
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘদিন ধরে চেপে বসা এক স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। এ ধরনের বড় মাত্রার রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান বা পরিবর্তন মানুষের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি করে। সেই প্রত্যাশা এবং বাস্তবতা নিয়ে লিখেছেন এ কে এম জাকারিয়া।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছরের মাথায় একটা হিসাব-নিকাশ অনেকেই করতে চাইবেন। জুলাই থেকে কী পাওয়া গেল? মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এল বা যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল তার কতটা বাস্তবায়িত হলো? প্রশ্নগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন।
সাধারণভাবে দেখলে পরিবর্তনের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তার অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে। মানুষের জীবন বদলায়নি, রাষ্ট্র বদলায়নি, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থমকে গেছে। সমাজে উগ্রবাদী শক্তির দাপট বেড়েছে, যা বৈষম্য মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে কাজ করছে। অনেক কিছু আগের ধারাবাহিকতাতেই চলছে। জুলাই একটি নির্বাচিত সরকার দিয়েছে, কিন্তু তাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সংস্কার হবে—এমন আশা অনেকেই আর ধরে রাখতে পারছেন না। এগুলো সবই বাস্তবতা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে শুধু এই বিবেচনা থেকে মূল্যায়ন করব? জুলাইয়ের পরের যে রাজনৈতিক ব্যর্থতা, তাকে কি জুলাইয়ের ব্যর্থতা হিসেবে দেখব? অথবা জুলাইয়ের কাছ থেকে কি আমরা এখনই খুব বেশি আশা করছি, যা এ ধরনের গণ-অভ্যুত্থান কখনো এত দ্রুত পূরণ করতে পারে না?
ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ অ্যালেক্সিস দ্য তকভিল তাঁর দ্য ওল্ড রেজিম অ্যান্ড দ্য রেভোল্যুশন বইয়ে লিখেছেন, পুরোনো শাসনব্যবস্থার পতনের পর নতুন কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজটি হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন। তিনি মনে করেন, পুরোনো ক্ষমতাকে উৎখাত করা গেলেও রাতারাতি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায় না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দীর্ঘদিন ধরে চেপে বসা এক স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। এর জন্য মূল্যও দিতে হয়েছে অনেক। বহু প্রাণ ঝরেছে, লাখো মানুষকে রাস্তায় নামতে হয়েছে। এ ধরনের বড় মাত্রার রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থান বা পরিবর্তন মানুষের মধ্যে বড় প্রত্যাশা তৈরি করে। দীর্ঘ দমন-পীড়ন বা অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার মানুষ ভাবতে শুরু করে যে এবার সবকিছু বদলে যাবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাসে একেই বলে, ‘রেভোল্যুশন অব রাইজিং এক্সপেক্টেশন’। আর রাষ্ট্রের সক্ষমতার তুলনায় যখন প্রত্যাশা বেশি হয়ে যায়, তখন দ্রুত বদল ঘটে না এবং মানুষের মধ্যে হতাশা তীব্র হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সূত্রে। মানুষের মনে আশা তৈরি হয় যে সরকার পতনের পর তারা বৈষম্যের অবসান দেখবে। জাতি বা ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে আধিপত্য, তা থাকবে না, আমলাতন্ত্র জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে, দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না, নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে, রাজনৈতিক দখলদারি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হবে, দলগুলো সংকীর্ণ স্বার্থ ও হানাহানি থেকে মুক্ত হবে, ঐকমত্যের ভিত্তিতে এক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্রের কাঠামো এতটাই জটিল যে তাকে বদলানো খুব কঠিন। অন্যদিকে রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যে সংস্কৃতি, সেখানে সহজে কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
জার্মান-মার্কিন দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানা আরেন্ট তাঁর অন রেভোল্যুশন বইয়ে লিখেছেন, বিপ্লব মানুষের সামনে স্বাধীনতার নতুন পথ খুলে দেয়, কিন্তু টেকসই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কাজটি অনেক কঠিন। আসলে রাষ্ট্রের আসল পরীক্ষা শুরু হয় বিপ্লব, গণ-অভ্যুত্থান বা বড় পরিবর্তনের পর। নতুন সরকার কতটা কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে তার ওপরই নির্ভর করে সবকিছু। জুলাই–পরবর্তী বাংলাদেশে এই পরীক্ষায় প্রথম পড়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আর এখন এই দায়িত্ব নির্বাচিত সরকার বিএনপির।
আমরা জানি, স্বাধীনতা, সাম্য আর ভ্রাতৃত্বের স্বপ্ন নিয়ে সূচনা ঘটেছিল ফরাসি বিপ্লবের। কিন্তু এর রাজনৈতিক পথ ছিল দীর্ঘ, জটিল এবং রক্তাক্ত। বিপ্লবের পরপর ‘সন্ত্রাসের রাজত্বে’ খুনোখুনির শিকার হয়েছে হাজার হাজার মানুষ, চেপে বসেছিল নেপোলিয়নের একনায়কতন্ত্র। তখনকার ফরাসিদের কাছে নিশ্চয়ই মনে হয়েছিল যে বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের রায় বলছে, বিপ্লবই ফ্রান্সকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল। আর বর্তমান আধুনিক সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তিও তৈরি করেছে এই ফরাসি বিপ্লব।
পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের পতনের পর পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া বা চেকোস্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলোও চরম বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও রাজনৈতিক বিভ্রান্তির মধ্য দিয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানকার অনেক নাগরিকের মধ্যে ‘আগেই ভালো ছিলাম’ ধরনের মনোভাব তৈরি হয়েছিল।
অন্যদিকে ‘আরব বসন্ত’ আরব দেশগুলোতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা এখন পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। স্বৈরশাসনের পতনের পর মিসর আবার সামরিক শাসনে ফিরেছে। আরব বসন্তের ঢেউয়ে টালমাটাল হওয়া লিবিয়া, ইয়েমেন বা সিরিয়া আজ গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আরব বসন্তকে কি আমরা ‘ব্যর্থ’ হিসেবে তকমা দিয়ে দেব?
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মার্ক লিঞ্চ অবশ্য তা মনে করেন না। তিনি এ বিষয়ে তাঁর বইয়ের শিরোনাম দিয়েছেন দ্য আরব আপরাইজিং। আরব দেশগুলোর জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে তিনি শুধু ‘আরব বসন্ত’ হিসেবে দেখতে চাননি। তিনি ‘আরব বসন্ত’ পরিভাষার বিরোধিতা করে একে দীর্ঘমেয়াদি ও অসমাপ্ত বিপ্লব হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে এটা কোনো ব্যর্থ বিপ্লব নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তরের শুরু। তিনি মনে করেন, বিপ্লবের ফলাফল কয়েক বছরে বোঝা যায় না, এর জন্য কয়েক দশক সময় লাগে।
বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মাত্র দুই বছর সময় পার করেছে। এর অর্জন ও অপূর্ণতার দিকগুলো আমরা পর্যালোচনা করে দেখতে পারি। জুলাই অভ্যুত্থান দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে। জনগণ তাদের হারানো ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। স্বৈরশাসনের সময় গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেভাবে সংকুচিত হয়েছিল জুলাই অভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটিয়েছে এবং সেগুলো দূর করার একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা এবং অনেক ক্ষেত্রে যে ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো এখন বাস্তবায়ন না হলেও রাজনৈতিক পরিসরে ভবিষ্যতের জন্য থেকে যাবে। এসব পরিবর্তন বা অর্জনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
অবশ্য অপূর্ণতার দিকও কম নয়। অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতা শুরুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যোগ্য উপদেষ্টাদের পাশাপাশি কিছু অযোগ্য লোকও নানা বিবেচনায় সরকারে জায়গা করে নেন। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি ছিল সরকারে কিছু রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি। এসব কারণে উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিল বিভক্তি ও ভাগাভাগি। সরকারের বাইরের কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার মতো প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এসব কারণে অন্তর্বর্তী সরকার একটি শক্তিশালী সরকার হিসেবে কাজ করতে পারেনি, গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে যা ছিল সবচেয়ে দরকারি। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মবের দৌরাত্ম্য ছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রশাসনিক দুর্বলতাও স্বাভাবিক কারণে কাটিয়ে ওঠা যায়নি।
সরকারের নিষ্ক্রিয়তা বা অনেকের মতে সরকারের কোনো অংশের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে উগ্র ও ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো তখন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং সরকার তাদের ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, নারী, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা এবং সংবাদমাধ্যম এদের টার্গেটে পরিণত হয়। এমন অভিযোগও আছে যে ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়াতে সরকারের কেউ কেউ নির্বাচন ঠেকাতে বা পেছাতে তৎপর ছিল। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর নানা অযৌক্তিক চাপ দিয়ে গেছে, যা সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্মকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
এটা মানতে হবে যে জুলাই নিয়ে অনেকের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে তার মূল কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বিশৃঙ্খল ও অনিশ্চিত দশা এবং জুলাইয়ের চেতনাবিরোধী ডানপন্থী ধারার উত্থান। তবে শেষ পর্যন্ত একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করে তারা বিদায় নিতে পেরেছে—এই কৃতিত্ব অন্তর্বর্তী সরকারকে দিতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি এখন ক্ষমতায়। সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের জন-আকাঙ্ক্ষা বা ঐকমত্যে আসা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির অনাগ্রহ ও অনিচ্ছা কোনো লুকানো বিষয় নয়। অনেকে ধরেই নিয়েছেন যে বিএনপিকে দিয়ে আর সংস্কার হবে না।
তবে বাংলাদেশের গত দুই বছরের এই বাস্তবতাকে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে সরকার একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান আর গণ-অভ্যুত্থান একটি বিশেষ রাজনৈতিক মুহূর্ত। দুটি এক নয়। দুটির দায়ও এক নয়। স্বৈরতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদ থেকে গণতন্ত্রে যাওয়ার পথটি কখনো সরল হয় না। অস্থিরতা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বিভ্রান্তি ও হোঁচট খাওয়া—এসবের মধ্য দিয়েই এগোতে হয়। কিন্তু এ জন্য আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে থাকে বা ভুল করে থাকে সেই দায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নয়। আর বিএনপি যদি গণ-অভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে শেষ পর্যন্ত তুলে ধরতে না পারে, সেটাও এত প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া গণ-অভ্যুত্থানের উচ্চতাকে ম্লান করে না।
আজ যাঁদের কথাবার্তায় জুলাই নিয়ে হতাশার সুর শোনা যায় ‘তাঁদের মধ্যে ভাগ-বিভক্তি আছে। সবার হতাশার কারণ এক নয়। আবার অনেকে শুধু হতাশই নন’ বরং হতাশা ছড়াচ্ছেন। কারও হতাশার কারণ আশাভঙ্গ। কারণ, তাঁরা রাষ্ট্রব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আশা করেছিলেন; কিন্তু তার বাস্তবায়ন দেখছেন না। আবার জুলাই–পরবর্তী সমাজে ডানপন্থা ও উগ্রবাদী শক্তি বা নারীবিদ্বেষী শক্তির উত্থান অনেককে হতাশ করেছে।
পতিত আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক বা নেতা-কর্মীদের হতাশার কারণ ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। তবে আরেক অংশ আছেন যাঁদের হতাশার কারণ পুরোপুরি অর্থনৈতিক ও লুটপাটের সুবিধাকেন্দ্রিক। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে একটি শক্তিশালী সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। আসলে সরকার তার অবৈধ শাসন টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এমন একটি গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিল। সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি বা সংবাদমাধ্যম—সব ক্ষেত্রেই গড়ে উঠেছিল একটি ক্ষমতাঘনিষ্ঠ চক্র। সরকারকে সমর্থন জুগিয়ে যাওয়ার বিনিময়ে নানা আর্থিক সুবিধা বা দুর্নীতির সুযোগ তাদের জন্য নিশ্চিত ছিল। আওয়ামী লীগের পতন তাদের সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। নানা উসিলায় ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বা হতাশা ছড়াতে তারাই বেশি তৎপর। জুলাই নিয়ে নানা ধরনের হতাশাকে আলাদা করে না দেখলে বাস্তবতা অস্পষ্ট থেকে যাবে।
ইতিহাসের সব গণ-অভ্যুত্থানই হতাশার মধ্য দিয়ে গেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান মাত্র দুই বছরে পড়েছে। বলা যায় এক দীর্ঘ যাত্রার শুরুতে রয়েছে বাংলাদেশ। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক টমাস ক্যারোথার্স তাঁর আলোচিত ‘দ্য এন্ড অব ট্রানজিশন প্যারাডাইম’ প্রবন্ধে লিখেছেন স্বৈরশাসনের পর গণতন্ত্রের যাত্রাপথে একটি মধ্যবর্তী বা ‘গ্রে জোন’ থাকে। এই অবস্থায় নির্বাচন হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকে; মতপ্রকাশের কিছু স্বাধীনতা থাকে, কিন্তু আইনের শাসন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয় না; রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকে, কিন্তু রাষ্ট্রের সক্ষমতা সীমিত থাকে।
বাংলাদেশ এখন ঠিক এমনই একটি সময় পার করছে। এই সময়টি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। টমাস ক্যারোথার্স মনে করেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো মানুষ যখন খুব দ্রুত ফলাফল আশা করে, তখন তারা পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতিই আস্থা হারাতে শুরু করে।
গণ-অভ্যুত্থান থেকে দ্রুত কিছু আশা করে আমরা যেন গণতন্ত্রকেই ঝুঁকির মধ্যে না ফেলি।
এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব