মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ডবাসীর প্রতিবাদ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ডবাসীর প্রতিবাদ

মতামত

ট্রাম্পের কাছে গ্রিনল্যান্ড কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

এ বছরের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে একটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল। সেটি হলো গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি।

ট্রাম্প ও ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতের মধ্যে একটি সীমিত কাঠামোর সমঝোতার ঘোষণা আপাতত স্বস্তির খবর। যদিও এটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ দখলচেষ্টাকে ঢাকার জন্য ‘ডুমুরপাতা’ও হতে পারে। কারণ, ট্রাম্পের আগ্রাসী বক্তব্য আসল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত বাস্তবতাকে আড়াল করে ফেলছিল।

ট্রাম্পের যুক্তি হলো, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত উপস্থিতি না থাকলে চীন ও রাশিয়া সেখানে প্রভাব বিস্তার করবে। এতে আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাশিয়া বা চীন গ্রিনল্যান্ডে হামলা চালাবে, দখল নেবে বা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ক্ষতি করবে—এমন দাবি অনেকটাই অতিরঞ্জিত। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক রাজ্যের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। এটি কোনো শত্রুশক্তির সামরিক ঘাঁটি নয়। প্রতিরক্ষা জোরদার করার প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু একে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পরাশক্তির জন্য ‘সহজে দখলযোগ্য’ বলা মানে ন্যাটো ও তার সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতিকে (অনুচ্ছেদ ৫) কার্যত অস্বীকার করা।

গ্রিনল্যান্ডের প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব মূলত আর্কটিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। দ্বীপটি গ্রিনল্যান্ড-আইসল্যান্ড-যুক্তরাজ্য (জিআইইউকে) গ্যাপের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এই সামুদ্রিক করিডর দিয়েই রাশিয়ার নর্দান ফ্লিটের সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ উত্তর আটলান্টিকে প্রবেশ করে। ফলে ন্যাটোর পক্ষে রাশিয়ার নৌবাহিনী নজরদারি ও প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আবার আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলতে থাকায় নতুন ট্রান্স-পোলার ও উচ্চ অক্ষাংশের নৌপথ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আগাম সতর্কতা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার জন্য একটি অনন্য অবস্থান। তবে এই কৌশলগত সুবিধা কাজে লাগাতে গ্রিনল্যান্ডের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি নয়। ১৯৫১ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সেখানে সেনা মোতায়েন, ঘাঁটি নির্মাণ ও আধুনিকায়ন এবং ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ও মহাকাশ নজরদারির ব্যবস্থা পরিচালনার বিস্তৃত অধিকার ভোগ করছে। শীতল যুদ্ধের শুরুর দিকে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক স্থাপনা ছিল।

বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র একটি নিজস্ব সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এটি ডেনমার্ক বা গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে দেওয়ার কারণে নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেখান থেকে সরে এসেছে। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি চান, তবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জনের বিনিময়ে নয়। যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল অনুরোধ জানালেই যথেষ্ট।

সত্যি বলতে, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন অনেক বাড়িয়ে দেবে। যদিও মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়, যা ট্রাম্পের আকর্ষণের কারণ হতে পারে। বাস্তবে এর আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল বা ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান আয়তনের প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ উনিশ শতকের বড় বড় ভূখণ্ড সম্প্রসারণের মতোই একটি সংযোজন।

গ্রিনল্যান্ডের একটি দিক প্রায় আলোচনায় আসে না। সেটি হলো এখানে বিশ্বের সবচেয়ে উত্তরের দিকের কয়েকটি গলফ কোর্স রয়েছে। ক্যানগারলুসুয়াকে একটি পুরোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশে এমন একটি গলফ কোর্স আছে, যেখানে বিনিয়োগের প্রয়োজন। ট্রাম্পের প্রিয় খেলাটির প্রতি যদি কোনো প্রস্তাবে সামান্য ইঙ্গিত থাকে, তাহলে দর-কষাকষি আরও সহজ হতে পারে।

কিন্তু গ্রিনল্যান্ডের ৮০ শতাংশ এলাকা স্থায়ী বরফে ঢাকা। ফলে এখান থেকে বিপুল সম্পদ আহরণের সম্ভাবনা খুব সীমিত। খনিজ সম্পদ নিয়ে একসময় কিছুটা আগ্রহ দেখা গেলেও ট্রাম্প এখন বুঝতে পারছেন, কঠোর জলবায়ু ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে গ্রিনল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদনের জন্য আদর্শ জায়গা নয়।

তারপরও ট্রাম্প বিষয়টিকে আরেকভাবে দেখেন। তাঁর চোখে এটি ইউরোপকে ‘উপকারের মূল্য’ চুকিয়ে দেওয়ার একটি উপায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের হাত থেকে ইউরোপকে মুক্ত করা এবং পরে ন্যাটোর মাধ্যমে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি এ দাবি তুলছেন। ট্রাম্প মনে করেন, ন্যাটো মূলত ইউরোপের স্বার্থই রক্ষা করে।

কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি হলো তার জোটব্যবস্থা, বিশেষ করে ন্যাটো। এই জোট বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। চীন বা রাশিয়ার কাছে এর তুলনীয় কোনো জোট নেই। একসময় ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভের যুক্তি থাকতে পারে। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলেছে। মাথাপিছু হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র আর ন্যাটোর সবচেয়ে বেশি ব্যয়কারী দেশ নয়, এ ক্ষেত্রে নরওয়ে এগিয়ে। বর্তমানে সব ন্যাটো দেশই জিডিপির অন্তত ২ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করছে। গত গ্রীষ্মে স্পেন ছাড়া সবাই ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যে একমত হয়েছে, যার মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হবে সরাসরি প্রতিরক্ষা খাতে।

ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোর সম্পদ নিজের স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে। এই সামরিক সমন্বয় যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বজুড়ে বড় পরিসরে কার্যকর শক্তি মোতায়েনের সুযোগ দেয়। ট্রাম্প ইরাক ও আফগান যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্রকে আবার যুদ্ধে যেতে হয়, তখন মিত্র থাকা নিঃসন্দেহে ভালো।

গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নের সমাধানে বিভিন্ন মডেল হতে পারে। যেমন ১৯০৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার গুয়ানতানামো উপসাগর স্থায়ী লিজে ব্যবহার করছে। কিউবার দাবির পরও এটি কেবল পারস্পরিক সম্মতিতেই বাতিল করা সম্ভব। আরেকটি উদাহরণ পানামা খাল অঞ্চল। বিশ শতকের বড় অংশজুড়ে পানামা যুক্তরাষ্ট্রকে খাল এবং দুই পাশের পাঁচ মাইল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে দিয়েছিল। আবার সাইপ্রাসে যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলোও ব্রিটিশ সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত।

গ্রিনল্যান্ডের একটি দিক প্রায় আলোচনায় আসে না। সেটি হলো এখানে বিশ্বের সবচেয়ে উত্তরের দিকের কয়েকটি গলফ কোর্স রয়েছে। ক্যানগারলুসুয়াকে একটি পুরোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটির পাশে এমন একটি গলফ কোর্স আছে, যেখানে বিনিয়োগের প্রয়োজন। ট্রাম্পের প্রিয় খেলাটির প্রতি যদি কোনো প্রস্তাবে সামান্য ইঙ্গিত থাকে, তাহলে দর-কষাকষি আরও সহজ হতে পারে।

মাইকেল ফ্রোম্যান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ