মানবজীবনের চালিকা শক্তি হলো প্রজ্ঞা বা জ্ঞান। প্রজ্ঞা মানুষের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধিত হয় শিক্ষার মাধ্যমে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রথম শিক্ষক হিসেবে প্রথম মানব হজরত আদম (আ.)-কে শিক্ষা প্রদান করেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, ‘আর তিনি (আল্লাহ) আদম (আ.)-কে সকল কিছুর নাম, পরিচয়, গুণাগুণ, বিকাশ ও পরিণতি সম্পর্কে শিক্ষাদান করলেন।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ৩১)
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সব নবী-রাসুলগণকে তাঁদের নিজ নিজ জাতির জন্য শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাই তিনি তাঁর শত পরিচয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরিচয় হিসেবে শিক্ষক পরিচয়কেই তুলে ধরে বলেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি।’ (ইবনে মাজাহ্: ২২৯)
শিক্ষার পরম্পরার সূচনা মানবসভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই। শিক্ষকদের মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্বশিক্ষক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলাই হলেন সবচেয়ে বড় দাতা; অতঃপর আমি (হজরত মুহাম্মদ সা.), তারপর সেই ব্যক্তি, যিনি শিক্ষা অর্জন করেন এবং তা প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত থাকেন।’ (বায়হাকি: ২৫০) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন মাজিদ শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়।’ (বুখারি: ৪৬৬১ / ৫০২৭, তিরমিজি: ২৯০৭, আবু দাউদ: ১৪৫২, সহিহ্ আলবানি)
নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাই তিনি তাঁর শত পরিচয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরিচয় হিসেবে শিক্ষক পরিচয়কেই তুলে ধরে বলেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি’।
জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন পঠন-পাঠন তথা অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। আল্লাহ তাআলা ওহির প্রথম আদেশেই বলেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন; সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহাসম্মানিত—যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন; তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তারা জানত না।’ (সুরা-৯৬ আলাক, আয়াত: ১-৫)
শিক্ষা আদান-প্রদান একটি ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ: ২২৪, বায়হাকি: ১৬৬৭, সহিহ্ আলবানি)
কোরআন মাজিদে জ্ঞান ও জ্ঞানের প্রচারকদের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞানদান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উন্নত করবেন।’ (সুরা-৫৮ মুজাদালা, আয়াত: ১১) আরও বলা হয়েছে, ‘বলো, যারা জানে আর যারা জানে না—তারা কি সমান?’ (সুরা-৩৯ জুমার, আয়াত: ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তার মুখ উজ্জ্বল করুন, যে ব্যক্তি আমার কাছ থেকে একটি কথা শুনে তা শেখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (তিরমিজি)। তিনি আরও বলেছেন, ‘তিন শ্রেণির মানুষের জন্য আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা তাদের জন্য রহমত কামনা করেন। তারা হলো জ্ঞান অর্জনকারী, জ্ঞান প্রচারকারী এবং যারা এ কাজে সহযোগিতা করে।’ (তিরমিজি)
হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘যিনি আমাকে একটি বর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন, আমি তাঁর ক্রীতদাস হয়ে গেলাম। তিনি আমার মনিব। তিনি চাইলে আমাকে দাস হিসেবে রেখে দিতে পারেন, বিক্রি করতে পারেন অথবা মুক্ত করেও দিতে পারেন।’ (নাহজুল বালাগা, বায়হাকি: ২০২৩)
প্রিয় নবীজি (সা.) প্রথমে মক্কা মুকাররমায় দারুল আরকামে একটি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি নিজেই শিক্ষক ছিলেন এবং সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন শিক্ষার্থী। মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববির আঙিনার সুফফায় ‘আসহাবে সুফফা’ নামে আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ছিলেন নবী করিম (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম আর এর শিক্ষার্থী ছিলেন সাহাবায়ে কিরামসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ।
বদরের যুদ্ধের পর রাসুলে আকরাম (সা.) একটি ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন বদরের যুদ্ধে বন্দী কুরাইশরা এবং শিক্ষার্থী ছিল সাহাবিদের শিশুরা। এ ছাড়া নবীজি (সা.) বিদেশি ভাষা শিক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বিভিন্ন সাহাবিকে বিভিন্ন দেশের ভাষাশিক্ষা দেওয়া হতো। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়ই ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম
smusmangonee@gmail.com