
বিশ্বায়নবিরোধী প্রবণতার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বিশ্বের তথাকথিত ‘মধ্যম শক্তিগুলোকে’ পুনর্বিবেচনাবাদী শক্তিগুলোর মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণ করতে আহ্বান জানান।
তাঁর তালিকায় এখন শুধু চীন ও রাশিয়াই নয়, যুক্তরাষ্ট্রও যুক্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের এই যুগে কার্নির ধারণা, মধ্যম শক্তিগুলোর একজোট হয়ে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মধ্যম শক্তি হিসেবে ভারত কি তার পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে? পারলে তা নিঃসন্দেহে ভারতের জন্য লাভজনকই হবে; কারণ কার্নি যে পথের কথা বলছেন, তার সঙ্গে ভারতের স্বার্থ গভীরভাবে যুক্ত।
গত তিন দশকে ভারতের অর্থনৈতিক সাফল্য এসেছে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই। পশ্চিমা প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও বাজারের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সেবা রপ্তানির বিস্ময়কর সাফল্য তারই প্রমাণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি বাণিজ্যনীতি সেই বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলোকেই লক্ষ্য করে আঘাত হানে এবং ভারতের জন্য তা ছিল বড় ধরনের ধাক্কা।
ট্রাম্প সম্প্রতি যে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে বলা হচ্ছে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ৫০ শতাংশ থেকে (যা তাঁর প্রশাসনের আরোপিত সর্বোচ্চ শুল্কগুলোর একটি) কমে ১৮ শতাংশে নামবে। এর বিনিময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করবে এবং বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমাবে। কিন্তু এই চুক্তি নিয়ে এখনো বহু প্রশ্নের উত্তর অজানা। নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-রেষারেষি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার সম্মিলিত জিডিপি-সমৃদ্ধ ওইসিডি (উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংস্থা) দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার মধ্যে ভারতের জন্য বিপুল সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতেও সহায়ক হতে পারে। যুক্তির বিচারে, ভারতের উচিত এখানেই তার কূটনৈতিক মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা; অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সংযোগ গড়ে তোলা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ভারতের নতুন মুক্তবাণিজ্য চুক্তিগুলো এই দিকেই অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দ্রুত বদলায় না। আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই আশা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একঘরে হয়ে পড়া ও চীনের সম্প্রসারণবাদ মোকাবিলায় ভারত মধ্যম শক্তিগুলোর একটি জোটে সক্রিয় ভূমিকা নেবে; কিন্তু বাস্তবে এমন পরিবর্তন হলে তা হবে অত্যন্ত ধীরগতির। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার জবাবে ভারতীয় সরকার সম্ভবত দূরত্ব বজায় রাখা ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার এক মিশ্র পথই অনুসরণ করবে।
কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিক মহলের প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেকেই কার্নির আহ্বানকে ভারতের ঐতিহ্যবাহী জোটনিরপেক্ষ নীতির স্বীকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। কেউ কেউ আবার ‘মধ্যম শক্তি’ ধারণাকে হাতিয়ার করে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সেই ভাবনায় ফিরে যেতে চাইছেন, যেখানে ভারত নিজেকে বৈশ্বিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে বৃহৎ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকার কথা বলেছিল।
এই চিন্তাধারার উৎস কোথায়? এর পেছনে রয়েছে গভীর উপনিবেশবিরোধী ও পাশ্চাত্যবিরোধী মনোভাব। বাস্তবে যদিও ভারত বহু বছর নিজেকে জোটনিরপেক্ষ বলেছে, কার্যত তার ঝোঁক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী ও মনমোহন সিং এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশবন্ত সিং ও যশবন্ত সিনহা বহু বছর ধরে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তাকাঠামোকে সোভিয়েত-পরবর্তী বাস্তবতা বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন, একবিংশ শতাব্দীতে ভারতের স্বাভাবিক অংশীদার হচ্ছে পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু মূলধারার চিন্তায় তাঁদের প্রভাব ছিল সীমিত। ট্রাম্পের আচরণ বরং সংশয়বাদীদের সেই ধারণাকেই শক্ত করেছে, যেখানে মনে করা হয় পশ্চিমা বিশ্ব অবিশ্বস্ত আর ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ই ভারতের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কীভাবে কাজ করবে, তা বোঝার জন্য রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথম এবং সবচেয়ে প্রাথমিক স্তরে রাষ্ট্র কেবল কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের চর্চা করে এবং কোনো গভীর চুক্তিতে যায় না। এখানে নীতিনির্ধারকেরা নৈতিক উচ্চাসন থেকে বক্তৃতা দেন; কিন্তু মিত্রদের সঙ্গে বাস্তব অংশীদারি গড়তে যে আপস দরকার, তা এড়িয়ে যান। এটি অনেকটা এমন এক বিচারকের মতো, যিনি ভাষণ দেন কিন্তু কার্যকর রায় দিতে অস্বীকৃতি জানান।
দ্বিতীয় স্তরটি হলো ট্রাম্প-ধাঁচের লেনদেনভিত্তিক আচরণ, যেখানে সম্পর্ক সংবাদ চক্রের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণ ও শীতল হয়। তৃতীয় এবং সবচেয়ে উন্নত স্তরটি হলো মূল্যবোধভিত্তিক জোট গঠন—যার জন্য অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সংযোগ প্রয়োজন। এই স্তরে সরকারগুলো মেনে নেয় যে অংশীদারদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে অভ্যন্তরীণ নীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুফল সার্বভৌমত্বের কিছু ছাড়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু জোট গঠনের জন্য প্রয়োজন জটিল রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা; প্রয়োজন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের অন্যান্য শাখার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। ‘উলফ ওয়ারিয়র’ কূটনীতি সহজ; কিন্তু দেশের ভেতরে জনসমক্ষে প্রয়োজনীয় আপসের ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের চর্চার ফলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের মধ্যেই দোলাচলে থাকে। বিদেশি অংশীদারদের স্বার্থে অভ্যন্তরীণ নীতি বদলাতে কর্তৃপক্ষ অনীহা প্রকাশ করে। এটি ভারতীয় রাষ্ট্রের সামগ্রিক অ-কৌশলগত আচরণের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। ফল হিসেবে ভারত প্রায়ই একঘরে হয়ে পড়ে, আর যখন তার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে (যেমন চীনের সীমান্ত অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে), তখন তাকে একাই লড়তে হয়।
রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দ্রুত বদলায় না। আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই আশা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একঘরে হয়ে পড়া ও চীনের সম্প্রসারণবাদ মোকাবিলায় ভারত মধ্যম শক্তিগুলোর একটি জোটে সক্রিয় ভূমিকা নেবে; কিন্তু বাস্তবে এমন পরিবর্তন হলে তা হবে অত্যন্ত ধীরগতির। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার জবাবে ভারতীয় সরকার সম্ভবত দূরত্ব বজায় রাখা ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার এক মিশ্র পথই অনুসরণ করবে।
অজয় শাহ মুম্বাইভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা এক্সকেডিআর ফোরামের সহপ্রতিষ্ঠাতা
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ