মতামত

দুই জাতীয়তাবাদের বাইরে নতুন প্রজন্মের পরিচয়ের সন্ধান

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে দুটি বড় ভাগ করার চেষ্টা আমরা দেখতে পাই। একটি হলো ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের। এর মূল কথা—আমরা বাঙালি, কারণ আমাদের ভাষা বাংলা, আমাদের সংস্কৃতি হাজার বছরের, আমাদের ভূখণ্ড এই বদ্বীপ। ধর্ম এখানে ব্যক্তিগত বিষয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে এই চিন্তাকেই রাষ্ট্রের চার মূলনীতির একটি করা হয়েছিল।

দ্বিতীয়টি ইসলামি পরিচয়ভিত্তিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের। এর মূল কথা—আমরা শুধু বাঙালি নই, আমরা বাংলাদেশি। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির সঙ্গে আমাদের পার্থক্য আছে, এবং সেই পার্থক্যের বড় ভিত্তি হলো আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম। এ ধারাটি ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ক্রমে শক্তিশালী হয়েছে।

রাজনীতির মাঠে প্রথম সংজ্ঞাটি মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয়টি ১৯৭৫–এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে জড়িয়ে আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। গত ৫৫ বছর আমরা অনেকটা এই দুই মেরুতেই দেশকে বুঝেছি। কিন্তু বাংলাদেশ কি এখনো এই দুই মেরুতে দোদুল্যমান?

ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আজকের তরুণ প্রজন্ম, যারা জেন–জি এবং ইয়ংগার মিলেনিয়ালস—তাদের জীবন এই দুই মেরুর কোনোটিতেই পুরোপুরি আটকে নেই। তাদের জন্য এই পুরোনো বিতর্ক অনেকটাই ক্লান্তিকর ও দূরবর্তী মনে হয়। কীভাবে এই পরিবর্তন এল? এই পরিবর্তন এক দিনে হয়নি। এর পেছনে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। পরিবর্তন এসেছে ধাপে ধাপে।

বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি কোনো এক দিনে বা একক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক, ধর্ম ও রাজনীতির ভূমিকা এবং নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তি নিয়ে দেশটি এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। সেই যাত্রাকে মোটামুটি চারটি পর্যায়ে দেখা যেতে পারে।

প্রথম পর্যায়টি স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের সময়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া নতুন রাষ্ট্র তখন নিজেকে ভাষা, সংস্কৃতি এবং ভূখণ্ডভিত্তিক একটি নাগরিক জাতীয়তাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে রেখে রাষ্ট্রকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো দেওয়াই ছিল সেই সময়ের প্রধান লক্ষ্য।

ধর্মীয় সম্প্রীতির গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে দেয়ালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়।

দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রের আদর্শিক দিকনির্দেশনায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ সংযোজন এবং পরে প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়, ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিচয়ে ধর্মীয় উপাদান আরও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সময়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণাটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বৈধতা লাভ করে।

তৃতীয় পর্যায়টি ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়ে বাংলাদেশে একটি আপাতবিরোধী বাস্তবতা তৈরি হয়। একদিকে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল থাকে, অন্যদিকে ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাকে আবার সংবিধানের মৌলিক নীতির পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা হয়। ফলে রাষ্ট্র একই সময়ে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষও বলে, আবার রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের ধারক হিসেবেও পরিচয় দেয়। অনেক নাগরিকের কাছে এই দ্বৈত অবস্থান একটি জটিল এবং কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর বার্তা বহন করেছে।

চতুর্থ পর্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই আজকের তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার বিকাশ ঘটেছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম রাষ্ট্রের ঘোষিত আদর্শকে কেবল সাংবিধানিক ভাষার মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করেছে। তাদের একটি অংশের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা আর নিরপেক্ষ রাষ্ট্রনীতির প্রতিশব্দ হয়ে ওঠেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ক্ষমতার ভাষা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভিন্নমত দমনের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে তারা পুরোনো বিতর্ককে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছে।

এই দীর্ঘ পথচলার ফলেই আজকের বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পুরোনো দ্বন্দ্ব আর আগের মতো প্রভাবশালী নয়। তার জায়গায় আবির্ভূত হচ্ছে এক নতুন প্রজন্ম, যারা ইতিহাসের উত্তরাধিকারকে অস্বীকার না করেও নিজেদের পরিচয়কে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে।

এর ফল কী হলো? তরুণেরা ধর্মনিরপেক্ষতা ছেড়ে সরাসরি ধর্মের দিকে ফিরে যায়নি। বরং তারা একটি তৃতীয় পথ তৈরি করেছে। গবেষকেরা একে বলছেন ‘বাস্তববাদী সংকর পরিচয়’। এই পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য হলো: তারা প্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ; ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং দেশপ্রেমিক।

একই সঙ্গে তারা প্রকাশ্যে নিজের মুসলমান পরিচয় দিতে আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, হিজাব বা পাঞ্জাবি-টুপি, দৈনন্দিন কথায় ধর্মীয় শব্দের ব্যবহার, বা ধর্মভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ—এগুলো তাদের কাছে আধুনিকতার বিপরীত নয়, বরং আধুনিকতারই অংশ।

অনেক তরুণের কাছে এই ধর্মীয় প্রকাশ ছিল একধরনের পাল্টা সংস্কৃতি বা প্রতিবাদ। যে রাষ্ট্র নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করত, কিন্তু বাস্তবে কর্তৃত্ববাদী আচরণ করত, তার বিরুদ্ধে নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে জোরালোভাবে তুলে ধরা ছিল প্রতিবাদের একটি ভাষা।

তবে এই নতুন বা মিশ্র প্রজন্মকে একটিমাত্র রঙে আঁকা যাবে না। বাইরে থেকে তারা একই প্রজন্মের মানুষ বলে মনে হলেও, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের কল্পনা এক নয়। বরং একই সময়, একই প্রযুক্তি এবং একই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বেড়ে উঠেও তারা দুটি ভিন্ন পথের দিকে তাকিয়ে আছে।

একদল তরুণ এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়, যা একই সঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, আধুনিক এবং বহুত্ববাদী। অন্য দলটি মনে করে, দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ইসলামি মূল্যবোধের আরও সুস্পষ্ট ও প্রাধান্যপূর্ণ উপস্থিতি থাকা উচিত। উভয় পক্ষই পুরোনো রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে যেতে চায়, কিন্তু তারা যে গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়, তা এক নয়।

নগরকেন্দ্রিক বহুত্ববাদী ধারার প্রতিনিধিদের বেশি দেখা যায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, প্রযুক্তি খাত, স্টার্টআপ উদ্যোগ, শিল্প-সাহিত্যচর্চা এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। তারা বাংলাদেশের মুসলিম পরিচয়কে অস্বীকার করে না; বরং সেটিকে দেশের বাস্তবতা হিসেবেই গ্রহণ করে।

কিন্তু তাদের বিশ্বাস, সেই পরিচয়ের পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকতে হবে। একজন নারী কী পোশাক পরবেন, কী ধরনের পেশা বেছে নেবেন বা কীভাবে জীবন যাপন করবেন, তা রাষ্ট্র বা সমাজের চাপের বিষয় হওয়া উচিত নয়। তাদের কাছে ইসলাম মূলত নৈতিকতা, সহনশীলতা এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী প্রবণতা নতুন দৃশ্যমানতা লাভ করেছে। শহর ও মফস্‌সল শহরের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বহু তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সংগঠনের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের ধারণায় ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয় নয়; বরং জনজীবন, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক কাঠামো।

সে জন্য পোশাক, পাঠ্যপুস্তক, সাংস্কৃতিক উৎসব কিংবা জনপরিসরের বিভিন্ন প্রতীক নিয়ে বিতর্কে তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট। মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তু পর্যন্ত নানা প্রশ্নে তারা সরব। তাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে তার ইসলামি পরিচয় নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে।

আজকের বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং অনলাইন পরিসরের সবচেয়ে প্রাণবন্ত বিতর্কগুলো মূলত এই দুই ভবিষ্যৎ-চিন্তার সংঘাত থেকেই জন্ম নিচ্ছে।

কিন্তু এই বিতর্কের একটি নীরব দিকও আছে। যখন জাতীয় পরিচয়ের আলোচনাটি বারবার ‘আমরা কতটা বাঙালি’ কিংবা ‘আমরা কতটা মুসলমান’ এই প্রশ্নে ফিরে আসে, তখন এমন কিছু জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অভিজ্ঞতা এই দুই বৃত্তের কোনোটির মধ্যেই পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

সবচেয়ে আগে আসে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কথা। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ, সেই সঙ্গে বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান নাগরিকদের জন্য জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি কেবল তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং বাস্তব নিরাপত্তা ও সম–অধিকারের প্রশ্ন। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্তত নীতিগতভাবে ভাষা ও ভূখণ্ডকে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। তার যুক্তি ছিল, তুমি যে ধর্মেরই হও না কেন, তুমি এই দেশের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। কিন্তু যখন জাতীয় পরিচয় ক্রমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ে, তখন সেই নাগরিকের সমতার ভিত্তিটিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

জুলাইয়ের গ্রাফিতি

এই উদ্বেগের বাস্তব কারণ আছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রশাসনিক শূন্যতার সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রায়ই সহিংসতা, সম্পত্তি দখল বা ভয়ভীতির শিকার হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিদ্বেষ যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জমিজমার বিরোধ কিংবা ক্ষমতার লড়াইও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। ফলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নটি কেবল ধর্মীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারেরও প্রশ্ন।

এরপর আসে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রসঙ্গ, যাদের অভিজ্ঞতা এই বিতর্কের কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য জুম্ম জনগোষ্ঠী কিংবা সমতলের সাঁওতাল, ওরাঁও ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছে ‘তুমি আগে বাঙালি না মুসলমান?’ প্রশ্নটি অনেক সময় অর্থহীন শোনায়। কারণ তাদের পরিচয়ের মূল উপাদানই ভিন্ন।

তাদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও আলাদা। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভূমির অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং বাস্তুচ্যুতি থেকে সুরক্ষা তাদের জন্য জীবনযাত্রার মৌলিক প্রশ্ন। কিন্তু জাতীয় পরিচয় নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের তর্ক যখন রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে, তখন এসব দাবি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।

আজকের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে তাই অতীতের সরল পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা যাবে না। তারা একদিকে বিশ্বায়নের সন্তান, অন্যদিকে বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার উত্তরসূরি। তাদের অনেকেই একই সঙ্গে বাংলাদেশি, আধুনিক এবং মুসলমান হতে চায়; কিন্তু একটি পরিচয়ের বিনিময়ে অন্য পরিচয়কে বিসর্জন দিতে চায় না।

এ কারণেই ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের সামনে মূল প্রশ্নটি আর ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম রাষ্ট্রধর্মের পুরোনো বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই।

আসল প্রশ্নটি আরও গভীর। আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে বাঙালি ও বাংলাদেশি, মুসলমান ও অমুসলিম, পাহাড়ি ও সমতলের মানুষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু সবাই সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে নিজেদের দেখতে পারবেন? এমন একটি কাঠামো, যেখানে অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের সহনশীলতার ওপর নির্ভর করবে না; বরং সাংবিধানিক অধিকার, আইনের শাসন এবং নাগরিক সমতার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। সহনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা স্থায়ী নিরাপত্তা দেয় না।

আজ সহনশীল যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাল সে পরিবর্তিতও হতে পারে। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত অধিকার পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না।

বাংলাদেশের সামনে তাই আর নির্বাচন করার প্রশ্ন নয়; বরং ধারণ করার প্রশ্ন। এমন একটি জাতীয়তাবাদ কি গড়ে তোলা সম্ভব, যা বাঙালি, বাংলাদেশি, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং আদিবাসী সব পরিচয়কে একই রাষ্ট্রের ভেতরে মর্যাদা ও নিরাপত্তাসহ স্থান দিতে পারে?

সম্ভবত আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে হবে। নাগরিকত্ব কোনো বিশেষ ধর্ম বা সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করবে না, সংখ্যালঘুর অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠের দয়া বা সহনশীলতার ওপর নির্ভর করবে না, বরং সংবিধান ও আইনের শক্ত নিশ্চয়তা পাবে, এবং বাঙালি, বাংলাদেশি, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, চাকমা, সাঁওতাল—সবাই নিজ নিজ পরিচয় নিয়ে সমান মর্যাদায় বাংলাদেশি হিসেবে বাঁচতে পারবে?

যদি এই সাংবিধানিক নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে সংখ্যালঘুদের অধিকার আর অধিকার থাকবে না, তা হয়ে যাবে প্রতিদিন আলোচনা করে আদায় করার মতো একটি বিষয়। আর তখনই একটি দেশ তার সবচেয়ে বড় শক্তি—তার বৈচিত্র্যকে হারিয়ে ফেলে।

  • জিয়াউদ্দিন চৌধুরী সাবেক সরকারি এবং বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা।

মতামত লেখকের নিজস্ব