মতামত বা ব্যাখ্যা পড়েই শত শত মানুষের ‘সংবাদপাঠ’ শেষ হয়ে যায়। মূল খবর কী ছিল, প্রেক্ষাপট কী, তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, এসব জানার আগ্রহ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
মতামত বা ব্যাখ্যা পড়েই শত শত মানুষের ‘সংবাদপাঠ’ শেষ হয়ে যায়। মূল খবর কী ছিল, প্রেক্ষাপট কী, তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, এসব জানার আগ্রহ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

মতামত

ফেসবুকে সংবাদপত্রের খণ্ডিত অংশ পাঠ কেন ভয়ের

সংবাদপত্র পাঠ একটি দায়িত্বশীল নাগরিক অভ্যাস। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই অভ্যাস ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্তমানে সংবাদপত্র পাঠের ধরন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউব অনেকের কাছে সংবাদপত্রের বিকল্প হয়ে উঠেছে।

আর এরই ধারাবাহিকতায় একটি বিপজ্জনক অভ্যাস নীরবে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। আর তা হচ্ছে, সংবাদপত্র না পড়েই সংবাদপত্রের বিচার। সমাজে গড়ে উঠেছে অন্যের লেখা বা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংবাদপত্র পাঠের এক নতুন সংস্কৃতি।

বর্তমানে আমরা প্রায়ই দেখি যে কোনো একজন ব্যক্তি কোনো একটি সংবাদকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট বা শেয়ার করেন। তিনি নিজের মতামত বা পছন্দ অনুযায়ী একটি সংবাদ/প্রতিবেদনের একটি অংশ নিয়ে নিজের মতামত বা ব্যাখ্যা লেখেন।

সেই মতামত বা ব্যাখ্যা পড়েই শত শত মানুষের ‘সংবাদপাঠ’ শেষ হয়ে যায়। মূল খবর কী ছিল, প্রেক্ষাপট কী, তথ্যের উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, এসব জানার আগ্রহ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

এই প্রবণতা নিছক অসতর্কতা নয়, এটি বুদ্ধিবৃত্তিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার একধরনের সামাজিক চর্চা। পুরো সংবাদ পড়া, তথ্য যাচাই করা ও নিজস্ব বিশ্লেষণ গড়ে তোলার বদলে অন্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকেই অনেকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

এতে করে সংবাদ পাঠ নয়, বরং মতামত গ্রহণের একটি সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। পাঠকের জন্য এই অভ্যাসের একটি উপকারী দিক হলো, পাঠকের সময় বাঁচে। স্বল্প সময়ে সংক্ষেপে তিনি প্রায় অনেক প্রতিবেদন বা খবরাখবর সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যান।

অতএব এই নতুন ‘পাঠ-সংস্কৃতি’কে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ নেই, আবার অন্ধভাবে গ্রহণ করাও সমীচীন নয়।

এই প্রবণতা সংবাদমাধ্যমের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি সমাজের জন্যও বিপজ্জনক। কারণ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর পেশাদার সম্পাদনা, তথ্য যাচাই, দায়িত্বশীল উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে আসে।

সেখানে ফেসবুকের ব্যক্তিগত লেখায় থাকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান, আবেগের প্রভাব এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থাকে ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য। ফলাফল হিসেবে খবর বিকৃত হয়, আংশিক তথ্য ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংস্কৃতি ভুল ও গুজব ছড়ানোর পথকে আরও সহজ করে দিয়েছে। বিভ্রান্তিমূলক এবং যাচাইহীন তথ্য মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

অথচ পাঠক হিসেবে আমরা প্রশ্ন করছি না, এই তথ্যের উৎস কী, এটি আদৌ সত্য কি না। দায়িত্বশীল পাঠক মনোভাবের এই অভাব গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় দেখা গেছে, একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খবর সংবাদপত্রে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে, ফেসবুকে তা সেভাবে পৌঁছায়নি। কেউ অংশবিশেষ তুলে ধরেছে, কেউ নিজের রাজনৈতিক অবস্থান জুড়ে দিয়েছে, কেউ আবার পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন অর্থে উপস্থাপন করেছে।

অথচ সেই বিকৃত উপস্থাপনই বহু মানুষের কাছে ‘চূড়ান্ত সত্য’ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এই প্রবণতা নিছক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, এটি একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা।

পুরো খবর পড়ার ধৈর্য নেই, উৎস যাচাইয়ের আগ্রহ নেই, আছে শুধু অন্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বস্তি। এর ফলে পাঠক নিজে ভাবছে না, ভাবতে দিচ্ছে অন্যকে।

উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, প্রথম আলোর কোনো একটি সংবাদ বা শিরোনাম নিয়ে কেউ ফেসবুকে নিজের মতামত লিখছেন। সেই লেখায় সংবাদের অংশবিশেষ তুলে ধরা হচ্ছে, প্রেক্ষাপট বাদ যাচ্ছে, কখনো শিরোনামকেই পুরো সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

এরপর সেই পোস্ট ঘিরে শুরু হচ্ছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া-লাইক, শেয়ার, মন্তব্য এবং সেখানেই বহু মানুষের কাছে প্রথম আলো ‘দোষী’ বা ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে।

অথচ সমালোচনাকারীদের বড় একটি অংশ আদৌ মূল সংবাদটি পড়েননি। এখানে আমরা দেখি, সংবাদপত্রের পেশাদার শ্রম বিচার হচ্ছে এমন পাঠকের হাতে, যাঁরা আদৌ জানেন না পুরো সংবাদে কী বলা হয়েছে।

এই প্রবণতাকে তথ্যচর্চার জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করলেও ভুল হবে না। প্রথম আলো হোক বা অন্য কোনো পত্রিকা-ভুল হলে সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে, হওয়াই উচিত।

কিন্তু সেই সমালোচনার ন্যূনতম শর্ত হলো সম্পূর্ণ সংবাদ পাঠ, তার প্রেক্ষাপট বোঝা এবং তথ্য ও মতামতের মধ্যকার সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করা।

এই মৌলিক শর্তগুলো উপেক্ষা করে যে সমালোচনা করা হয়, তা সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং পাঠকের বিশ্লেষণী সক্ষমতা ও দায়িত্ববোধের অভাবকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং শেষ পর্যন্ত পাঠককেই আত্মসমালোচনার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

যে সমাজে মানুষ শুধু অন্যের লেখা পড়েই মত গঠন করে, সে সমাজে সত্য দুর্বল হয়, গুজব শক্তিশালী হয়। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

ফেসবুকে অন্যের লেখা পড়ে সংবাদপত্রকে বিচার করার এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে শুধু সংবাদমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের তথ্যভিত্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা। সংবাদ এবং মতামতের পার্থক্য কী, তা জানা পাঠক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। সংবাদপত্র পাঠের দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে সচেতন নাগরিক হওয়ার দাবি করা যায় না। এই সত্য যত দ্রুত আমরা বুঝব, ততই মঙ্গল।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন সম্পাদকীয় নীতিমালা, তথ্য যাচাই এবং পেশাদার দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। সেখানে ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ থাকে, জবাবদিহি থাকে। কিন্তু ফেসবুকের লেখায় সেই দায় নেই।

ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা আবেগ সেখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। সেই লেখাকেই যদি সংবাদপত্রের বিকল্প হিসেবে ধরা হয়, তাহলে সত্য ও গুজবের পার্থক্য মুছে যেতে বাধ্য।

ফেসবুকে অন্যের লেখা পড়ে সংবাদপত্রকে বিচার করার এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে শুধু সংবাদমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের তথ্যভিত্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা।

সংবাদ এবং মতামতের পার্থক্য কী, তা জানা পাঠক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। সংবাদপত্র পাঠের দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে সচেতন নাগরিক হওয়ার দাবি করা যায় না। এই সত্য যত দ্রুত আমরা বুঝব, ততই মঙ্গল।

  • সাদিয়া শারমীন ঠাকুর, নিউজ আর্কিভিস্ট, প্রথম আলো আর্কাইভ