
ইরান যুদ্ধ ঘিরে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে যে তুচ্ছ বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়েছিল, সেটা দ্রুতই জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সম্পর্কচ্ছেদের দিকে গড়াচ্ছে। এটা সত্যিই বড় ধরনের তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।
জার্মানিতে এই আটলান্টিকের অপর পারের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জোট সরকারের ভেতরের সংকট আরও গভীর হচ্ছে। চ্যান্সেলর হিসেবে মের্ৎসের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বর্ষপূর্তির আগমুহূর্তে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন সেই রাজনৈতিক সংকটকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ঘটনা প্রমাণ করছে যে ইউরোপের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনার মের্ৎসের যে চেষ্টা ছিল, তা আসলে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে এটি ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
কিন্তু এই বিরোধের আরেকটি দিকও আছে। জার্মানির রক্ষণশীল নেতা মের্ৎস নির্বাচনে বিজয়ের রাতেই যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন, অর্থাৎ ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছায়া থেকে আরও স্বাধীন করা, সেই আকাঙ্ক্ষাকেও নতুন গতি দিচ্ছে।
এ উত্তেজনার সূচনা ঘটে গত সপ্তাহে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার অচলাবস্থা নিয়ে চ্যান্সেলরের মন্তব্য ঘিরে। একদল স্কুলশিক্ষার্থীর সামনে মের্ৎস বলেন, ‘ইরানিরা স্পষ্টতই আলোচনায় অত্যন্ত দক্ষ অথবা বলা ভালো, আলোচনাকে এড়িয়ে চলায় খুবই পারদর্শী। তারা মার্কিনদের ইসলামাবাদে গিয়ে আবার ফলাফল ছাড়াই ফিরে আসতে বাধ্য করছে।’
মের্ৎস আরও বলেন, ‘একটি পুরো জাতি ইরানের নেতৃত্বের দ্বারা অপমানিত হচ্ছে।’
সত্য উচ্চারণের জন্য মুহূর্তটি ছিল অপ্রত্যাশিত। পোপ লিওকে সরিয়ে মের্ৎস এখন মধ্যরাতে ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণের প্রিয় লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছেন।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘মের্ৎস আসলে কী নিয়ে বলছেন, তা জানেন না। তিনি “পুরোপুরি অকার্যকর”, একটি “ভাঙা দেশের” নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং সম্ভবত “মনে করেন ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ঠিক”।’
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত ইউরোপের নিরাপত্তা ভারসাম্যে বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি করছে। বিশেষ করে যখন রাশিয়া কালিনিনগ্রাদে পারমাণবিক সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে ইউরোপীয় রাজধানীগুলোকে হুমকির মুখে রেখেছে। ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলছে, কিন্তু তা কার্যকর হতে আরও ৬-৮ বছর লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, মের্ৎস নিজে কখনোই মনে করেন না ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা গ্রহণযোগ্য। মার্চে হোয়াইট হাউসে বৈঠকে তিনি ইরানের শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ট্রাম্পের যে যুদ্ধলক্ষ্য, তার সঙ্গেও সহমত পোষণ করেছিলেন।
মের্ৎস তখন এমনটাও ঘোষণা করেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে আমাদের অংশীদার ও মিত্রদের নসিহত করার সময় এটা নয়।’
জার্মানি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আকাশসীমা বন্ধ করেনি, এমনকি মার্কিন ঘাঁটির ব্যবহার সীমিত করার কথাও ভাবেনি। জার্মানির নীতি ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকা, সংঘাত-পরবর্তী সহায়তা দেওয়া।
তাহলে প্রশ্ন হলো, মের্ৎস হঠাৎ কেন ট্রাম্পের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায় (চুক্তিকারী হিসেবে ট্রাম্পের যে আত্মরতিময় ভাবমূর্তি) আঘাত করলেন?
এটা কি শুধু চ্যান্সেলরের অভ্যাসমতো না ভেবেচিন্তে বলে ফেলা একটা হঠাৎ মন্তব্য ছিল?
সম্ভবত এটা শুধু আবেগপ্রবণ মন্তব্য নয়, এখানে আরও কিছু রাজনৈতিক হিসাব আছে। কারণ, মের্ৎস এখনো পিছু হটেননি। রোববারের প্রাইমটাইম সাক্ষাৎকারেও তিনি তুলনামূলক নরম ভাষা ব্যবহার করলেও নিজের আগের মন্তব্য প্রত্যাহার করেননি।
এটি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সামনে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ আসছে। জার্মান ঘাঁটি থেকে ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই সংখ্যা আরও ‘অনেক বেশি’ও হতে পারে।
একই সঙ্গে জার্মানিতে টমাহকসহ মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধচুক্তির অংশ ছিল।
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত ইউরোপের নিরাপত্তা ভারসাম্যে বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি করছে। বিশেষ করে যখন রাশিয়া কালিনিনগ্রাদে পারমাণবিক সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে ইউরোপীয় রাজধানীগুলোকে হুমকির মুখে রেখেছে। ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলছে, কিন্তু তা কার্যকর হতে আরও ৬-৮ বছর লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি ট্রাম্প ইউরোপীয় গাড়িশিল্পের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, যা সরাসরি জার্মান অর্থনীতিকে আঘাত করবে।
মের্ৎসের মন্তব্য অবশ্যই কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত, কিন্তু তার জন্য এত কঠোর প্রতিক্রিয়া যে হবে, তা একেবারেই প্রত্যাশিত নয়। কারণ, বাস্তবতা হলো, জার্মানির সশস্ত্র বাহিনী পুনর্গঠনের বড় ধরনের উদ্যোগ তিনিই শুরু করেছেন। এ জন্য জার্মানির সাংবিধানিক ঋণসীমা শিথিল করেও অর্থায়নের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলরের এ সিদ্ধান্ত প্রতিরক্ষা খাতে ইউরোপের ব্যয় বাড়ানোর যে দাবি, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইউরোপে ইউক্রেনের সামরিক সহায়তার বড় অংশও এখন জার্মানিই বহন করছে। ন্যাটো সম্মেলনে জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যেও তিনি চাপ দিয়েছেন, যাতে ট্রাম্প ইউরোপের অবদান বাড়ছে বলে দাবি করতে পারেন।
এমনকি ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড আক্রমণের হুমকি দিয়েছিলেন, তখনো মের্ৎস শান্ত প্রতিক্রিয়ার পক্ষেই ছিলেন।
কিন্তু ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শেষ পর্যন্ত ইউরোপের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইউক্রেনের জন্য রাখা জরুরি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এই যুদ্ধ জার্মান অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস অর্ধেক কমে গেছে, যা ইতিমধ্যে টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা জোট সরকারকে আরও দুর্বল করছে।
কিন্তু এই সংকট নতুন পথ খুঁজে পেতেও সাহায্য করতে পারে। এক বছর ধরে মের্ৎস ছাড় ও আপসের মাধ্যমে ট্রাম্পকে সামলানোর চেষ্টা করেছেন। এই নীতির ব্যর্থতাই আসলে শিক্ষার্থীদের সামনে তাঁর হঠাৎ ক্ষোভ প্রকাশের মূল কারণ।
ট্রাম্পের ক্ষুব্ধ প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: এমন একটি মার্কিন প্রশাসনের ওপর নির্ভরতা টেকসই নয়, যা তার মিত্রদের শাস্তি দেয় অথচ ইউরোপের প্রতিপক্ষদের প্রতি সহনশীল আচরণ করে।
এক বছরের বেশি আগে, জার্মানির সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দলের বিজয়ের রাতে মের্ৎস বলেছিলেন, তিনি ইউরোপে দ্রুত ঐক্য গড়ে তুলতে চান, ‘যাতে ধাপে ধাপে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি।’
আজ সেই কথাগুলো আরও বেশি সত্য বলে মনে হচ্ছে।
জর্গ লাউ জার্মান সাপ্তাহিক ডি জাইটের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সংবাদদাতা
দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত