
কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের চোখের গুরুতর সমস্যার চিকিৎসার জন্য তাঁকে গোপনে হাসপাতালে নেওয়ার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি তথাকথিত ‘হাইব্রিড সরকারের’ আরেকটি বড় ভুল। বিষয়টি পরিবারকে তো জানানো হয়ইনি, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকদেরও অবগত করা হয়নি। এই ভুলের দায় শেষ পর্যন্ত পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের ঘাড়েই এসে পড়ে। কারণ, খানের রাজনৈতিক প্রভাব ও সমর্থকদের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাই সরকারকে এমন ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছে।
আসলে দায়টা পুরোপুরি তাঁরই। কারণ, তাঁর সমর্থকেরা যদি দলে দলে হাসপাতালে জড়ো হয়ে পড়বে এই ভয় না থাকত, তাহলে এমন একটি বিষয় গোপন রাখারই-বা কী প্রয়োজন ছিল? এমনিতেই কয়েক দিনের মধ্যেই খবরটি প্রকাশ্যে আসত।
তোশাখানা মামলায় গ্রেপ্তার ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর টানা ৩২ মাস কারাগারে থাকার পরও ইমরান খানের জনপ্রিয়তা কমেনি। তাঁর তীক্ষ্ণ ও কার্যকর রাজনৈতিক বয়ানও ভোঁতা হয়ে যায়নি। ফলে এক অর্থে বন্দীই তাঁর বন্দীকারীদের ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছেন। কারাগারের সেলের সীমা ছাড়িয়েও তিনি প্রভাব ও ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।
এসব কথা আমি বলছি এমন একজন হিসেবে, যিনি কখনো তাঁকে বা তাঁর দলকে ভোট দেননি। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়; বরং একজন কিংবদন্তি ক্রিকেটার ও ক্যানসারবিরোধী আন্দোলনের অগ্রদূত হিসেবেই আমি ইমরান খানকে বেশি পছন্দ করতাম। রাজনীতিতে তাঁর বৈশিষ্ট্য ছিল জনতুষ্টিবাদী ভাষা এবং ভিন্নমতের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা।
২০২২ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা হারানোর জন্য তিনি ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। তাঁর সমর্থকেরা (যাঁদের চোখে তিনি কখনো ভুল করেন না) এই বক্তব্য সহজেই গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে এই বয়ান লাখো মানুষের মধ্যে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয় যে তাঁর সঙ্গে ভয়াবহ অন্যায় করা হয়েছে।
গত দশকের প্রথমার্ধে যখন তাঁর দলের পৃষ্ঠপোষকেরা তাঁকে সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে তুলে ধরছিলেন এবং বহু গণমাধ্যম তাঁকে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার দিচ্ছিল, তখন তিনি জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে চড়ে এগিয়ে যান।
একই সঙ্গে তিনি শক্তিশালী একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেটওয়ার্কও গড়ে তোলেন। এখন পরিস্থিতি উল্টো। মূলধারার গণমাধ্যমের বড় অংশ সরকারের লাইনে চলে গেছে এবং পিটিআইয়ের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। তবু ইমরান খান খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত নন। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর বার্তা ও বয়ান সরাসরি তাঁর সমর্থকদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই কারণেই তাঁকে কার্যত যোগাযোগহীন করে রাখা হয়েছে। জেলবিধি অনুযায়ী শুধু পরিবারের সদস্যরা (মূলত তাঁর বোনেরা) সীমিতভাবে সাক্ষাৎ করতে পারছেন। দলের নেতাদের সপ্তাহের পর সপ্তাহ দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ, তাঁদেরই মনে করা হয় সেই মাধ্যম, যার মাধ্যমে ইমরান খানের বার্তা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিমের কাছে পৌঁছে যায়। ওই টিম তাঁর অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে ও বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
সত্যি বলতে, এখন পর্যন্ত এসব বার্তা তাঁর সমর্থকদের রাস্তায় নামিয়ে তাঁর মুক্তির দাবিতে বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। তবে সেসব বার্তার ভাষা প্রায়ই এতটাই তিক্ত ও কঠোর যে তা বর্তমান ক্ষমতাবানদের বিরক্ত করে। ফলে তাঁর দর্শনার্থীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে তাঁর বার্তা পৌঁছানোর পথও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ কতটা বৈধ, সে বিতর্ক অন্য সময়ের জন্য তোলা থাক। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে প্রায় এক সপ্তাহ ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে শেষে সত্য স্বীকার করা হাইব্রিড শাসনব্যবস্থাকে খুবই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে।
আব্বাস নাসির ডন-এর সাবেক সম্পাদক
ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত