনো ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’ এমন গুজবকে কেন্দ্র করে মবলিঞ্চিং ঘটেছে, আবার ছিনতাইকারী বা চোর সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনাও প্রতিনিয়ত ঘটছে। কিন্তু সাধারণ গণপিটুনির ঘটনাগুলো যতটা ‘অপরিকল্পিত’ বা ‘আচমকা’, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে করা মবলিঞ্চিংয়ের ঘটনাগুলো ততটাই ‘পরিকল্পিত’।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুললে কোনো ব্যক্তিকে মেরে ফেলা যেন এতটাই সহজ হয়ে ওঠে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তথা পুলিশ-প্রশাসনও রীতিমতো নিষ্ক্রিয় ও হাল ছেড়ে বসে থাকে। ফলে এটি মোটেও অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয় যে এমন বহু হত্যাকাণ্ড খোদ পুলিশের সামনেই ঘটেছে। যেমন কুষ্টিয়ার ঘটনায় স্পষ্ট দেখা যায়, পুলিশের উপস্থিতিতেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে। একইভাবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পরপরই খুলনায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তিন বাহিনীর উপস্থিতিতেই এক কিশোরকে চরম গণপিটুনি দেওয়া হয়।

সাতক্ষীরার দেবহাটায় মব করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তরা

অতীতে আমরা এমন অনেক ঘটনা দেখেছি, যেখানে কোনো সংখ্যালঘু ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বা তাঁর নাম ব্যবহার করে ভুয়া ‘অবমাননামূলক’ মন্তব্য পোস্ট করা হতো এবং সেটিকে বাহানা বানিয়ে পুরো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানো হতো। কিন্তু অতি সম্প্রতি—বিশেষত ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুতর ও বিপজ্জনক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

এখন ফেসবুকে সরাসরি স্ট্যাটাস বা ভিডিওর মাধ্যমে বিভিন্ন মাজার ও দরবারে হামলার খোলামেলা ঘোষণা দেওয়া হয়, সহিংসতার সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মতি তৈরি করা হয় এবং প্রকাশ্যে লোক জড়ো করে হামলা চালানো হয়। গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যতগুলো মাজারে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে, প্রতিটিতেই এ প্রবণতা একেবারে দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘটিত সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর ক্ষেত্রেও একই ছক কাজ করছে।

নতুন এ প্রবণতা আরেকটি দিকও সামনে হাজির করেছে। সাধারণত ‘মব’ বললে আমরা ধরে নিই যে এর কোনো নির্দিষ্ট ‘মুখ’ বা পরিচয় থাকে না, যেন এক ‘মুখহীন’ হিংস্র অবয়ব। ফলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশ-প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয় এবং মূল হোতাকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে অনুমান করা হয়।

যদিও সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে মূল হোতা যে-ই হোক না কেন, কেন দলে দলে সাধারণ মানুষ এই বিচারহীন সহিংসতার অংশ নেয় বা তাদের অংশ নেওয়ার মতো একটি সামাজিক বাস্তবতা তৈরি হয়।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, ‘মব’-সংক্রান্ত সেই প্রাথমিক অনুমান আর খাটছে না। কারণ, যিনি উসকানি দিচ্ছেন এবং যিনি এর মূল পরিকল্পনাকারী, তাঁর পরিচয় ও চেহারা এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি কোনো আড়াল না রেখে সবার সামনে প্রকাশ্যে ভিডিও বা স্ট্যাটাস দিয়ে অপরাধটি ঘটানোর প্রত্যক্ষ আহ্বান জানাচ্ছেন।

একদিকে যেকোনো ধরনের সহিংসতাকে ‘মব’ বা উগ্র জনতার রূপ দেওয়া একটি অত্যন্ত কার্যকর কৌশল হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে উসকানিদাতা আর তাঁদের পরিচয় বা চেহারা লুকানোর প্রয়োজনই বোধ করছেন না।  

উদাহরণস্বরূপ, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাতক্ষীরার শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে সরাসরি লাইভ করেন। সেই লাইভ ভিডিও এখনো তাঁর ফেসবুকে ঝুলছে। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে প্রকাশ পায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর নেতৃত্বেও ছিলেন তিনি।

শামীমের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর তিনি মরদেহের ছবি পুনরায় ফেসবুকে পোস্ট করে উল্লাস প্রকাশ করে লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, তিনি মারা গেছেন, আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি, রাসুলকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, কোরআনকে নিয়ে অশালীন বক্তব্য প্রদানকারী অহিদুজ্জামান শামীম মুরতাদ মারা গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।’

এমনকি তাঁর সর্বশেষ পোস্টে লিখেছেন, ‘আপনাদের কি জানতে ইচ্ছে করে না, মুরতাদ শামীমকে কেন গণপিটুনি দেয়া হলো।’ প্রতিটি পোস্টের নিচের কমেন্ট বক্স ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনিতে সয়লাব। এমন নৃশংসতার পর এই সমষ্টিগত উল্লাস বা গণবিকারগ্রস্ততার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধানের দায়িত্ব আপাতত সমাজবিজ্ঞানীদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাক।

কিন্তু রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে এই মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তি এতক্ষণ ধরে প্রকাশ্যে উসকানি দিয়ে একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটালেন, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র, সরকার ও পুলিশ-প্রশাসন আসলে কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?

এতগুলো মাজারে হামলা ও ভাঙচুর হলো, কিন্তু তার জন্য প্রকৃতপক্ষে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা কতজনের বিচার নিশ্চিত হয়েছে?

এ প্রশ্নটাই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের গোড়ার প্রশ্ন। সরকার, পুলিশ ও প্রশাসনের মূল কাজই হলো সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, যখনই ‘ধর্ম অবমাননা’র মতো সংবেদনশীল অভিযোগ তোলা হয়, তখন পুলিশ-প্রশাসন প্রায় ‘সক্রিয়’ভাবেই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অপরাধ ঘটার আগে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তে এবং এমনকি অপরাধ ঘটে যাওয়ার পরও তাদের এই ‘নিষ্ক্রিয়তা’ বজায় থাকে।

গত ছয়-সাত বছরে ধর্মীয় অবমাননার দোহাই দিয়ে যতগুলো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তার একটিরও দৃষ্টান্তমূলক বিচার সম্পন্ন হয়নি। কুষ্টিয়ার ঘটনায় নামকাওয়াস্তে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করতে দেখা গেলেও মূল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকের নাম এজাহারভুক্তই করা হয়নি বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়। এতগুলো মাজারে হামলা ও ভাঙচুর হলো, কিন্তু তার জন্য প্রকৃতপক্ষে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা কতজনের বিচার নিশ্চিত হয়েছে?

অর্থাৎ রাষ্ট্র ও সরকারের এই দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তাই এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে হামলার মূল উসকানিদাতা থেকে শুরু করে অংশগ্রহণকারী—সবাই শতভাগ নিশ্চিত থাকে যে তাদের কোনো দিন আইনের মুখোমুখি হতে হবে না।

তাই আজ আমাদের সামনে মূল ও অবধারিত প্রশ্ন এটাই: সরকার ও রাষ্ট্র কি আদৌ তার নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তা দিতে পারছে কিংবা ভবিষ্যতে পারবে? ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, ‘মব কালচার’-এর দিন শেষ। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ‘দিন শেষ’ হওয়ার ন্যূনতম কোনো লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

উল্টো বিভিন্ন সময় হামলার ঘটনা বা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে জায়েজ করতে দেখা গিয়েছে মন্ত্রীদের। এটা আমাদের সামষ্টিক ট্র্যাজেডি যে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের মতো প্রাথমিক দাবিগুলো এত বছর পরও ঘুরেফিরে তুলতে হচ্ছে।  

  • সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক

মতামত লেখকের নিজস্ব