দিনাজপুরে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ সেরে গত ১৯ জানুয়ারি রাতে পৌঁছে যাই রংপুরে। সকাল হতেই ছুটলাম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মূলত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জ্বালানিসংকট নিয়ে আলোচনা।
চলমান জ্বালানিসংকট যে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, নীতি আর তোষামোদের ঘোঁট যে অনেক আগে থেকেই পাকিয়ে রাখা হয়েছে, সেটা আবু সাঈদের সতীর্থদের বুঝতে কোনো তকলিফ হয় না। জ্বালানি রাজনীতি যে কতটা কপটতার মোড়কে মোড়া আর হয়রানিমূলক, তার গুমর সহজেই ফাঁস হয়ে যায় আলোচনায়।
নানা অনুষদ আর বিভাগের শিক্ষার্থীরা ছিলেন আলোচনায়। সবাই রাজি; গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় তাঁরা জ্বালানি পর্যবেক্ষণ দল গঠন করবেন। এখন থেকে বিদ্যুৎ বিল আগের বিলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন। মিটার বদলের নামে ফটকাবাজি করে টাকা আদায় রুখে দেবেন। জ্বালানিসাশ্রয়ী সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবেন। জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানির পক্ষে জনমত গড়ে তুলবেন। দুই–তিন ঘণ্টার ঝটিকা সফরে ঝটপট আলোচনায় সবাই খুশি। হাততালি দিতে দিতে হাত ধুয়ে খেতে বসে যান সবাই।
খাবারের পরোয়া না করে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এক শিক্ষার্থী এগিয়ে এলেন। আলোচনা শুরু হওয়ার আগে সময় কাটানোর জন্য অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খুচরা আলাপ করার সময় তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। নওগাঁ থেকে আসা ছয় ভাইয়ের এক বোন গীতি আরা হোসেন (ছদ্মনাম) তাঁর নিজের জেলা নিয়ে যথেষ্ট গর্বিত। সংস্কার করতে গিয়ে ‘আলতা দীঘি’র যে সর্বনাশ হয়েছে, তাতে তাঁরাও কষ্ট পেয়েছেন।
গীতি তাঁর সাথিদের সঙ্গে রেখেই সরাসরি জানতে চাইলেন, ‘আমাদের জ্বালানির কী করবেন?’ মূল আলোচনার কোনো এক ফাঁকে বলে ফেলেছিলাম, ‘থিঙ্ক গ্লোবালি, অ্যাক্ট লোকালি’। এই বাণী পরিবেশবিদ ডেভিড ব্রাওয়ারের নামে প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। ষাটের দশকে ‘মেদিনীর বন্ধু’ বা ‘ফ্রেন্ড অব আর্থ’ হিসেবে এই স্লোগান তিনি ঘন ঘন উচ্চারণ করতেন। যদিও এই বাণী জীববিজ্ঞানী রেনে ডুবোসের নামেও একসময় পরিচিতি পেয়েছিল।
প্রাচীনকালে নগরপরিকল্পনায় একই ধরনের ধারণা প্যাট্রিক গেডেসের নামেও ব্যবহৃত হতো, যিনি পরিবেশের বিরুদ্ধে না গিয়ে পরিবেশের সঙ্গে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। যা–ই হোক, জ্বালানি নিয়ে আমাদের জাতীয়–আন্তর্জাতিক চক্রান্তের পর্দাফাঁসের আলোচনায় শিক্ষার্থীরা মোহিত হয়ে এখন তাঁদের চলমান সমস্যার চটজলদি সমাধানের কৌশল জানতে চান।
হলগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল লাগানো যায়। সেখান থেকে প্রতিটি তলায় একটা কিচেন কাম ডাইনিং রুমে চার/পাঁচটা চুলায় সংযোগ দেওয়া যায়। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থী হামিদুলের দিকে তাকিয়ে দীপালি বলেন, বাইরের কোনো লোক লাগবে না, ওরাই যথেষ্ট।
নারী শিক্ষার্থীদের হল চালু হয়েছে; আগের হলের নাম বদল হয়েছে। এই সবই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাক্ষাৎ ফলাফল। চারদিকে দেয়ালচিত্র, একনজরে জুলাই–আগস্ট ঘটনাবলি, মাঝখানে আবু সাঈদ। এক শিক্ষার্থী বললেন, ‘এসব ক্ষত ঢেকে রাখার উন্নয়ন, নিতান্তই চুনকাম উন্নয়ন বলতে পারেন। লোকদেখানো কাজকাম। মন্ত্রীরা এলে আগে যেমন গাছের গোড়ায় সাদা রং দেওয়া হতো, সে রকম আরকি।’ উদাহরণটা বেশ জুতসই লাগল।
সেন্স অব হিউমার না থাকলে এ রকম উদাহরণ মনে সহসা উঁকি দেয় না। কেউ একজন বললেন, সাঈদ ক্রমেই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। আমরা আবার আলোচনায় ফিরি। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি সমস্যা সমাধানের পথ কী? শিক্ষার্থীদের হলে ডাইনিং চালু হয় না। শিক্ষার্থীরা লুকিয়ে–চুরিয়ে রান্না সারেন।
হলের আইনে রান্নার জন্য হিটার, রাইস কুকার ইত্যাদি ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। রুমে রুমে হিটার ব্যবহার শুধু নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করে না, বিদ্যুৎ চুরির কলঙ্কেও কলঙ্কিত হন শিক্ষার্থীরা। মাঝেমধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা রুমে রুমে অবৈধ হিটার উদ্ধারের জন্য আচমকা হানা দেন (হলের ভাষায় ‘রেইড’ দেন)। যাঁরা লুকাতে পারেন, লুকান; না হলে ধরা খান। জব্দ হয়ে যায় হিটার, রাইস কুকার।
গীতির এক বন্ধু বললেন, ‘এই চোর–পুলিশ খেলা ভালো লাগে না। আমরা পড়াশোনা করতে এসেছি, কিন্তু মনের মধ্যে অপরাধবোধ নিয়ে কাটে আমাদের দিনরাত্রি। এই বুঝি রেইড হলো। রাতে ঘুমের মধ্যে স্যারদের চেঁচামেচি শুনি দেখি, আমার রাইস কুকার নিয়ে যাচ্ছে। আমরা জ্বালানি চোরের তকমা নিয়ে চলতে চাই না।’
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, যে সমালোচনার মধ্যে বড় হয়, সে শুধু নিন্দা করতে শেখে। যে সন্দেহের মধ্যে বড় হয়, সে প্রতারণা করতে শেখে। যে বিরোধিতার মধ্যে বড় হয়, সে শত্রুতা করতে শেখে। কথাবার্তায় মনে হলো, ডাইনিং সমস্যাটা মেয়েদের হলগুলোতেই প্রকট। এটাও সমস্যার আরেকটা কোণ। অন্য এক জেন্ডার ডাইমেনশন। ছেলেরা বাইরে কোথাও খেয়ে নিতে পারেন, রাতে–দিনে যেকোনো সময়। মেয়েরা চাইলেও সেটা পারেন না।
এখানে স্থানীয়ভাবে (অ্যাক্ট লোকালি) কী করা যায়?
বক্তৃতা শেষ আমাদের ফেরার তাগিদ। রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়া, পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবস্থা, অপরাধবোধের ঘেরাটোপ থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার দায়–দরদ নিয়ে কে ভাববে? আলোচনার একপর্যায়ে দীপালি নামের এক শিক্ষার্থী সাহস করে বলে ফেললেন, সব সমস্যারই সমাধান আছে।
রোনাল্ড রিগ্যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে ঠিক এই কথা বলেই বাজিমাত করেছিলেন—এভরি প্রবলেম হ্যাজ আ সিম্পল সলিউশন। হলগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল লাগানো যায়। সেখান থেকে প্রতিটি তলায় একটা কিচেন কাম ডাইনিং রুমে চার/পাঁচটা চুলায় সংযোগ দেওয়া যায়। প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থী হামিদুলের দিকে তাকিয়ে দীপালি বলেন, বাইরের কোনো লোক লাগবে না, ওরাই যথেষ্ট।
আমাদের আলোচনা যেন প্রাণ পেল। কেউ বললেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতির কথা, অনেক টাকার কথা, ভবনের নকশা পরিবর্তনের কথা। কিন্তু এর কোনোটাই চীনের প্রাচীর নয়। সদিচ্ছা থাকলেই ডিঙানো সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছেও যেতে হবে না। শুধু উদ্যোগ নিতে হবে। বলে রাখা ভালো, এই সমস্যা শুধু রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একার নয়, দেশের প্রায় সব ছাত্রীনিবাসে চলছে একই চোর–পুলিশ খেলা। উপাচার্যরা চাইলেই ন্যায্য সমাধানের পথে হাঁটতে পারেন।
গওহার নঈম ওয়ারা লেখক গবেষক
ই-মেইল : wahragawher@gmail.com
*মতামত লেখকের নিজস্ব