
সংবাদপত্রে সিজনাল বিভিন্ন অসুস্থতায় শিশু হাসপাতালে ভর্তিসংক্রান্ত প্রকাশিত ছবিগুলোর মধ্যে একটা বিষয় প্রায়ই নজরে আসে আর সেটা হলো অসুস্থ শিশুটি ব্যস্ত থাকে মোবাইল নিয়ে!
ছবিগুলো দেখে অনুমান করা যায় যে সে হয় গেম খেলছে, অথবা কোনো ভিডিও দেখছে। ছবিগুলো যতবার দেখেছি, ততবার একটাই প্রশ্ন মাথায় এসেছে, অসুস্থ শিশুটিকে মোবাইল দিল কে?
প্রশ্ন এসেছে, হাসপাতালের চিকিৎসাকেন্দ্রিক একটা পরিবেশের মধ্যেও মোবাইলটি কীভাবে শিশুটির একটা স্বাভাবিক ব্যবহারের অংশ হয়ে উঠে?
অসুস্থ অবস্থায় শিশুটি নিজে জোর করে মোবাইল চেয়ে নিয়েছে—এমনটা না হওয়ার সম্ভাবনাই অনেক বেশি।
তাহলে কোনো একপর্যায়ে মা-বাবা বা অভিভাবকই নিশ্চয়ই তার হাতে মোবাইল দিয়েছেন, অথবা যদি সে চেয়েও থাকে, তাহলে তাকে ব্যবহারে বাধা দেননি।
অসুস্থ একটা শিশুকে কেন তাঁরা ফোনটা দিয়েছেন? শিশুটিকে শান্ত রাখতে? শারীরিক অস্বস্তি বা ভয় থেকে মনোযোগ সরিয়ে রাখতে? হাসপাতালে দীর্ঘ সময়ে একঘেয়েমি কাটাতে? নাকি শুধুই শিশুটির কান্না থামাতে?
বিষয়টি যে শুধুই সংবাদপত্রের কয়েকটি ছবিতে চোখে পড়া দৃশ্য নয়, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় ২০২৫ সালে জার্নাল অব পেডিয়াট্রিকসে প্রকাশিত এক গবেষণায়।
সেখানে দেখা যায়, ব্রাজিলের একটা হাসপাতালে ভর্তি ২৬০ শিশু দিনে গড়ে ২৭০ মিনিট (৪.৫ ঘণ্টা) স্ক্রিনে সময় কাটিয়েছে। এটা ছিল বাড়িতে তাদের কাটানো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। হাসপাতালে থাকা শিশুদের মধ্যে মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ক্রিন টাইম–সংক্রান্ত সুপারিশ মেনে চলেছে।
অর্থাৎ ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুই অতিরিক্ত সময় স্ক্রিন ব্যবহার করেছে।
২.
এটা সত্য হাসপাতালে একটা শিশু দীর্ঘ সময়ই একঘেয়েমির মধ্যেই থাকে। এর সঙ্গে থাকে, ভয়, শারীরিক অস্বস্তিও।
তাকে কিছু সময়ের জন্য এ ধরনের খারাপ লাগার পরিস্থিতি থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে মোবাইলে গেম, ভিডিও বা অন্য কোনো কনটেন্ট দেওয়া হতে পারে।
চিকিৎসাশাস্ত্রে শিশুর এমন মনোযোগ সরিয়ে রাখার পদ্ধতিকে ‘থেরাপিউটিক ডিস্ট্র্যাকশন’ বলা হয়। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রে ‘থেরাপিউটিক ডিস্ট্র্যাকশন’ হিসেবে স্ক্রিনের ব্যবহার একটা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য, একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তের সাময়িক ব্যবহার।
যেমন অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার আগের কয়েক মিনিট, সুই ফোটানো বা মাস্ক পরানোর ভয় কাটাতে, কোনো ক্ষত পরিষ্কারের সময় প্রভৃতি।
এ ছাড়া এই চিকিৎসা-কৌশলে ট্যাবলেটের ব্যবহার বেশি থাকে; কারণ, এটা হাসপাতাল নিজে সরবরাহ করে। এটার কনটেন্টও থাকে হাসপাতাল-কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত।
ডেঙ্গু কিংবা নিউমোনিয়ার ওয়ার্ডে দিনের পর দিন ভর্তি থাকা একটা শিশুর হাতে টানা ফোন থাকা নিশ্চয়ই ডিস্ট্র্যাকশন পদ্ধতির আওতাভুক্ত নয়।
হাসপাতালে কেন অভিভাবকেরা অসুস্থ শিশুর হাতে মোবাইল দেন, এটার একটা ধারণা পাওয়া যায় থাইল্যান্ডের একটা গবেষণায়।
গবেষণাটিতে হাসপাতালে ভর্তি ২৫৪ শিশুর অভিভাবকের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছিল, অসুস্থ শিশুকে তাঁরা কেন মোবাইল দিয়েছেন।
২০২২ সালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে দেখা যায়, ৯৪ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা হাসপাতালে অন্য কোনো বিনোদন বা করার মতো কিছু না থাকায় একঘেয়েমি কাটাতে শিশুকে স্ক্রিন দিয়েছেন।
৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশুকে খেলতে ও কিছুটা শান্ত বা স্বস্তিতে রাখতে স্ক্রিন ব্যবহার করতে দিয়েছেন। আবার ৫৮ শতাংশ অভিভাবক শিশুর ব্যথার সময় তার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে কষ্ট কমাতে স্ক্রিন দিয়েছেন।
৪৯ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশু অতিরিক্ত কান্নাকাটি বা অভিযোগ করলে তাকে শান্ত করতেও মোবাইল দিয়েছেন।
অর্থাৎ হাসপাতালে শিশুর হাতে মোবাইল দেওয়ার পেছনে শুধু শিশুর আবদার কাজ করছে—বিষয়টা মোটেও এমন নয়।
বরং অভিভাবকেরাই উদ্যোগী হয়ে শিশুর একঘেয়েমি, অস্বস্তি, ব্যথা, কান্না বা অস্থিরতা সামলানোর ক্ষেত্রে একটা সহজলভ্য সমাধান হিসেবে হাতের কাছে থাকা মোবাইলকে নির্বাচন করেছেন।
প্রশ্নটা হলো, শিশুকে সাময়িকভাবে স্বস্তির জন্য দেওয়া মোবাইলটা কি শুধুই সেই মুহূর্তের প্রয়োজন মেটাচ্ছে?
নাকি ধীরে ধীরে এটা শিশুকে সব ক্ষেত্রেই সামলানোর নিয়মিত, স্বাভাবিক উপায় হয়ে উঠছে?
মনে পড়ে, অভিভাবকদের খুব পরিচিত একটা অভিযোগ ‘আমার বাচ্চা মোবাইল ছাড়া থাকতে পারে না’, কিংবা ‘আমার বাচ্চা মোবাইল ছাড়া খায় না’ প্রভৃতি প্রভৃতি।
কিন্তু মোবাইলের সঙ্গে তার প্রথম যোগাযোগটা, কিংবা মোবাইলের সঙ্গে তার পরিচয়টা কে করিয়েছে?
অর্থাৎ সে প্রথম যখন মোবাইল হাতে নিয়েছিল, তখন সেটা কে দিয়েছিল? কান্না থামাতে, খাওয়ানোর সময় ব্যস্ত রাখতে, মা–বাবা নিজের কাজের ফাঁকে একটু সময় পেতে তাকে কে ডিভাইসটা হাতে তুলে দিয়েছিল?
এভাবে দুই-একবার প্রয়োজনের মুহূর্তে দেওয়া মোবাইল কখন শিশুর অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠছে, সেটা কি আমরা ভেবে দেখেছি?
এটা সত্য যে হাসপাতালে অসুস্থ শিশুকে সাময়িকভাবে ব্যস্ত রাখতে মোবাইল দেওয়া আর দৈনন্দিনকার জীবনে শিশুকে মোবাইলের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা এক বিষয় নয়।
কিন্তু দুইটা প্রসঙ্গের মধ্যে একটা জায়গায় সাদৃশ্য আছে, সেটা হলো মোবাইল ব্যবহারের সুযোগটা তাকে তৈরি করে দিচ্ছে কে?
পারিপার্শ্বিকতার প্রয়োজন কিংবা দাবি আর অভ্যাসের মধ্যে সীমারেখাটা আসলে কোথায়?
তাহলে বোঝার বাকি থাকে না যে এই বিষয় শুধু শিশুর মোবাইল-নির্ভরশীলতার নয়, বরং এই নির্ভরশীলতা, এই অভ্যাসের পেছনে আছে একজন অভিভাবকের সিদ্ধান্তেরও প্রসঙ্গ।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষত প্রতিযোগিতামূলক গেম খেললে শরীরের স্ট্রেস হরমোন বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সাধারণভাবে একটু বলা যায় যে গেম খেলা শিশুটিকে বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও, তার মস্তিষ্ক তখনো নানা উদ্দীপনার মধ্যে সক্রিয় থাকে।
৩.
মোবাইলে গেম খেলাটা আসলে কোনোভাবেই শুধু দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে এটা একটা নিষ্ক্রিয় বিষয়।
গেমের প্রতিটি লেভেল, প্রতিটি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়: কোন দিকে যাব, কখন লাফ দেব, কাকে মারব, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করব প্রভৃতি। তীক্ষ্ণ এই ধরনের মনোযোগ আর সিদ্ধান্ত গ্রহণ মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত অবস্থায় রাখে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষত প্রতিযোগিতামূলক গেম খেললে শরীরের স্ট্রেস হরমোন বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ সাধারণভাবে একটু বলা যায় যে গেম খেলা শিশুটিকে বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও, তার মস্তিষ্ক তখনো নানা উদ্দীপনার মধ্যে সক্রিয় থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো: হাসপাতালে অসুস্থ শরীর আসলে কী চায়? উত্তেজনা, নাকি কিছুটা স্থিরতা ও বিশ্রাম?
অসুস্থ অবস্থায় একটি শিশুর শরীর, মনের বিশ্রাম প্রয়োজন, প্রয়োজন কিছুটা শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে ধীরস্থিরতা।
অথচ সেই সময় যদি তাকে মোবাইল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয় আর সে যদি গেম খেলতে থাকে, কিংবা ভিডিও দেখে, সক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে, তাহলে কি সত্যিকারের অর্থে সে বিশ্রাম পাচ্ছে?
সুতরাং, হাসপাতালে অসুস্থ শিশুর হাতে মোবাইল দেখলেই শুধু এটুকু বলা যথেষ্ট নয় যে শিশুটির হাতে মোবাইল আর সে সেটা ব্যবহার করছে। বরং ভাবার বিষয় হলো, সেই মুহূর্তে শিশুটির আসলে কী প্রয়োজন?
৪.
হাসপাতালের বিছানায় অসুস্থ শিশুর হাতে মোবাইলের দৃশ্য তাই শুধু একটি শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের ছবি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন অভিভাবকের সজাগ সিদ্ধান্তও।
শিশুটির ব্যথা, ভয় বা একঘেয়েমি থেকে মন সরাতে কিছু সময়ের জন্য হয়তো মোবাইলটি দেওয়া হয়েছে, যা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যুক্তিসংগতও হতে পারে।
কিন্তু নির্দিষ্ট সেই মুহূর্তের প্রয়োজন যেন ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত না হয়, সেটিও দেখার দায়িত্ব অভিভাবকের।
কারণ, মোবাইলের প্রতি একাগ্রতা দেখে কখনোই বিরক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয় যে ‘আমার ছেলে মোবাইল ছাড়া থাকতেই পারে না’।
কারণ, সেই মোবাইলটা ব্যবহারের অনুমতি আমরাই তাকে দিয়েছি। এ ক্ষেত্রে বরং প্রশ্নটি হতে পারে, ‘কখন, কেন এবং কীভাবে আমরা তার হাতে মোবাইল তুলে দিয়েছি?’
জান্নাতুল রুহী সাংবাদিক ও লেখক।