
১৯৭১ সালের বিচারগুলোর মতো, ট্রাইব্যুনালের সামনে আসা বর্তমান অভিযোগগুলোর কয়েকটি অবশ্যই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন প্রমাণ যতখানি শক্ত বলে দাবি করছে, বাস্তবে প্রমাণগুলো তার থেকে অনেক দুর্বল। সেই সঙ্গে প্রায়ই আইনের ভুল প্রয়োগ ঘটছে। আর অভিযুক্তদের সম্পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার না দিলে, এই বিচারপ্রক্রিয়া সর্বদা একটি অন্যায্য বিচারের বৈধ প্রশ্নের মুখোমুখি থাকবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে লিখেছেন ডেভিড বার্গম্যান।
যে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের বিচার কোনো দিন হয়নি, তাঁদের জন্য লিখিত সংবিধানের ৪৭ (৩) ও ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৌলিক সুরক্ষা কেড়ে নিচ্ছে।
লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানির বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ১৯ মাস পর ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশের নতুন সংসদ ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন’ পাস করে। এর তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল ভারতে আটক ১৯৫ জন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাকে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা।
এর ঠিক পাঁচ দিন আগে সংসদ সংবিধানের প্রথম সংশোধনী পাস করে সংবিধানে দুটি নতুন অনুচ্ছেদ যুক্ত করে। এর একটি হলো ৪৭ (৩) এবং অপরটি হলো ৪৭ (ক)। এই অনুচ্ছেদগুলো মূলত তিনটি কাজ করে:
১. এটি সংশ্লিষ্ট আইনটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা থেকে সুরক্ষা দেয়।
২. এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার (অনুচ্ছেদ ৩১), ভূতাপেক্ষ দণ্ডবিধির বিরুদ্ধে সুরক্ষা [অনুচ্ছেদ ৩৫ (১)], ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার [অনুচ্ছেদ ৩৫ (৩)] এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার অধিকার (অনুচ্ছেদ ৪৪)।
৩. এটি ওই আইনের অধীনে অভিযুক্তদের কোনো ধরনের সাংবিধানিক প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
তবে শেষ পর্যন্ত সেই ১৯৫ জন অফিসারের কারও বিচার হয়নি। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে (এবং পাকিস্তানে আটকে থাকা বাঙালিদের ফেরত পাঠাতে পাকিস্তান সম্মত হওয়ার পর) সেই সামরিক কর্মকর্তাদের বিচার না করে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।
সাধারণ বা স্বাভাবিক সময়ে সংবিধানের মৌলিক অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করার বিষয়টিকে সমর্থন করা কঠিন। তবে ১৯৭৩ সালে অন্তত একটি যুক্তি ছিল—অভিযুক্তরা ছিলেন বিদেশি সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা, বাংলাদেশি নাগরিক নন; অপরাধের ঘটনাগুলো ঘটেছিল মাত্র কয়েক মাস আগে; আর যে রাষ্ট্র বিচার করছিল, সেটির বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর এবং তার প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল ভঙ্গুর।
প্রায় চার দশক ধরে এই আইন এবং সেই সঙ্গে প্রথম সংশোধনীটি কার্যত নিষ্ক্রিয় পড়ে ছিল অব্যবহৃত অবস্থায়, কেবল একটি আইনি দলিল হিসেবে।
২০১০ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। নতুন নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার আইনটি সংশোধন করে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ ‘ব্যক্তিদের’ ওপর তা প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে।
সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তগুলোকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, যার মধ্যে রয়েছে বেআইনিভাবে জামিন নাকচ, অভিযোগ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত এবং কোনো উপযুক্ত আইনি ভিত্তি ছাড়াই চার্জ গঠন করা।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত বাংলাদেশিদের, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা—তাঁদের বিচারের জন্য একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
সেই মুহূর্তে প্রথম সংশোধনী ও অধিকারহরণের পক্ষে প্রাথমিকভাবে যে যৌক্তিকতা ছিল, তা আর টিকে ছিল না। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আর বিদেশি সেনা ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিক, যাঁদের সুরক্ষার জন্যই সংবিধান বিদ্যমান এবং সংবিধানের নিশ্চয়তা পাওয়ার দাবি যাঁদের সবচেয়ে বেশি। তবে সে সময় বিচারাধীন অপরাধ ১৯৭১–সংশ্লিষ্ট হওয়ায়, সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার পক্ষে একধরনের নৈতিক বৈধতার অজুহাত তৈরি করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধের গুরুত্ব ও গাম্ভীর্যের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কম নয়, বরং আরও বেশি অধিকার পাওয়া উচিত ছিল। তা ছাড়া অপরাধের ঘটনাগুলোও তখন কয়েক মাসের পুরোনো ছিল না। বরং ঘটনাগুলো প্রায় ৪০ বছর আগের ছিল; আর রাষ্ট্রও তখন আর নতুন বা ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল না।
যুদ্ধাপরাধের বিচারগুলো ছিল গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ ও চরম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এতে আসামিদের মৌলিক ন্যায়বিচারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। বিচারপ্রক্রিয়ার এই অস্বচ্ছতার পেছনে অনেক কারণ থাকলেও অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সংবিধানের প্রথম সংশোধনী এবং ৪৭ (৩) ও ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ।
তাই জামায়াতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক যখন হাইকোর্টে প্রথম সংশোধনীর এই অনুচ্ছেদগুলোর সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলেন, তখন অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। তবে আদালত তাঁদের পক্ষে রায় দেবেন না বুঝতে পেরে তিনি শেষ পর্যন্ত রিটটি প্রত্যাহার করে নেন।
সেই বিধানগুলো কিন্তু এখনো দূর হয়ে যায়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন তার তৃতীয় সংস্করণে বা নতুন রূপান্তরে প্রবেশ করেছে।
১৯৭৩ সালে এটি তৈরি করা হয়েছিল পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের জন্য (যাঁদের বিচার কখনোই হয়নি)। ২০১০ সালে এটি পুনরুজ্জীবিত করা হয় ১৯৭১ সালের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত বাংলাদেশিদের বিচারের জন্য। এখন এটি ব্যবহার করা হচ্ছে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করতে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলনকারীদের হত্যা এবং তার আগের ১৫ বছরে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিচারে এই আইন ব্যবহার করা হচ্ছে।
এখানে আসামিদের পরিচয় বদলেছে, কিন্তু তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারহীন অবস্থান একই রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্তদের অধিকার সংবিধানের ৪৭ (৩) ও ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ দিয়ে সীমিত রাখার পেছনে এখন আর কোনো আইনি বা নৈতিক যুক্তি অবশিষ্ট নেই। অভিযুক্তরা বাংলাদেশি নাগরিক, সেই সঙ্গে আইনের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধে তাঁরা অভিযুক্ত, যে বিচারে মৃত্যুদণ্ডের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে এবং তাঁরা ১৯৭১ সালের যুদ্ধের কোনো অপরাধের জন্য অভিযুক্ত নন, যে যুদ্ধ–সংক্রান্ত প্রেক্ষাপট আগে এই সংশোধনীগুলোর ওপর একধরনের ‘নৈতিক’ সুরক্ষা দিত।
তবু তাঁরা এমন কিছু অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা অন্য যেকোনো ফৌজদারি মামলার অভিযুক্ত নাগরিক স্বাভাবিকভাবেই পেয়ে থাকেন—যেমন আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার।
সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তগুলোকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, যার মধ্যে রয়েছে বেআইনিভাবে জামিন নাকচ, অভিযোগ আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত এবং কোনো উপযুক্ত আইনি ভিত্তি ছাড়াই চার্জ গঠন করা।
এর ফলে এমন এক আদালত তৈরি হয়েছে, যা কারও কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। তদন্তকারী, প্রসিকিউটর ও বিচারক—সবাই জানেন যে দণ্ডাদেশ দেওয়ার আগে তাঁরা যা-ই করুন না কেন, অন্য কোনো আদালত তা পর্যালোচনা করতে পারবেন না। যখন দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ তৈরি হয়, তত দিনে অভিযুক্ত ব্যক্তি হয়তো বছরের পর বছর আটক থাকেন এবং আগের ভুলের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
এর পরিণতি ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব বিধির দৃশ্যত লঙ্ঘন করে অনেক অভিযুক্তকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হয়েছে। কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন এবং অভিযোগ গঠন করেছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধের মৌলিক ধারণাকে ভুলভাবে বোঝারই বহিঃপ্রকাশ।
বিশেষ করে টিভি নির্বাহী মোজাম্মেল বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উল্লেখযোগ্য। তবে এর বাইরে আরও অনেকেই রয়েছেন। অন্য যেকোনো ফৌজদারি আদালতে এই সিদ্ধান্তগুলোকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যেত এবং বাতিল করা সম্ভব হতো। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এগুলোকে মোটেই চ্যালেঞ্জ করা যায় না।
সংবিধানের ৪৭ (৩) ও ৪৭ (ক) অনুচ্ছেদ বাতিল করলেই যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়ে যাবে, তা নয়। কারণ, বিচারপ্রক্রিয়ার রাজনৈতিকীকরণ অত্যন্ত গভীর। তবে এটি একটি অন্যতম বড় কাঠামোগত বাধা দূর করবে।
সংবিধান সংশোধন করার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপি সরকারের রয়েছে এবং তারা চাইলে আগামীকালই তা করতে পারে। তবে এমন সময়ে তারা তা করবে বলে মনে হয় না, যখন ট্রাইব্যুনাল তাদের রাজনৈতিক বিরোধীদের বিচার করছেন এবং এমন কোনো পদক্ষেপকে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্য পথটি হলো আদালতের মাধ্যমে যাওয়া: এই দুটি অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী—এই যুক্তিতে রিট আবেদন করা। যুক্তির দিক থেকে এ আবেদনের সফল হওয়ার জোর সম্ভাবনা থাকা উচিত।
১৯৭১ সালের বিচারগুলোর মতো, ট্রাইব্যুনালের সামনে আসা বর্তমান অভিযোগগুলোর কয়েকটি অবশ্যই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আগের ১৫ বছর ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম সংঘটিত হয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন প্রমাণ যতখানি শক্ত বলে দাবি করছে, বাস্তবে প্রমাণগুলো তার থেকে অনেক দুর্বল। সেই সঙ্গে প্রায়ই আইনের ভুল প্রয়োগ ঘটছে। আর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার না দিলে এই বিচারপ্রক্রিয়া সর্বদা একটি অন্যায্য বিচারের বৈধ প্রশ্নের মুখোমুখি থাকবে।
যেকোনো উপযুক্ত ভিত্তি ছাড়া দায়ের করা মামলাগুলো আরও বেশি ক্ষতিকর। এগুলো অভিযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য যেমন চরম অন্যায়, তেমনি বৈধ মামলাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকেও নষ্ট করে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ১৯৭১ সালের বিচারের মতো বিতর্কিত করে তোলে এবং প্রতিটি রায়কে রাজনৈতিক হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া সহজ করে দেয়।
ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীনদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কোনো ছাড় নয়; বরং এই সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগই একমাত্র উপায়, যা ট্রাইব্যুনালের রায়গুলোকে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টিকিয়ে রাখবে।
ডেভিড বার্গম্যান সাংবাদিক
ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david.bergman.77377
ইংরেজি থেকে অনূদিত
মতামত লেখকের নিজস্ব