
শাহবাগ-ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকায় সাম্প্রতিক সংঘর্ষ আমাদের আবার সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—বাংলাদেশ কি নির্বাচনের আগে আবার উত্তেজনার রাজনীতিতে ঢুকে পড়ছে?
শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে মর্মান্তিক। তাঁর পরিবার আজও উত্তর খুঁজছে—কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল। তাঁদের বিচার চাওয়া স্বাভাবিক। নাগরিক সমাজ নিরপেক্ষ তদন্ত চাইবে—এটিও স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দাবি কি এমন পথে যাবে, যেখানে রাষ্ট্র, নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নতুন করে অস্থির হয়ে উঠবে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটি ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। সরকার বলছে, কোনো গুলি ছোড়া হয়নি। আন্দোলনকারীরা বলছেন, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হয়েছে। এই অবস্থানগত পার্থক্য দূর করার একমাত্র উপায় হলো দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। তদন্তের ফল যত পরিষ্কার হবে, সন্দেহ তত কমবে। সন্দেহ কমলে উত্তেজনাও কমবে। বিচার যদি দেরি হয় বা অস্পষ্ট থাকে, তাহলে গুজব জায়গা করে নেয়। আর গুজব যখন ছড়ায়, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
২.
হাদির জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—তিনি মূলধারার আলোচনায় আসতে চেয়েছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর ভাষা ও অবস্থানে পরিবর্তন এসেছিল। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকে। হাদির মৃত্যু আমাদের কষ্ট দেয়। কিন্তু তাঁর নাম যদি সংঘর্ষের স্লোগান হয়ে যায়, তাহলে সেটি তাঁর প্রতি সম্মান নয়। প্রকৃত সম্মান হলো সত্য জানা, বিচার নিশ্চিত করা এবং সমাজকে আরও দায়িত্বশীল পথে এগিয়ে নেওয়া।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় সমস্যা হলো মৃত্যুর পর মানুষকে দ্রুত প্রতীক বানানো হয়, কিন্তু জীবিত অবস্থায় তাঁকে বোঝার চেষ্টা কম থাকে। লাশের রাজনীতি সহজ; কিন্তু বিচার, সত্য উদ্ঘাটন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কঠিন। কঠিন কাজগুলো না করলে সমাজ বারবার একই জায়গায় ফিরে আসে—আবার ক্ষোভ, আবার সংঘর্ষ, আবার অনিশ্চয়তা।
শহীদ হাদির নাম উচ্চারণ করি সম্মানের সঙ্গে। তাঁর স্মৃতি যেন আমাদের দায়িত্বশীল করে, বিভক্ত নয়। নির্বাচন হোক, কিন্তু অস্থিরতার ছায়া ছাড়াই। গণতন্ত্রের পথ দীর্ঘ, কিন্তু সেটি ধৈর্য ও সংযমের পথ। ইতিহাস আমাদের বহুবার সতর্ক করেছে। এবার কি আমরা সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেব?
৩.
সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি বিষয় উঠে এসেছে। কেউ কেউ বলছেন, একটি ‘তৃতীয় পক্ষ’ পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে চাইছে, যাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ বক্তব্যের পেছনে আবেগ যেমন আছে, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতাও আছে। প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্ব আমাদের একটি বিষয় শেখায়—সংবেদনশীল সময়, বিশেষ করে নির্বাচন-পূর্ব সময়, বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর জন্য ‘কৌশলগত মুহূর্ত’ হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে একটি ধারণা আছে—‘পলিটিক্যাল অপরচুনিটি স্ট্রাকচার’। এ ধারণার মূল প্রবক্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন পিটার আইসিঞ্জার, সিডনি ট্যারো, ডেভিড এস মেয়ার ও ডগ ম্যাকঅ্যাডাম। তাঁদের মতে, যখন রাজনৈতিক পরিবেশ অনিশ্চিত থাকে, তখন কিছু গোষ্ঠী সুযোগ খোঁজে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য। নির্বাচন এমন একটি সময়, যখন রাষ্ট্রীয় মনোযোগ, গণমাধ্যমের ফোকাস ও জনমত—সব একসঙ্গে সক্রিয় থাকে। ফলে উত্তেজনা বা অস্থিরতা দ্রুত বড় রাজনৈতিক অর্থ পেয়ে যায়।
একইভাবে রাজনৈতিক যোগাযোগবিশেষজ্ঞ ম্যাক্সওয়েল মিক্কোম্বস ও ডোনাল্ড শ তাঁদের ‘এজেন্ডা-সেটিং’ তত্ত্বে বলেন, যে বিষয়টি জন–আলোচনার কেন্দ্রে আসে, সেটিই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি কোনো ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনার কেন্দ্রে থাকে, তাহলে সেটি নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করে। তাই অনেক সময় একটি মর্মান্তিক ঘটনাকে ঘিরে আবেগ বাড়িয়ে তোলা হয়, যাতে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে।
এই বিশ্লেষণ কাউকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়, বরং আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য—রাজনীতিতে শূন্যস্থান থাকে না। যেখানে আবেগ তীব্র, সেখানে কৌশলও সক্রিয় থাকে। এ বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সতর্কতা হলো শহীদ হাদির নাম যেন কোনো পক্ষের ক্ষমতার অঙ্কে পরিণত না হয়। বিচারপ্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে থাকে। কারণ, যখন একটি মৃত্যুকে কৌশলগত সম্পদে রূপ দেওয়া হয়, তখন সত্য আড়ালে পড়ে যায়।
৪.
নির্বাচনের আগে সমাজ সাধারণত বেশি সংবেদনশীল থাকে—এটি শুধু অভিজ্ঞতার বিষয় নয়, রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানেরও বিষয়। নির্বাচন মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রত্যাশা, আশঙ্কা ও আবেগের সমন্বয়। এ সময়ে মানুষ দলগত পরিচয়ে আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় ‘গ্রুপ পোলারাইজেশন’, অর্থাৎ মানুষ যখন নিজের মতের লোকদের মধ্যে থাকে, তখন তার অবস্থান আরও কঠোর হয়ে যায়। ফলে ছোট ঘটনাও বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া নির্বাচন-পূর্ব সময়ে অনিশ্চয়তা থাকে। কে জিতবে? কী পরিবর্তন আসবে? এই অনিশ্চয়তা মানুষকে বেশি সতর্ক ও কখনো কখনো বেশি উদ্বিগ্ন করে তোলে। সামাজিক তত্ত্বে বলা হয়, অনিশ্চয়তার সময়ে গুজব দ্রুত ছড়ায়। কারণ, মানুষ অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে চায়।
ডিজিটাল যুগে এ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়। একটি ভিডিওর আংশিক অংশ, একটি অসম্পূর্ণ বক্তব্য বা একটি আবেগঘন পোস্ট মুহূর্তে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে সংশোধন এলেও প্রথম প্রতিক্রিয়ার আবেগ থেকে যায়। যোগাযোগতত্ত্বে এটিকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ইমপ্রেশন ইফেক্ট’, প্রথম তথ্যই মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলে। এ কারণে নির্বাচন-পূর্ব সময় শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও উত্তেজনাপূর্ণ।
৫.
রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব হলো এ সময় আস্থা ধরে রাখা। স্বচ্ছতা শুধু একটি সুন্দর শব্দ নয়, এটি বিশ্বাস তৈরির ভিত্তি। তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত জানালে গুজব কমে। একটি সময়সীমা দিলে মানুষ অপেক্ষা করতে পারে। পরিষ্কার বার্তা দিলে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। এগুলো দুর্বলতা নয়, বরং দায়িত্বশীল শাসনের চিহ্ন।
রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। নির্বাচন সামনে রেখে উত্তেজনাকে কাজে লাগানোর প্রলোভন সব সময় থাকে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ডেকে আনা কারও জন্য ভালো নয়। একবার সহিংসতা বেড়ে গেলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ক্ষতি হয় জনগণের, রাষ্ট্রের এবং শেষ পর্যন্ত সব রাজনৈতিক পক্ষেরও।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় প্রতিপক্ষকে একেবারে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু গণতন্ত্র টিকে থাকে সহাবস্থানে। মতভেদ থাকবে, সমালোচনা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সহিংসতা বা অমানবিক ভাষা ঢুকে পড়লে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। হাদির স্মৃতি যদি আমাদের কিছু শেখায়, তবে সেটি হলো সংলাপের পথ বন্ধ হলে সংঘর্ষের পথ খুলে যায়।
তরুণ প্রজন্ম দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়, দ্রুত সংগঠিত হয়—এটি তাদের শক্তি। কিন্তু ভুল তথ্য বা উসকানিমূলক ভাষা তাদের সহজেই ভুল পথে নিতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবার দায়িত্ব তরুণদের সামনে তথ্যভিত্তিক ও সংযত আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা।
গণমাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম বা অসম্পূর্ণ তথ্য কখনো পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। আবার পরিষ্কার তথ্য, প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা মানুষের মধ্যে স্থিরতা আনে। এ ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
৬.
বর্তমান পরিস্থিতি তিন দিকে যেতে পারে। এক. তদন্ত দ্রুত ও স্বচ্ছ হলে উত্তেজনা কমবে এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া শক্ত হবে। দুই. তদন্তে দেরি বা অস্পষ্টতা থাকলে সন্দেহ ও বিভাজন বাড়তে পারে। তিন. যদি সংঘর্ষ বাড়ে, তাহলে নির্বাচন নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। আমাদের কাম্য প্রথম পথটি। কারণ, সেটি স্থিতিশীলতা, আস্থা ও গণতন্ত্রকে শক্ত করে।
আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাইতে পারি না, যেখানে বিচার হবে, কিন্তু প্রতিশোধের আগুন জ্বলবে না? আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাইতে পারি না, যেখানে শহীদের নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে, কিন্তু সংঘর্ষের স্লোগান হবে না? শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্ন আমাদের তুলতে হবে।
শহীদ হাদির নাম উচ্চারণ করি সম্মানের সঙ্গে। তাঁর স্মৃতি যেন আমাদের দায়িত্বশীল করে, বিভক্ত নয়। নির্বাচন হোক, কিন্তু অস্থিরতার ছায়া ছাড়াই। গণতন্ত্রের পথ দীর্ঘ, কিন্তু সেটি ধৈর্য ও সংযমের পথ। ইতিহাস আমাদের বহুবার সতর্ক করেছে। এবার কি আমরা সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেব?
মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব