লাইফস্টাইল খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ। তবে এটি কি শুধুই একটি শব্দ? শব্দটি বিশ্লেষণ করলেই এর ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়। লাইফস্টাইল কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং উদ্ভাবনী নানা দিক। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ বাস্তবতায় যা এখন আমরা সবাই কমবেশি অনুভব করছি, সেখানে দাঁড়িয়ে লাইফস্টাইলকে বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
স্বীকৃতভাবে লাইফস্টাইল ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আচরণ ও পছন্দের প্রতিফলন প্রতিটি দৃষ্টিকোণেই গুরুত্ব পেয়েছে। দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত, ভোগের ধরন, অভ্যাস ও মূল্যবোধকে লাইফস্টাইলের মূল উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে এটিও স্বীকৃত যে লাইফস্টাইল পরিবর্তনযোগ্য। শিক্ষা, সচেতনতা ও নীতির মাধ্যমে জীবনধারা বদলানো সম্ভব।
টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ুর সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও স্পষ্ট। বিশেষ করে জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সংজ্ঞায় লাইফস্টাইলকে পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
মনোবিজ্ঞান ও স্বাস্থ্যভিত্তিক দৃষ্টিকোণ লাইফস্টাইলকে ব্যক্তির আচরণ ও সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এখানে ধারণা থাকে, তথ্য ও সচেতনতা বাড়লেই মানুষ নিজের জীবনধারা বদলাতে সক্ষম। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান ও পরিবেশভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখায়, দারিদ্র্য, বৈষম্য, লিঙ্গ, শিক্ষা, নীতি, বাজারব্যবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকির মতো কাঠামোগত বাস্তবতার কারণে সবার পক্ষে সমানভাবে স্বাস্থ্যকর বা টেকসই লাইফস্টাইল বেছে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যাগুলো প্রায়ই সামাজিক ও কাঠামোগত বাধাকে উপেক্ষা করে, আর সেখানেই অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্যতা দেখা যায় ভোক্তাকেন্দ্রিকতা ও টেকসইতার প্রশ্নে। মার্কেটিং ও ভোক্তা আচরণভিত্তিক দৃষ্টিকোণ লাইফস্টাইলকে পছন্দ, ব্র্যান্ড, ভোগ ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করে। ভোগের মধ্য দিয়েই পরিচয় নির্মাণকে সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অতিরিক্ত ভোগকে জলবায়ুসংকট, সম্পদ নিঃশেষ ও পরিবেশগত ক্ষতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
ফলে যেখানে একটি দৃষ্টিভঙ্গি ভোগকে উৎসাহিত করে, অন্যটি সংযম, দায়িত্বশীল ব্যবহার ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেয়। এই ভিন্নতার কারণে লাইফস্টাইলের সংজ্ঞাগুলোর মধ্যে মৌলিক দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য, মার্কেটিং ও পরিবেশবিদ্যা থেকে লাইফস্টাইলকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূল উপাদান ও গুরুত্বের ক্ষেত্রে মিল থাকলেও পরিবর্তনের দায়, পদ্ধতি ও পরিসর নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কোয়ালিটি অব লাইফ কী, কোন জীবনযাত্রাকে মানসম্মত ধরা হবে, পরিবর্তনের দায়িত্ব কার—এই প্রশ্নগুলোতেই অসামঞ্জস্যতা প্রকট।
এর ফলেও কয়েকটি সমস্যা তৈরি হয়। প্রথমত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক দোষারোপের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
জলবায়ুসংকটকে তখন নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, কাঠামোগত সমস্যার ফল হিসেবে নয়। এতে মানুষ হতাশ হয় বা মনে করে তাদের একক প্রচেষ্টা তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। দ্বিতীয়ত, সরকার ও করপোরেট খাতের ওপর প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার ও জবাবদিহির চাপ কমে যায়, যা বৃহৎ পরিসরে নিঃসরণ হ্রাস ও টেকসই রূপান্তরের জন্য অপরিহার্য।
এই অসামঞ্জস্যতা কার্যকর সমন্বয়কেও বাধাগ্রস্ত করে। ব্যক্তিগত আচরণ পরিবর্তন, নীতিগত উদ্যোগ ও বাজারব্যবস্থা যখন একই লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয় না, তখন উদ্যোগগুলো খণ্ডিত হয়ে পড়ে। অনেক সময় দায়িত্ব পুরোপুরি ব্যক্তির ওপর চাপানো হয়, অথচ রাষ্ট্র, করপোরেট খাত ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ভূমিকা আড়ালেই থাকে। এই ভারসাম্যহীনতা জলবায়ু মোকাবিলার উদ্যোগকে দুর্বল করে।
সার্বিকভাবে লাইফস্টাইল পরিবর্তনের দায়িত্ব নিয়ে অস্পষ্টতা জলবায়ু কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কারণ এতে ব্যক্তি, সমাজ ও ব্যবস্থার যৌথ দায় স্বীকৃতি পায় না। কার্যকর মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো। এই বাস্তবতায় লাইফস্টাইলের একটি সমন্বিত সংজ্ঞা জরুরি। খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্তি, সমাজ ও ব্যবস্থার ভূমিকা আলাদা করে দেখালেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্ট করে না। সমন্বিত সংজ্ঞা ব্যক্তিগত আচরণকে সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি, নীতিনির্ধারণ ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করে। এতে লাইফস্টাইলকে কেবল পছন্দ বা ভোগ নয়, ন্যায়ভিত্তিক ও পরিবেশসংবেদনশীল রূপান্তরের অংশ হিসেবে বোঝা যায়।
সে অর্থে লাইফস্টাইলকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। এটি ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি গতিশীল জীবনপ্রণালি, যা ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও আচরণের পাশাপাশি সামাজিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পরিবেশগত সীমার দ্বারা প্রভাবিত।
মানসম্মত বা টেকসই লাইফস্টাইল কেবল স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের বিষয় নয়; এটি প্রাকৃতিক সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ বিবেচনায় নেওয়ার একটি নৈতিক অবস্থান। এই দৃষ্টিকোণ থেকে লাইফস্টাইল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সম্মিলিত দায়িত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণ, কমিউনিটি অংশগ্রহণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত একটি রূপান্তরমুখী প্রক্রিয়া।
পরিবেশগত সংকটের এই সময়ে জীবনধারাভিত্তিক নীতি, শিক্ষা ও সামাজিক রূপান্তরের জন্য এমন একটি সমন্বিত কাঠামো অপরিহার্য।
বিধান চন্দ্র পাল প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রভা অরোরা
ই–মেইল: bidhan.probhaaurora@gmail.com