
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় প্রশ্ন তুলেছেন—‘যিশুখ্রিষ্ট হাতে বাইবেল নিয়ে চেঙ্গিস খানের তলোয়ারের সামনে কতক্ষণ টিকতেন?’ এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং চরম অবমাননাকর উক্তি শোনার পর সাধারণ মানুষের রক্ত গরম হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। যাঁর হাতে হাজারো ফিলিস্তিনি এবং ইরানি মা, বোন ও ভাইদের তাজা রক্ত লেগে আছে, তাঁর মুখে এ কেমন আলাপ? অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, খ্রিষ্টান বিশ্ব এর কোনো তীব্র প্রতিবাদ করল না এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর রথী-মহারথীরাও অদ্ভুত নীরবতা পালন করলেন। এই নীরবতার মানে কি এই যে—এখন এই রক্তপিপাসু ব্যক্তির অসভ্য আস্ফালনই আন্তর্জাতিক নিয়ম হিসেবে গণ্য হবে? তবে কি শত বছরের প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক আইন এবং যুদ্ধনীতির চিরস্থায়ী বিলুপ্তি ঘটল?
কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বীভৎসতা দেখে সম্রাট অশোক অনুতপ্ত হয়েছিলেন। পরে তিনি হিংসা বিসর্জন দিয়ে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন এবং বহু বছর মৌর্য সাম্রাজ্য ন্যায় ও নীতির ভিত্তিতে শাসন করেন। ইতিহাসে অশোক এমন একজন বিরল শাসক, যিনি একই সঙ্গে অহিংসা ও প্রতিরোধক্ষমতার মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য স্থাপন করেছিলেন।
দেশের মিলিটারি স্কুলগুলোয় আমরা ‘ল অব আর্মড কনফ্লিক্ট’ বা যুদ্ধের আইনকানুন সম্পর্কে পড়াশোনা করি এবং করাই। সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে আমরা সেই নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি ও কনভেনশনগুলোকে শ্রদ্ধা জানিয়েই সেগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুদ্ধ মানেই যে যা ইচ্ছে করা যাবে, সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। যুদ্ধের সব পক্ষই নির্দিষ্ট আইন মেনে চলবে, এটাই শত বছরের রীতি ছিল।
এখন নেতানিয়াহু এবং তাঁর সমর্থনপুষ্ট একটি গোষ্ঠী এসব নীতিকে পদদলিত করে যাচ্ছে। লক্ষণীয় যে ইসরায়েলের জনসাধারণের একটি বড় অংশ তাঁর এই নির্মমতাকে সমর্থন করছে, নয়তো এই লোক এখনো ক্ষমতায় থাকে কী করে?
যুদ্ধক্ষেত্রে নৈতিকতা অনুসরণের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। ক্রুসেড চলাকালে যখন ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ডের ঘোড়া আহত হয়, তখন তাঁর চরম শত্রু সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তাঁকে যুদ্ধের মাঠেই নিজের ঘোড়া দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। লোকগাথা অনুযায়ী, রিচার্ড অসুস্থ হলে সালাহুদ্দিন ছদ্মবেশে চিকিৎসক সেজে গিয়ে তাঁকে চিকিৎসা করেছিলেন। এই নৈতিকতা এবং সৌজন্য ছিল বীরত্বের শ্রেষ্ঠ লক্ষণ।
তখন তো কোনো লিখিত আন্তর্জাতিক আইন ছিল না কিংবা আধুনিক যুদ্ধবিধির কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। অথচ ধর্মপ্রাণ এই মহান বীরেরা শত্রুর সঙ্গেও শিষ্টাচার প্রদর্শন করেছিলেন।
মানুষ কালক্রমে এই শিক্ষাগুলোকে অবলম্বন করেই আন্তর্জাতিক মানবিক আইন প্রণয়ন করেছিল। এখন ২০২৬ সালে এসে আধুনিক সভ্যতার এই শাসকেরা সেসব আইনের তোয়াক্কা করছেন না। বরং নিজেদের মানবতাবিরোধী কার্যকলাপকে নানা খোঁড়া যুক্তি দিয়ে বৈধ করার নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
নিজের বিবেক যে তাঁকে মাঝেমধ্যে বিদ্ধ করছে, তা বোঝা যায় তাঁর ওই অসার যুক্তি থেকে। দেড় শতাধিক কোমলমতি স্কুলছাত্রীর নির্মম মৃত্যু ভুলে থাকা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে কে সম্ভব, যদি সে নিজে একাধারে পিশাচ না হয়?
গাজা, ইরান ও লেবাননের শিশু এবং নারীদের ওপর যেভাবে মুহুর্মুহু বোমাবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড চলছে, তাতে মন কেবলই প্রশ্ন জাগে—ওই সৈন্যরা এবং পাইলটরা রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমান কীভাবে? নিজের বিবেককে কে তাঁরা জলাঞ্জলি দিয়েছেন? নেতানিয়াহু দম্ভের সঙ্গে বলেছেন যে অশুভ শক্তিরই সর্বদা জয় হয়।
এই উক্তি কি আমাদের চিরন্তন বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত নয়? আবহমান কাল থেকে মানবজাতি বিশ্বাস করে আসছে যে অশুভ অসুর দমনে সৃষ্টিকর্তা মর্ত্যে তাঁর ত্রাণকর্তা পাঠান। মহিষাসুর বা রক্তবীজকে নিধন করতে মা দুর্গা ও কালী আবির্ভূত হয়েছিলেন। অত্যাচারী কংসের হাত থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে কৃষ্ণ এসেছেন। প্রতিটি যুগেই নীতি ও সত্যের জয় হয়েছে এবং অশুভ শক্তি ধূলিসাৎ হয়েছে। গৌতম বুদ্ধের অহিংসা ও মৈত্রী আজও মানুষের অন্তরে অমর, অথচ হিংস্র অঙ্গুলিমাল কিংবা দেবদত্তের ধ্বংসাত্মক কর্ম মানুষের নিকট ধিক্কৃত।
ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ এই মানুষটি নৈতিকতার পরিবর্তে অশুভের আবাহন করছেন। নেতানিয়াহুলেখক উইল ডুরান্টের বই লেসন্স অব হিস্ট্রির বরাত দিলেও এর প্রেক্ষাপটকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন স্কুলে পড়া শিশু কিংবা নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুতে পুলকিত হন কিংবা ইরানের অস্ত্রবিহীন ফ্রিগেটের ওপর অতর্কিত টর্পেডো মেরে ১০০ নাবিককে ডুবিয়ে মারার আদেশ দিয়ে আনন্দ পান, তখন তাঁদের মানবিক বলতে পারার আর কোনো ভাষা থাকে না। আমেরিকার মতো উন্নত দেশের এক বৃহৎ অংশ কীভাবে এই বর্বরতাকে সমর্থন করছে, তা বোধগম্য নয়। মার্কিন যুদ্ধমন্ত্রী পিটার হেগসেথরা যুদ্ধ থেকে নৈতিকতাকে পুরোপুরি নির্বাসিত করছেন।
তাঁদের মতে, মানবাধিকার কিংবা যুদ্ধের ‘রুল অব এনগেজমেন্ট’ পালন নাকি বিজয়ের অন্তরায়। তাদেরই প্ররোচনায় নৌবাহিনীর সৈন্যরা আজ আন্তর্জাতিক পানিসীমায় ইরানের ফ্রিগেট ডুবিয়ে দিয়ে সেখানে সাঁতার কাটতে থাকা নিরুপায় নাবিকদের উদ্ধার না করে ফেলে যাচ্ছে। অথচ নৌবাহিনীর সুদীর্ঘ ঐতিহ্য বলে তারা বিপন্ন অবস্থায় এমনটি করবে না।
আজ যুদ্ধের বিভীষিকা দিয়ে কি তারা হিটলারের সেই ৬০ লাখ ইহুদি হত্যার কলঙ্কিত ইতিহাসকেও জায়েজ করতে চায়? গাজায় লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে এবং সব চিকিৎসা ও খাদ্যের জোগান বন্ধ করে দিয়ে যে নারকীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তা কোনো মানবিক যুক্তি দ্বারা বিচার্য নয়। নুরেমবার্গ বিচারপ্রক্রিয়ার কথা নিশ্চয়ই তাঁরা ভুলে যাননি। সুদিন ফিরে এলে ইতিহাসের ট্রাইব্যুনালে ইরান ও গাজার স্কুলছাত্রীদের খুনের পেছনের আসল কারিগরেরা কখনোই ছাড় পাবেন না।
নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের রাষ্ট্রকে কোন পথে নিয়ে যাবেন? প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টার মতো শুধু সামরিক শৌর্যে-বীর্যে খ্যাতি এবং চিরস্থায়ী যুদ্ধবিগ্রহ নাকি এথেন্সের মতো, স্বাধীন, সংস্কৃতিমনা, জ্ঞান, বিজ্ঞানের চর্চার সমাজ এর দিকে? নাকি এই দুইয়ের সমন্বয়ের ভারসাম্যমূলক এক আধুনিক রাষ্ট্রের দিকে?
শুধু ঊর্ধ্বতনদের আদেশ মানা হচ্ছে বলে নিজের মানবিক দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করার সুযোগ আধুনিক আইনে নেই। ১৯৬৮ সালের ভিয়েতনামের মাই লাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচার দেরিতে হলেও হয়েছে এবং তাদের অপরাধ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই নৈতিকতাকে মানুষ আর্ন্তজাতিক আইন হিসেবে রূপ দেয়। নেদারল্যান্ডসের হ্যাগে আদালত স্থাপন করা হয়। এই আদালতের বিচারে অনেকে সাজা পেয়েছেন এবং কারাগারে আছেন। এসব আইনের ফলে গত ৭০ বছরের যুদ্ধ-বিগ্রহে কিছুটা স্বস্তি ছিল। এসব আইনের কমবেশি অনুসরণ করা হয়েছিল।
ইতিহাসের পাতায় রাষ্ট্র বা সমাজ টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতিকে একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখা হয়। শত্রুরাষ্ট্রের আক্রমণ থেকে সুরক্ষার জন্য একটি জনপদ বা দেশের সর্বদা প্রস্তুত থাকা আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে যেকোনো বাহ্যিক আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা মূলত নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব। বিশ্ব ইতিহাসে এই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং তার বিপরীতে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্রাট অশোকের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।
কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী বীভৎসতা দেখে সম্রাট অশোক অনুতপ্ত হয়েছিলেন। পরে তিনি হিংসা বিসর্জন দিয়ে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন এবং বহু বছর মৌর্য সাম্রাজ্য ন্যায় ও নীতির ভিত্তিতে শাসন করেন। ইতিহাসে অশোক এমন একজন বিরল শাসক, যিনি একই সঙ্গে অহিংসা ও প্রতিরোধক্ষমতার মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য স্থাপন করেছিলেন। তিনি কলিঙ্গ যুদ্ধের পর আক্রমণাত্মক রণনীতি পরিহার করেছিলেন ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বিসর্জন দেননি।
অশোক জানতেন শুধু নৈতিকতা দিয়ে একটি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। তাই আদর্শের পাশাপাশি ক্ষমতার উপস্থিতি যে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন।
নেতানিয়াহু ও ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের রাষ্ট্রকে কোন পথে নিয়ে যাবেন? প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টার মতো শুধু সামরিক শৌর্যে-বীর্যে খ্যাতি এবং চিরস্থায়ী যুদ্ধবিগ্রহ নাকি এথেন্সের মতো, স্বাধীন, সংস্কৃতিমনা, জ্ঞান, বিজ্ঞানের চর্চার সমাজ এর দিকে? নাকি এই দুইয়ের সমন্বয়ের ভারসাম্যমূলক এক আধুনিক রাষ্ট্রের দিকে?
তারা যিশুখ্রিষ্টের অহিংসার পথ ত্যাগ করে চেঙ্গিস খানের পথ অনুসরণ করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন, সেটা বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।
তুষার কান্তি চাকমা সাবেক সামরিক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার)
* মতামত লেখকের নিজস্ব