
ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান এখন ইতিহাসের বিপজ্জনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং স্থায়ী অবস্থায় রূপ নিচ্ছে। নতুন করে অস্থিরতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহিংসতাও বেড়েছে। প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না।
এ পরিস্থিতিতে আবারও একটি পরিচিত প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইরান কি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মতো আরেকটি মোড়ের দিকে এগোচ্ছে।
এই তুলনার প্রতি আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক। ব্যাপক জনসমাবেশ ও ঘন ঘন বিক্ষোভের দৃশ্য শাহ শাসনের শেষ দিকের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু এই তুলনা শেষ পর্যন্ত বিভ্রান্তিকর।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সাফল্য কেবল গণ–আন্দোলনের ফল ছিল না; বরং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সমন্বিত বিরোধী শক্তির আবির্ভাব এবং আন্দোলন দমনে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের ব্যর্থ হওয়াই বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল।
ইরানের রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ তখন ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। ওষুধের ওপর নির্ভরশীল ওই রাজার সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। সংকটের সময়ে তাঁর নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে তিনি দুবার দেশ ছেড়ে যান। প্রথমবার ১৯৫৩ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের চ্যালেঞ্জের সময় এবং দ্বিতীয়বার ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে, যখন সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া শাহর দমনযন্ত্রও ছিল খণ্ডিত ও সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক, পুলিশ ও জেন্ডারমেরির ওপর ছিল সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। তখন সেনাবাহিনী মূলত সীমান্ত ও ভূখণ্ড রক্ষায় নিয়োজিত ছিল, রাজনৈতিক দমন-পীড়নে নয়। এই বাহিনীগুলোয় আদর্শগত যাচাই ছিল দুর্বল এবং সদস্যরা নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমি থেকে এসেছিলেন।
শাহ দেশ ছাড়ার পর পুলিশের কিছু অংশ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দমনমূলক আচরণ বন্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিক্ষোভকারীদের সহযোগিতাও শুরু করে। একই সময়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, নিজেদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেন এবং শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরে আসেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমনক্ষমতা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত নয়; বরং এটি একাধিক পরস্পর জড়িত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে, যেখানে একাধিক কমান্ড কাঠামো একসঙ্গে কাজ করে। এই শক্তিগুলো মূলত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, বাসিজ, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং এসবের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক নেটওয়ার্কে কেন্দ্রীভূত।
তবে আজকের পরিস্থিতি ভিন্ন। শাহর মতো আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নেতৃত্ব সংকটের মুহূর্তে দ্বিধা বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে না। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর থেকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে গভীরভাবে রূপান্তরিত করেছেন। আমার ভাষায়, ইরান এখন এমন একটি ধর্মতান্ত্রিক নিরাপত্তা রাষ্ট্র, যা সমাজের সম্মতির চেয়ে দমননীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি অত্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক, সংহত, আদর্শিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং শক্তভাবে বলপ্রয়োগকারী কাঠামোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের দমনক্ষমতা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত নয়; বরং এটি একাধিক পরস্পর জড়িত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে, যেখানে একাধিক কমান্ড কাঠামো একসঙ্গে কাজ করে। এই শক্তিগুলো মূলত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, বাসিজ, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং এসবের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক নেটওয়ার্কে কেন্দ্রীভূত।
এই দমনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোয় শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে কট্টর সমর্থকেরাই প্রভাবশালী। তাদের আনুগত্য কেবল সুবিধাভিত্তিক নয়; এটি আদর্শিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রজন্মগত। আদর্শিক যাচাই ও পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এই আনুগত্য শুধু নিশ্চিত করা হয় না, বরং সচেতনভাবে লালন করা হয়। তাদের সামাজিক উত্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পরিচয়ের বোধ শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা এবং খামেনির নেতৃত্বের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাদের কাছে শাসনব্যবস্থার পতন কোনো রাজনৈতিক রূপান্তর নয়, বরং অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকি।
সংকটের মুহূর্তে এই অনুগত শক্তিগুলো আগেভাগেই সক্রিয় হয়, যাতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে না পড়ে। তারা অস্থিরতাকে বিদেশি মদদপুষ্ট ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করে এবং সহিংসতার পথে যেতে দ্বিধা করে না।
এ কারণে ১৯৭৯ সালের তুলনায় বড় ও বিস্তৃত বিক্ষোভও শাসনব্যবস্থার ভিত্তিকে মৌলিকভাবে নাড়িয়ে দিতে পারছে না; বরং এর ফল হবে আরও কঠোর দমনমূলক। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা স্পষ্ট হয়—বিক্ষোভ নিজে থেকেই বিপ্লব ঘটায় না; বিপ্লব ঘটে তখনই, যখন ব্যাপক গণ–অসন্তোষের সঙ্গে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের অচলাবস্থা বা ভাঙন একত্র হয়। ১৯৭৯ সালে তা ঘটেছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ঘটেনি। এই ভারসাম্য বদলাতে শুধু বিক্ষোভ নয়, বরং শাসনব্যবস্থার নেতৃত্বকাঠামোর ওপর সরাসরি কোনো বড় ধাক্কা দরকার।
শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও ইরান এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার মুখে পড়বে না, যেমনটি বিদেশি হস্তক্ষেপের ফলে কিছু রাষ্ট্রে দেখা গেছে। দেশটির আধুনিক আমলাতন্ত্র বিশ শতকের শুরু থেকেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এসেছে। রাষ্ট্রের সক্ষমতা, সামাজিক সংগঠন এবং জাতীয় পরিচয়ের কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় তেমন চিড় ধরাতে পারবে না।
অনেকে সতর্ক করছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হলে অনিবার্যভাবে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হবে। এই ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতির সঙ্গে ইরানের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
ইরানের ক্ষেত্রে এমন কোনো বাইরের রাষ্ট্র নেই, যারা সশস্ত্র উগ্র আন্দোলনকে অর্থায়ন, সংগঠিত ও দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখার মতো ইচ্ছা ও সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে ইরানি সমাজ ধর্মীয় চরমপন্থা ও রাজনৈতিক উগ্রতার বিরুদ্ধে গভীর প্রতিরোধ দেখিয়েছে। তাই শাসনব্যবস্থা পতনের পর যে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভবও হতে পারে।
ইরান ১৯৭৯ সালের পুনরাবৃত্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। বিপদ হলো, এই পুরোনো তুলনার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইরানের বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে তেমন সহায়ক নয়। ইরানে ক্ষমতার প্রকৃত চরিত্র ভুলভাবে বুঝলে দমন, উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার মূল্য ইরানিদেরই দিতে হবে।
সাঈদ গোলকার যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত