অর্থনীতি

বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

চার বছর ধরে বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরগতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, অনেক ব্যাংকে তারল্যসংকট এবং জ্বালানি সরবরাহে অব্যাহত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা উন্নত হয়েছে এবং বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে, তবে বেসরকারি খাতের আস্থা এখনো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। এমন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত হিসাবে আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে মাত্র ৪.১৪ শতাংশ। ফলে মাত্র এক অর্থবছরে এত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং রপ্তানিতে অত্যন্ত শক্তিশালী পুনরুদ্ধার প্রয়োজন হবে।

লক্ষ্যটি বেশ উচ্চাভিলাষী বলেই মনে হয়, কারণ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি বেসরকারি বিনিয়োগ এক দশকের বেশি সময় ধরে স্থবির রয়েছে। যদিও সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ১০.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩.১ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তবু কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগের শক্তিশালী পুনরুদ্ধারই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার গড় মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। অথচ আগের সংশোধিত অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত চলমান গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৩ শতাংশ। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির প্রকৃতি এখন আর কেবল মুদ্রানীতিনির্ভর নয়। এটি ক্রমেই কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্য, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের সমন্বয় এবং বাজারব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অদক্ষতা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। ফলে কেবল কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। এর পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির প্রাপ্যতা বাড়ানো, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং বাজার তদারকি জোরদার করাও সমানভাবে প্রয়োজন।

কাঠামোগত সংস্কার, শক্তিশালী রাজস্ব প্রশাসন, সুশাসনের উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া বাজেটের অনেক সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে

অন্যদিকে এবারের বাজেটে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৯.৪ শতাংশের বেশি হবে বলে আশা করা হয়েছে। অথচ ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকৃত ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.৭৫ শতাংশ। ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি, ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতি এবং আর্থিক খাতের চলমান দুর্বলতা ঋণের চাহিদা ও সরবরাহ—উভয় দিককেই সীমিত করছে। ফলে ব্যবসায়িক পরিবেশে উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।

বৈদেশিক খাতের বেলায় দেখা যাচ্ছে বাজেটে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হওয়ার এবং আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রতিফলন হিসেবে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে এবং মধ্য মেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেও ধারণা করা হয়েছে। এসব পূর্বাভাস অসম্ভব নয়, তবে এগুলো অনুকূল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশ, দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার উন্নয়ন এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

বাজেটের রাজস্বকাঠামো বেশ উচ্চাভিলাষী। সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় মোট সরকারি ব্যয় প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি এবং মোট রাজস্ব আয় ১৮.২ শতাংশের বেশি বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা রাজস্ব আহরণ নিয়ে। এক দশক ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাস্তবে রাজস্ব আহরণে অসাধারণ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে, বিশেষ করে ভ্যাট ও আয়কর থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর বেশি নির্ভর করা হয়েছে। কর পরিপালন বাড়ানো, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং করদাতাদের তথ্যভান্ডার সমন্বয়ের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ এখনো বড়।

জিডিপির ৩.৬ শতাংশ সমপরিমাণ বাজেট ঘাটতি অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক ঋণের সমন্বয়ে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ব্যক্তি খাতের ঋণ প্রাপ্যতার ওপর চাপ ফেলবে। অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির জন্য বৈদেশিক অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক ঋণ ছাড়ে বিলম্বের সমস্যায় ভুগছে। তা ছাড়া বৈদেশিক অনুদান দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে দেশকে ক্রমেই বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন হবে উন্নত রাষ্ট্রীয় ঋণযোগ্যতা, শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং ঋণদাতাদের শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করার সক্ষমতা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির তুলনায় বাস্তব পদক্ষেপ সীমিত। শ্রমঘন শিল্প, দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও উদ্যোক্তা সহায়তায় আরও লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি বাজেটের একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তা করতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, অপচয় ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজস্ব কাঠামোর পূর্বাভাস ইঙ্গিত করে যে বাজেটটি তুলনামূলকভাবে আশাবাদী একটি পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রণীত হয়েছে। কাঠামোগত সংস্কার, শক্তিশালী রাজস্ব প্রশাসন, সুশাসনের উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া বাজেটের অনেক সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তা ছাড়া এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে বাজেটের প্রতিটি ব্যয় যেন দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য বাস্তব ও অর্থবহ সুফল বয়ে আনে।

  • ড. ফাহমিদা খাতুন সিপিডির অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক