তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান

মতামত

এরদোয়ান কি ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরাচার’ হতে চান

গত মার্চে একটি তুর্কি আদালত ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে দুর্নীতির অভিযোগে বিচার শুরুর আগেই কারাগারে পাঠান। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সরকার বলেছে, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই এবং বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কিন্তু অনেকেই এটিকে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, অত্যন্ত জনপ্রিয় বিরোধী নেতা ইমামোগলুকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে আটক করা হয়েছে এবং সেটিকে আইনের প্রয়োগ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তাঁকে আটক করার পর সারা দেশে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

আসলে তুরস্কে এখন আইন ও আদালতকে ব্যবহার করে ঠিক করা হচ্ছে—কে ভোটে দাঁড়াতে পারবে, কে কথা বলতে পারবে, কে রাজনৈতিক কাজ করতে পারবে। এভাবে বিরোধীদের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু বাইরে থেকে সবকিছু গণতন্ত্রের মতোই দেখানো হয়।

ইমামোগলুর বিরুদ্ধে মামলা ছিল এই প্রক্রিয়ার শুরু। তিনি ২০১৯ সালের ইস্তাম্বুল মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) প্রার্থীকে হারান। পরে আদালতের নির্দেশে আবার ভোট হলেও তিনিই আবার জেতেন। ২০২৪ সালেও তিনি জয়ী হন। এরপর রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) আরও কয়েকজন মেয়রকে আটক করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল বিরোধী শক্তিকে দুর্বল করা ও ভেঙে দেওয়া।

শুধু মামলা নয়, বিচারিক ও প্রশাসনিক চাপ দিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করাও এই কৌশলের অংশ। ইমামোগলুর গ্রেপ্তারের ঠিক আগে ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তাঁর ডিগ্রি বাতিল করে। ফলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারান। অথচ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই সিএইচপি তাঁকে ২০২৮ সালের নির্বাচনের জন্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করতে যাচ্ছিল। এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার: একমাত্র শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে অযোগ্য করে নির্বাচনী ক্ষেত্র ছোট করে ফেলা। কাউন্সিল অব ইউরোপ এই পদক্ষেপকে ‘গণতন্ত্রের ওপর আঘাত’ বলে নিন্দা জানায়।

বিচার শুরুর আগেই কারাবন্দী রাখার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। এখানে কাগজে-কলমে বলা হয়, এটি বিচারপ্রক্রিয়া সুরক্ষার জন্য। কিন্তু বাস্তবে এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সরিয়ে রাখার উপায় হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যখন তদন্ত ও বিচার বছরের পর বছর ধরে চলে। দুর্নীতির মামলার কৌঁসুলি ইমামোগলুর দুই হাজার বছরের বেশি কারাদণ্ড দাবি করেছেন। এটি আসলে শক্তি প্রদর্শনের মতো বিষয়, যার মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়—তাঁর রাজনীতি থেকে বিদায় অবশ্যম্ভাবী।

ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে বিচার শুরুর আগেই কারাগারে পাঠানো হয়

আদালত শেষ পর্যন্ত কী রায় দেবেন, তা আলাদা বিষয়; কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াই বিরোধী শিবিরের সময়, অর্থ ও নেতৃত্বের শক্তি ক্ষয় করবে এবং অন্য সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে ভয় ধরিয়ে দেবে।

ইমামোগলুকে নিশানা করা হয়েছে। কারণ, তিনি তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী; তিনি বিভাজন তৈরি করেন না এবং তিনি সেবাভিত্তিক রাজনীতি করেন। তিনি এমন রাজনীতি করেন, যা এরদোয়ান তাঁর সমর্থকদের ধরে রাখতে যে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির ওপর নির্ভর করেন, তার ওপর নির্ভর করে না। ইস্তাম্বুলের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর এই ভাবমূর্তিকে আরও পোক্ত করেছে। স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালন বিরোধী নেতাদের জনসমক্ষে পরিচিতি, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং বিকল্পভাবে শাসন করার সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। এ কারণেই তুরস্কে বিরোধী নেতাদের সরব উপস্থিতি থাকা শহরগুলো গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ের সামনের সারিতে থাকে।

সরকারবিরোধিতার এই ধারা শুধু ইস্তাম্বুলে সীমিত নয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তুরস্কের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মারদিন ও বাতমানের মতো কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে নির্বাচিত মেয়রদের অপসারণ করে এবং তাঁদের জায়গায় সরকার-নিযুক্ত ট্রাস্টি বসায়। এর মধ্য দিয়ে সরকার ভোটারদের যে স্পষ্ট বার্তাটি দেয়, তা হলো—‘আপনারা ভোট দিতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্র চাইলে আপনাদের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।’

তুরস্কে রাজনীতিবিদদের চুপ করানোর সঙ্গে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণও যুক্ত হয়েছে। ইমামোগলুর আটক হওয়ার পর যাতে বিরোধীরা সংগঠিত হতে না পারেন, সে জন্য বিক্ষোভ চলাকালে সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়াকড়ি আরোপ করে, মেসেজিং অ্যাপ ধীরগতির করে দেয় এবং কনটেন্ট ব্লক করার নির্দেশ দেয়। সরকার যখন ঠান্ডা মাথায় ডিজিটাল জনপরিসর বন্ধ করে দেয়, তখন সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার আশা নষ্ট হয়ে যায়।

এ ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলা একটি বড় উদাহরণ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেশটির সুপ্রিম জাস্টিস ট্রাইব্যুনাল বিরোধী নেতা (বর্তমানে নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী) মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সরকারি পদে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন। এটি ছিল আদালতের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে বাতিল করে দেওয়া।

দুই দেশেই রাজনৈতিক কৌশল একই। উভয় জায়গাতেই আইনের শাসনের দাবি বজায় রেখে এমনভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করার চেষ্টা হয়, যাতে প্রকৃত ক্ষমতার পরিবর্তন না ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর এবং চাভিস্তা (হুগো চাভেজের মডেল) শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৮১১ জন রাজনৈতিক বন্দী কারাগারে আছেন। বেছে বেছে মামলা করা, প্রশাসনিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করা এবং বিচার শুরুর আগেই আটক রাখা—এসব কৌশল ভোট পড়ার আগেই রাজনৈতিক ফল নির্ধারণ করে দেয় এবং গভীরতর স্বৈরশাসনের পথ তৈরি করে।

পশ্চিমা দেশগুলো অনেক সময় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতার নামে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ সহ্য করে। তুরস্ক ন্যাটোর মিত্র এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; আর ভেনেজুয়েলা জ্বালানি শক্তিধর দেশ। স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় বিদেশি নেতারা অনেক সময় গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষয়ের বিষয়টি হালকাভাবে দেখেন।

ইমামোগলুর কারাবন্দী হওয়া শুধু একজন রাজনীতিকের ঘটনা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, কোনো দেশ বাইরে থেকে গণতান্ত্রিক চেহারা ধরে রাখতে পারে, অথচ ভেতরে আদালত ব্যবহার করে সে রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

  • বিলাল বিলিজি তুরস্কের পার্লামেন্ট সদস্য এবং এরিক এ বাল্ডউইন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল গবেষণা ফেলো

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ