ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

মতামত

ইসরায়েল যেভাবে ইসলামভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে পশ্চিমে

রিপাবলিকান দলের এক প্রভাবশালী কংগ্রেস প্রতিনিধির চিফ অফ স্টাফের সঙ্গে বৈঠকটি ছিল দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ। বৈঠকে আমরা আলোচনা করছিলাম ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের মনে তৈরি হওয়া নানা সংশয় এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখে এ বিষয়ে তাঁদের মন্তব্য করার সীমাবদ্ধতা নিয়ে।

তবে আলোচনার শেষে একটি বিষয়ে কথা বলা দরকার ছিল, তা হলো, সদ্য গঠিত ‘শরিয়াহমুক্ত আমেরিকা ককাস’-এ ওই কংগ্রেস সদস্যের যোগদান। এই দলেরই এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইসলামকে বর্ণনা করেছিলেন এমন একটি ধর্ম হিসেবে, যা নাকি ‘সহিংসতা, নারী নির্যাতন ও নির্মম রাজনৈতিক দখলের প্রতীক এবং যার আইন ও সংস্কৃতি মার্কিন সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিষয়টি তুলতেই ওই কর্মকর্তা হাত নেড়ে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে, ও নিয়ে ভাববেন না! মুসলিমরা এখন খুব সহজ লক্ষ্যবস্তু। মূল লড়াইটা আসলে ভারতীয় এবং সাধারণভাবে বলা যায় অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের বিরুদ্ধে। এমনকি ইহুদিদের বিরুদ্ধেও।

এসব বিষয় “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির পথে বাধা হবে না। আর ওই ককাসের মধ্যে কেবল র‍্যান্ডি ফাইন ছাড়া আর কেউ ইসরায়েলের এসব ফালতু কথায় বিশ্বাস করে না।’

যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামফোবিয়া বা ইসলামভীতি উসকে দেওয়ার বিষয়টি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট এবং উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে এখন জর্জ ডব্লিউ বুশের দিনগুলোর কথা মনে করে আফসোস করেন। ৯/১১ হামলার পরপরই বুশ এক মসজিদে গিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন, ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম।’

কিন্তু রিপাবলিকান পার্টি থেকে এ ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি এখন প্রায় উধাও হয়ে গেছে। তার জায়গায় চেপে বসেছে চরম বর্ণবাদ, যার ফলে দেখা যাচ্ছে মুসলিমবিরোধী হামলার ভয়াবহ বৃদ্ধি। যেমন মে মাসে সান দিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে নির্বিচার গুলিবর্ষণে দুজন মুসল্লি ও একজন নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারান। আবার ডালাস ফোর্ট ওয়ার্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অজুর সুবিধার্থে ছোট ছোট বেসিন বসানোর প্রস্তাবটি টেক্সাসের গভর্নর গ্রেক অ্যাবটের কড়া সমালোচনার মুখে বাতিল করা হয়। গভর্নরের দাবি ছিল, এটি নাকি অসাংবিধানিক।

এই বিষবাষ্পের উৎস কোথায়? নিঃসন্দেহে এর অনেকটাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০১৫ সালের সেই শুরুর প্রচারণার ফল, যেখানে তিনি মার্কিন সমাজে শ্বেতাঙ্গদের ঐতিহাসিক আধিপত্য হুমকির মুখে—এমন ভীতি ছড়িয়ে মানুষকে বিভক্ত করার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে শুধু মুসলিমরাই নন, সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠী আক্রমণের শিকার। তাঁর প্রশাসন যেভাবে কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস বা হিস্পানিক সংস্কৃতির ওপর আঘাত এনেছিল, তা এরই প্রমাণ। তবে ইসলামফোবিয়ার কথা এলে এর পেছনে আরও একটি গভীর ও নির্দিষ্ট স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে জেরুজালেমে একটি অ্যান্টিসেমিটিজম সম্মেলনের আয়োজন করে ইসরায়েল সরকার। এ ধরনের আয়োজন নতুন কিছু নয়, তবে নজরকাড়া ছিল এর অতিথি তালিকা। এতে ইউরোপের প্রায় সব উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা যোগ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে পুনর্বাসনপ্রক্রিয়ার পর ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে আলোচনা করার জন্য ইউরোপীয় ডানপন্থীদের এটাই ছিল সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমাবেশ।

কিন্তু এই উগ্র ডানপন্থীরাই এখন ইসরায়েলের মিত্র। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁদের সামনে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘উগ্র ইসলামের আক্রমণের’ বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে তাঁরা সহযোদ্ধা। সেই জানুয়ারির পর থেকেই নেতানিয়াহু এই বয়ান প্রতিনিয়ত বলে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘পরমাণু অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামিক রিপাবলিক হবে ব্রিটেন।’ এমনকি নির্বাচনে ‘তাদের জিততে দেবেন না’ লেখা যে বিশাল বিলবোর্ড তিনি ব্যবহার করেছেন, সেখানে হিজবুল্লাহ ও ইরানি নেতাদের পাশাপাশি রাখা হয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির ছবি।

ইসলামফোবিয়া ছড়ানোর এই প্রবণতা কেবল নেতানিয়াহুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, কিংবা কেবল ইসরায়েলের সীমান্তেই আটকে নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের নিজস্ব ভাবমূর্তি যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, তখন তারা গাজায় নিজেদের অপরাধ নিয়ে আত্মপর্যালোচনা না করে জনসংযোগ ও প্রোপাগান্ডার ওপর ভর করে বাঁচার রাস্তা খুঁজছে।

ইসরায়েলি সমাজব্যবস্থা মূলত একরূপী জনসংখ্যা ও ইহুদি আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো দিন দিন জাতিগত ও সামাজিকভাবে বহুমুখী হয়ে উঠছে। ইসরায়েলের জন্য শান্তির সঠিক পথ হতো নিজেকে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো একটি বৈষম্যহীন ও সমানাধিকারের রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

এর কিছু অংশ কাজ করছে নিজেদের তৈরি বয়ান জাহির করার কাজে। যেমন সম্প্রতি লাখ লাখ মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে আমার মুঠোফোনেও একটি বার্তা আসে—‘ইউএস-ইসরায়েল পার্টনারশিপ প্রমোটস স্ট্যাবিলিটি’ (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল অংশীদারত্ব স্থিতিশীলতা বজায় রাখে)। বার্তাটি পাঠিয়েছিল ইসরায়েলের অর্থায়নে পরিচালিত লবিং সংস্থা ক্লক টাওয়ার এক্স। কিন্তু ইসরায়েল কেবল প্রতিরক্ষাতেই থেমে নেই, তারা সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইসলামফোবিয়া উসকে দিয়ে পশ্চিমা ডানপন্থীদের একত্র করার চেষ্টা করছে।

এ কৌশলটি সম্ভবত মার্কিন জনসংযোগ সংস্থা স্টেজওয়েল গ্লোবালের এক ফাঁস হওয়া গবেষণা থেকে অনুপ্রাণিত। ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে তৈরি ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, জনমত নিজেদের পক্ষে টানার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—মানুষের মনে ‘উগ্র ইসলাম’ এবং ‘জিহাদবাদের’ ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। পশ্চিমা বিশ্ব কেন ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাবে—তার আর কোনো যৌক্তিক কারণ দেখাতে না পেরে নেতানিয়াহু এখন এই যুক্তি আঁকড়ে ধরেছেন যে ইসরায়েল নাকি ‘উগ্র ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুরো সভ্য বিশ্বের মডেল।’

ইতালির রোমে ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভ করায় আটক করা হচ্ছে এক ব্যক্তিকে

ইসরায়েলের এই প্রচারণা কৌশলের অংশ হিসেবে উগ্র ইসলামফোবিয়া কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, তার প্রমাণ কানাডাতেও দেখা গেছে। ২০২৪ সালে ‘ইউনাইটেড সিটিজেনস ফর কানাডা’ নামে ইসরায়েল সরকার পরিচালিত এক সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণায় দাবি করা হয়, মুসলিম অভিবাসীরা নাকি কানাডীয় সমাজের জন্য হুমকি এবং তারা সেখানে শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

অনেক ক্ষেত্রে আমেরিকান ও ইউরোপীয় সাধারণ মানুষ এই ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছেন। আবদুল এল-সায়েদের মতো প্রখ্যাত মুসলিম প্রার্থীদের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সাফল্য প্রমাণ করে যে সাধারণ জনগণ এই বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছেন। তা সত্ত্বেও বাস্তব সত্য হলো, মুসলিম সম্প্রদায়গুলো প্রতিনিয়ত নিজেদের অবরুদ্ধ ও কোণঠাসা মনে করছে।

ইসরায়েলি সমাজব্যবস্থা মূলত একরূপী জনসংখ্যা ও ইহুদি আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো দিন দিন জাতিগত ও সামাজিকভাবে বহুমুখী হয়ে উঠছে। ইসরায়েলের জন্য শান্তির সঠিক পথ হতো নিজেকে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো একটি বৈষম্যহীন ও সমানাধিকারের রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

কিন্তু তাদের বর্তমান প্রোপাগান্ডার মূল উদ্দেশ্য হলো উল্টো পশ্চিমাকেই ইসরায়েলের মতো বানিয়ে ফেলা। এটি পশ্চিমা বহুমাত্রিক ও বহুসংস্কৃতিবাদী সমাজের জন্য এক বড় পরীক্ষা। তবে পশ্চিম যদি এই পরীক্ষায় ব্যর্থও হয়, তার মানে এই নয় যে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জায়নবাদকে বুকে টেনে নেবে।

ভয় এবং ঘৃণা অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু ধ্বংসাত্মক হাতিয়ার। চলতি ইসলামফোবিয়া যে চরম ক্ষতি ডেকে আনবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমনকি পশ্চিমা উগ্র ডানপন্থীদের মধ্যে নিজেদের সমর্থন ধরে রাখার যে প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েল এই খেলা খেলছে, তাতেও তারা সফল হবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে।

এই মুহূর্তে ইউরোপ ও আমেরিকার সাধারণ মানুষের উচিত সত্যটা উপলব্ধি করা: এটি আসলে একটি চরম হতাশায় নিমজ্জিত রাষ্ট্রের চালানো সস্তা প্রোপাগান্ডা, যারা টিকে থাকার আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না।

  • জশ পল মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে মার্কিন নীতির প্রতিবাদে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে পদত্যাগ করেন। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।