
কয়েক দিন আগে ঢাকায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঢাকার এই সুন্দরতম ও প্রশস্ত রাস্তার ফুটপাতে যে নির্লিপ্ত বাণিজ্যিকীকরণ চোখের সামনে ঘটে গেছে, তাতে অনেক কিছু ভাবার আছে। বিষয়টিকে সাদাকালোর তর্কে নামিয়ে আনা সহজ। কিন্তু তা কাম্য নয়।
আমাদের নগরায়ণের প্রচলিত ধারায় নিম্নবিত্ত মানুষ যেখানেই এক বর্গইঞ্চি জায়গা পায়, সেখানেই রুজিরোজগারের বন্দোবস্ত খোঁজে এবং করে ফেলে। ইট–কংক্রিট, শব্দসন্ত্রাস, যানজট আর জনসমুদ্রের এই শহরে স্বস্তির জায়গার বড়ই অভাব। তাই বিকেলে মানুষ সংসদের সামনের খোলামেলা ফুটপাতে আসে, হাওয়া খায়, একটু বসে। বিনা পয়সায় বসার জায়গা এই শহরে আর কই। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এখানে বিকেলে একধরনের পার্কের পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়।
জায়গাটি অল্প পুঁজির ফুচকাওয়ালাদের জন্য একটি মোক্ষম বাজার। ডিমান্ড আর সাপ্লাই চাহিদা ও সরবারহের সহজ হিসাব। শুধু ফুচকাওয়ালা নয়, স্কেচ আর্টিস্ট থেকে শুরু করে খেলনাওয়ালা, বেলুনওয়ালা, চাওয়ালা, কাপড়ওয়ালা, অলংকারওয়ালা—সবাই হাজির হয়ে যায় ক্ষুদ্র পুঁজির ব্যবসা নিয়ে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এখানে ব্যবসার ধরনটি বেশ হাইব্রিড। কেউ ভাসমান, দিন শেষে জিনিসপত্র গুটিয়ে নিয়ে চলে যায়। কেউ আধা ভাসমান, কিছু মালপত্র ঢেকে রেখে যায়। কেউ আবার স্থায়িত্বের দাবিদার, টেবিল–চেয়ার–চুলা এখানেই থাকে।
এটি তৃণমূল অর্থনীতির একধরনের চর্চা। তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। এই চর্চার উচ্ছেদ কঠিন। উচ্ছেদ করা হলে সেটিকে অভিজাত, শাসক ও বুর্জোয়া শ্রেণির আগ্রাসী দারিদ্র্য পরিচ্ছন্নকরণ হিসেবে দেখা হতে পারে। কারণ, আমাদের প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। তৃণমূল অর্থনীতির শিকড় আমাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত। এর অর্থ হচ্ছে, এই অর্থনীতির সড়কযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ মানুষের একটি নীরব সমবেদনা তৈরি হয়।
কিন্তু এর বিপরীত তর্কও আছে। প্রশ্ন হলো, নগরশরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কি তৃণমূল বাজার বা যেকোনো বাজারকে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার দেওয়া উচিত। সংসদ ভবন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কেন্দ্রবিন্দু। আদর্শ পরিস্থিতিতে যেখানে রাষ্ট্রের আইন প্রণীত হয়, সে স্থানের একটি বাজারমুক্ত মর্যাদা থাকা কি প্রত্যাশিত নয়। যে বাজার দিন শেষে কয়েক শ টন উচ্ছিষ্ট উৎপাদন করে, সেটি কি সংসদের সামনে থাকা ন্যায্য।
বাজারব্যবস্থা আর পরিবেশবান্ধব মানবিক নগরের সম্পর্কের সমীকরণটা কখন গ্রহণযোগ্য হয়। এ দেশে রাজনীতি নিয়ে গণমানুষের তীব্র নেতিবাচক মনোভাব থাকতে পারে। কিন্তু তাই বলে সংসদ এলাকা রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়, এমন ভাবার কোনো যুক্তি আছে কি? এই এলাকাও বাজারদূষণে আক্রান্ত হতে হবে কেন? মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নগরবাসীর সিভিক অধিকার দেখভালের দায়িত্ব কার।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তৃণমূল বাজার থাকতে দেওয়া উচিত, না এলাকাটিকে বাজারমুক্ত রেখে নগরবাসীকে শান্তিপূর্ণভাবে এটি উপভোগ করার অধিকার দেওয়া উচিত। অধিকারের এই বাইনারি মেরুকরণটিই কি ন্যায্য? ন্যায়বিচার কি একই সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব? এক দলের পক্ষে দাঁড়ালে কি আরেক দলের প্রতি অবিচার হয় না?
সহজেই অনুমেয়, এসব প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই। তার মানে আমরা একটি দার্শনিক তর্কের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। সেটি হলো ন্যায়বিচারের ধারণা আপেক্ষিক। অনেকাংশেই এটি আমাদের নৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। ন্যায়বিচারের ধারণা কখনোই তর্কাতীত কোনো আদর্শ নয়। এক পক্ষের ন্যায়বিচার অপর পক্ষের জন্য অবিচার হয়ে উঠতে পারে।
প্রাচীনকাল থেকেই ন্যায়বিচারের ধারণা নিয়ে বিতর্ক চলছে। প্লেটো ও অ্যারিস্টটল ন্যায়বিচার বলতে মানুষের মৌলিক পুণ্য বা গ্রিক পলিসে নৈতিক দায়িত্ববোধের কথা বলেছেন। লাতিন ভাষায় ইউস্টিটিয়া মানে সবাইকে সমান চোখে দেখা। আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ন্যায়বিচারকে দেখা হয় মানুষের অধিকার ও সম্পত্তি সংরক্ষণের আইনি ভিত্তি হিসেবে।
আইনের শাসন ছাড়া রাষ্ট্র অচল। কিন্তু সামাজিক উন্নয়নের জন্য কেবল আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়। যত দিন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও নৈতিক কল্পনায় ন্যায়–অন্যায়ের বোধ গভীরভাবে প্রোথিত না হবে, তত দিন সামাজিক অস্থিরতা ও নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা চলতেই থাকবে। বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থ গৌণ হয়ে থাকবে।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আইনের শাসন ন্যায়বিচারের প্রধান কাঠামো। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ন্যায়বিচারের আলোচনা আইনি শাসনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে। অমর্ত্য সেনের মতো পণ্ডিতেরা মনে করেন, ন্যায়বিচার কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আইনি শাসনের সীমাবদ্ধ সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে ন্যায়বিচারকে মানুষের দৈনন্দিন নৈতিক কল্পনার অংশ করে তুলতে হবে। তাঁর মতে ন্যায়বিচারের লক্ষ্য হওয়া উচিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতায়ন।
একটি সুন্দর, সুস্থ ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনে সাদাকালোর কোনো সুযোগ নেই। আমাদের রাজনীতিতে ‘বৈষম্যহীন’ শব্দটি এত বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যে অনেকেই মনে করেন এটি বুঝি কোনো ফর্মুলা বা দ্বন্দ্বহীন গন্তব্য। মোটেও তা নয়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ফুটপাতের কথাই ধরা যাক।
আইনের শাসন ছাড়া রাষ্ট্র অচল। কিন্তু সামাজিক উন্নয়নের জন্য কেবল আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়। যত দিন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও নৈতিক কল্পনায় ন্যায়–অন্যায়ের বোধ গভীরভাবে প্রোথিত না হবে, তত দিন সামাজিক অস্থিরতা ও নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির প্রবণতা চলতেই থাকবে। বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থ গৌণ হয়ে থাকবে।
উদাহরণ দেওয়া যাক। কোনো কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করা হলো। সারা দিন মানুষ যানজটে আটকে রইল। অনেক রোগী হাসপাতালে যেতে পারল না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মূলধন হারাল। শিক্ষার্থীরা স্কুলে পৌঁছাতে পারল না। ব্যাপক ক্ষতি হলো। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা কি ভেবেছে যে তারা অনেকের প্রতি অবিচার করছে। নিজেদের দাবি আদায়ের পথে তারা কি অন্যের অধিকারে আঘাত করছে না?
আরেকটি উদাহরণ—উন্নয়নশীল দেশের নগরায়ণে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড় ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের জিডিপিতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অবদান ৪০ থেকে ৪৩ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এখানেই। অথচ আমাদের মূলধারার অর্থনীতিবিদদের নীতিপত্রে এই অর্থনীতি প্রায় অনুপস্থিত।
জাতিসংঘের ২০২৫ সালের বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যার বিচারে ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এই শহরের জনসমুদ্রের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ তৃণমূল অর্থনীতিতে যুক্ত থাকবে অথচ তাদের সামগ্রিক নীতির বাইরে রাখা কি খোদ একধরনের অবিচার নয়?
এ পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্কিন রাজনৈতিক দার্শনিক জুডিথ স্কলার। জুডিথের মতে, আমরা ন্যায়বিচার নিয়ে যত আদর্শ তত্ত্ব দাঁড় করাই, বাস্তব জীবনে অবিচার কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে আমরা ততটাই উদাসীন। আদর্শ ন্যায়বিচার বিরল। কিন্তু চারপাশে অবিচার অফুরন্ত। যত দিন না আমরা অন্যায়ের শিকার মানুষের চোখ দিয়ে সমাজ দেখতে শিখব, তত দিন ন্যায়বিচারভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।
ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদ অধ্যাপক, স্থাপত্য ইতিহাসবিদ, বিশ্লেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব