ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর সামাজিক নিরাপত্তাবলয় কতটা প্রস্তুত
ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর সামাজিক নিরাপত্তাবলয় কতটা প্রস্তুত

মতামত

প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ছে, প্রস্তুতি কতটা

বাংলাদেশ নীরবে প্রবেশ করছে এক নতুন বাস্তবতায়। আমাদের সমাজ ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে ‘প্রবীণ সমাজ’–এর দিকে। বিষয়টি ভাবতে হবে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ এখন ষাটোর্ধ্ব। পূর্বাভাস বলছে, আগামী দু–তিন দশকের মধ্যে এই হার দ্বিগুণের বেশি হবে। অর্থাৎ যে বাংলাদেশ এত দিন তরুণ জনগোষ্ঠীর সুবিধা—তথাকথিত ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’—ভোগ করেছে, সেই একই দেশ আগামী দিনে মুখোমুখি হবে ভিন্ন এক চ্যালেঞ্জের। প্রশ্ন উঠছে, এই ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর সামাজিক নিরাপত্তাবলয় কতটা প্রস্তুত?

কাগজে-কলমে বাংলাদেশে প্রবীণদের সুরক্ষায় কিছু আইনি ও নীতিগত কাঠামো রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রণীত হয়েছে ‘পিতা–মাতার ভরণপোষণ আইন’, যেখানে সন্তানদের জন্য মা–বাবার ভরণপোষণ আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে নির্ধারিত।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে চালু আছে ‘বয়স্ক ভাতা’ কর্মসূচি, যার আওতায় লাখ লাখ প্রবীণ মাসিক সহায়তা পান। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে বহু বছর আগে। কিন্তু বাস্তবায়নের প্রশ্নে ফারাক থেকে যাচ্ছে বিস্তর। মাসিক ভাতার পরিমাণ এতটাই অপ্রতুল যে তা দিয়ে একজন প্রবীণের ন্যূনতম ওষুধের খরচও অনেক সময় মেটানো সম্ভব হয় না, খাদ্য বা বাসস্থানের কথা তো দূরের কথা।

স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন, অর্থাৎ প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাবিদ্যা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। রাজধানীর হাতে গোনা কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে জেরিয়াট্রিক বিভাগ থাকলেও জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে এই সেবা প্রায় অনুপস্থিত।

এ কারণে গ্রামাঞ্চলের একজন প্রবীণকে জটিল কোনো রোগের চিকিৎসার জন্য প্রায়ই ছুটে আসতে হয় বিভাগীয় শহর বা রাজধানীতে, যা তাঁর জন্য শারীরিক পরিশ্রম, সময় আর অর্থের দিক থেকে বিশাল এক বোঝা। মেডিকেল শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও জেরিয়াট্রিক–বিশেষজ্ঞ তৈরির প্রশিক্ষণকাঠামো এখন পর্যাপ্ত নয়, এ কারণে প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি প্রকট। আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাতেও দেখা যায় একই চিত্র।

দেশে সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত প্রবীণনিবাসের সংখ্যা সীমিত; আর যেগুলো আছে, সেগুলোর ধারণক্ষমতাও অপ্রতুল। বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠা বৃদ্ধাশ্রমগুলো মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং ব্যয়বহুল, ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের কাছে এসব সেবা কার্যত নাগালের বাইরে। সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য সতর্ক করে বলেন, বৃদ্ধাশ্রম কোনো আদর্শ সমাধান নয়, বরং প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যাতে প্রবীণেরা নিজের পরিবার ও পরিচিত পরিবেশেই মর্যাদার সঙ্গে থাকতে পারেন, আর প্রয়োজনে পেশাদার সেবা তাঁদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।

প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এই ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজন বহুমুখী পরিকল্পনা। প্রথমত, বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও পরিধি বাড়িয়ে তা প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা চালু করা জরুরি, যাতে প্রবীণেরা চিকিৎসার জন্য নিঃস্ব না হয়ে পড়েন। তৃতীয়ত, কমিউনিটিভিত্তিক দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার, যেখানে প্রবীণেরা দিনের একটি অংশ কাটাতে পারবেন নিরাপদে, সামাজিকভাবে সক্রিয় থেকে। চতুর্থত, গণপরিবহন ও পাবলিক স্পেসে প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো, যেমন র‍্যাম্প, আসন সংরক্ষণ, সহজলভ্য টয়লেট নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর পঞ্চমত, যাঁরা শারীরিকভাবে সক্ষম, তাঁদের জন্য খণ্ডকালীন বা পরামর্শকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে তা শুধু তাঁদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যই বাড়াবে না, বরং তাঁদের অভিজ্ঞতাকেও কাজে লাগানো যাবে সমাজের কল্যাণে।

প্রবীণদের বিষয়টি এখনো নীতিনির্ধারণী আলোচনায় প্রান্তিক শিশু, নারী বা যুব উন্নয়নের তুলনায় এই খাতে বরাদ্দ ও মনোযোগ উভয়ই কম। অথচ জনমিতির গতিপ্রকৃতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আগামী দুই দশকে এই খাত হয়ে উঠবে জাতীয় পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। বিশ্ব প্রবীণ দিবস তাই কেবল একটি স্মারক দিন নয়; এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা—আজ যে প্রস্তুতি নেওয়া হবে, আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ঠিক তার ভিত্তিতেই। দেরি করলে যে মূল্য দিতে হবে, তা হবে অনেক বেশি ব্যয়বহুল—আর্থিকভাবে এবং মানবিকভাবেও।

  • মহসীন কবির বার্ধক্য–বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। উপপরিচালক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস