২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রায় সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে না। অথচ দুই বছর আগে তারা নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করেছিল। এ রকম প্রায় ১৯ লাখ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর মধ্যে ফরম পূরণ করেছে সাড়ে ১৪ লাখের চেয়েও কমসংখ্যক শিক্ষার্থী। নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের বাকি সাড়ে চার লাখ কোথায় গেল, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। শিক্ষার অগ্রগতি ও বিস্তার কেবল শিক্ষার ওপর নির্ভর করে, ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়।
নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য নবম শ্রেণিতে উঠেই একজন শিক্ষার্থীকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। নবম ও দশম শ্রেণিতে দুই বছর পড়াশোনা শেষ করার পর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগে তারা ফরম পূরণ করে। গত বছরের তুলনায় এবার এ রকম ফরম পূরণ করা পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি, এ বছর সেখানে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের মতো। পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী এবার পরীক্ষার্থী কমেছে ৭৯ হাজার ২৩৫ জন।
এভাবে পরীক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে সমাজ ও অর্থনীতির বিভিন্ন কারণ যুক্ত থাকতে পারে। যেসব শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল, পরে পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি, তাদের একটা বড় অংশ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার চালানো জরিপ এটাই বলে যে আমাদের দেশে শিক্ষার্থী ঝরে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও বাল্যবিবাহ। নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সামাজিক অনিরাপত্তাও একটা সংকট। এ ছাড়া কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে কিংবা বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় পাস করতে না পারার কারণেও পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
গত বছর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর দেখা গিয়েছিল, ফরম পূরণ করার পরেও পরীক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। তাদের তথ্য যাচাই করে তখন বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, বাল্যবিবাহ হওয়ার কারণে মূলত তারা পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। এ–ই যদি হয় বাস্তবতা, তবে শিক্ষা নিয়ে কথা বলার আগে দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ, এসএসসি পরীক্ষা শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর বা ধাপ। এই ধাপ অতিক্রম করতে না পারার ব্যর্থতা এককভাবে মোটেও শিক্ষার্থীর নয়।
গত বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থী; কিন্তু একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল পৌনে ১১ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে কারিগরিতে উত্তীর্ণ এক লাখের মতো পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাদ দিয়ে হিসাব করলেও দেখা যায়, এক লাখের বেশি পরীক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে আবেদনই করেনি।
শিক্ষা যে ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হচ্ছে, সেটি আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি। স্কুল-কলেজের প্রতিবছরের ভর্তি ফি ও বেতন পরিশোধ করার সক্ষমতাই থাকে না অসংখ্য পরিবারের। এর সঙ্গে আছে বই-কলম-খাতা ও শিক্ষাসংক্রান্ত অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়। তা ছাড়া কোচিং ও গাইড ছাড়া পড়াশোনা করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে; ফলে এই খাতেও অভিভাবকদের টাকা গুনতে হয়। এক পরিবারের একাধিক সন্তান থাকলে সে ক্ষেত্রে খরচ দ্বিগুণ থেকে কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে শিক্ষার খরচ চালাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বাল্যবিবাহ দীর্ঘদিন ধরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে রয়েছে। সামাজিকভাবে বাল্যবিবাহের বিপরীতে আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া গেছে, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন পুরোপুরি দেখা যায় না। আর্থিক অসচ্ছলতা, সামাজিক নিরাপত্তাঘাটতি এগুলোও বাল্যবিবাহকে উসকে দিচ্ছে। ফলে, শিক্ষার প্রকৃত বিস্তার ঘটাতে চাইলে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নকে এর সঙ্গে এক করেই দেখতে হবে। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে শুধু আইন প্রয়োগ করে হবে না, মানুষের মনোগত পরিবর্তন নিয়েও কাজ করতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এর সুফল পাওয়া যাবে না।
দেখা যাচ্ছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর এসএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। মাদ্রাসা বোর্ড থেকে গত বছর ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫৭২ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল; সেখানে এ বছর অংশ নিচ্ছে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন।
মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ার পেছনে ধর্মীয় কারণ বিদ্যমান থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলোও এ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে থাকবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত জরিপ চালিয়ে এর প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়তে থাকে, সেটিও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
এ বছর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সবাই নিশ্চয় পরীক্ষায় পাস করবে না কিংবা ভালো ফল করবে না। ফলে, শিক্ষার্থীদের আরেকটি অংশ এই পরীক্ষার পর অনিয়মিত হয়ে যেতে পারে কিংবা একেবারেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে পারে। আবার যারা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তাদের সবাই যে কলেজে বা মাদ্রাসায় ভর্তি হবে, এমন নয়।
গত বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থী; কিন্তু একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছিল পৌনে ১১ লাখ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে কারিগরিতে উত্তীর্ণ এক লাখের মতো পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাদ দিয়ে হিসাব করলেও দেখা যায়, এক লাখের বেশি পরীক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে আবেদনই করেনি।
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরতে রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ কিছু স্লোগান বা আপ্তবাক্য চালু আছে। এ রকম একটি স্লোগান—সবার জন্য শিক্ষা। কিন্তু সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষাও আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না। এ অবস্থায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণগুলো চিহ্নিত করা দরকার এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ২০১০ সালের সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছে, ‘একটা জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হলো শিক্ষা’। সত্যিকার অর্থে যদি শিক্ষার মাধ্যমে জাতির উন্নতি ঘটাতে হয়, তবে সমস্যকে ‘সমস্যা’ হিসেবে বিবেচনায় নিয়েই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।
• তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।