
সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত তা ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এই আইনের উদ্দেশ্য খুবই ইতিবাচক। অনেক মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অবহেলা ও নির্যাতনের শিকার হন। কাউকে কাউকে বাড়ি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। নতুন বিধানটির লক্ষ্য হলো তাঁদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া।
তবে আইনের উদ্দেশ্য ভালো হলেই তা কার্যকর হয় না। আইনে দেওয়া অধিকারটি কী, সেই অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করা যাবে এবং অধিকার লঙ্ঘিত হলে কোথায় প্রতিকার পাওয়া যাবে, সেটিও পরিষ্কার থাকা দরকার। সংশোধনীটির প্রধান দুর্বলতা এখানেই। মাত্র দুটি নতুন ধারা দিয়ে সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগের মতো জটিল বিষয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে আইনটির উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সংশোধনীতে জীবনকালীন ভোগাধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভোগাধিকার বলতে ঠিক কী বোঝাবে, তার স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। দাতা কি শুধু ওই সম্পত্তিতে বসবাস করতে পারবেন? নাকি তা ভাড়া বা ইজারা দিয়ে আয়ও করতে পারবেন? কৃষিজমি হলে তিনি কি তা বর্গা দিতে পারবেন? বাড়ি মেরামত, গাছ কাটা কিংবা জমির ব্যবহার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কে নেবেন?
এগুলো শুধু আইনি বিতর্কের বিষয় নয়। বাস্তব জীবনে এমন প্রশ্ন উঠবেই। সংশোধিত আইনে মালিকানা ও ভোগদখলের সম্পর্ক খুব পরিষ্কার না থাকায় নামজারি, ব্যাংকঋণ, বিমা ও ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
দাতার ভোগাধিকার শুধু দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার বিষয় নয়। ভবিষ্যৎ ক্রেতা, ব্যাংক, ভাড়াটে, বিমা কোম্পানি এবং ভূমি প্রশাসনও এর সঙ্গে জড়িত। দাতার ভোগাধিকারের তথ্য নামজারি ও খতিয়ানে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা না থাকলে একজন সম্ভাব্য ক্রেতা তা জানতে পারবেন না। গ্রহীতা তথ্য গোপন করে সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে পারেন। তখন ক্রেতা ও দাতা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন। ক্রেতা হয়তো জানতেনই না যে সম্পত্তিতে অন্য একজনের ভোগাধিকার রয়েছে। একটি ঘটনা তখন একাধিক মামলার জন্ম দিতে পারে।
এ কারণে নিবন্ধন আইনেও প্রয়োজনীয় সংশোধন দরকার। দাতা ও গ্রহীতার সম্মতি অথবা আদালতের অনুমতি ছাড়া এমন সম্পত্তির বিক্রয় দলিল যেন নিবন্ধিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে সাবরেজিস্ট্রারের দায়িত্বও ঠিক করে দেওয়া দরকার। বিক্রয় দলিলে দাতার ভোগাধিকারের তথ্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত।
গ্রহীতা সম্পত্তি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চাইতে পারেন। সে ক্ষেত্রে দাতার সম্মতি লাগবে কি না, তা বলা হয়নি। ঋণ পরিশোধ না করলে ব্যাংক সম্পত্তিটি নিলামে তুলতে পারে। তখন দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার টিকে থাকবে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। এই ফাঁকের অপব্যবহারও হতে পারে। সাজানো ঋণ ও নিলামের মাধ্যমে দাতাকে সম্পত্তি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সরকার সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলে ক্ষতিপূরণ কে পাবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু রেকর্ডে থাকা মালিক ক্ষতিপূরণ পেলে দাতা তাঁর জীবনকালীন নিরাপত্তা হারাতে পারেন। সম্পত্তি চলে গেলেও তার বদলে পাওয়া অর্থ থাকবে। সেই অর্থে দাতার অধিকার কী হবে, তা ঠিক করা দরকার। একই প্রশ্ন উঠবে বিমার ক্ষেত্রেও। আগুন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়ি নষ্ট হলে বিমার টাকা কে পাবেন? ওই অর্থ দিয়ে আবার বাড়ি তৈরি করা হবে, নাকি গ্রহীতা তা নিজের মতো ব্যবহার করতে পারবেন? আইনে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
সংশোধনীর আরেকটি অস্পষ্ট দিক হলো, দাতার অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। সন্তান দাতা অর্থাৎ তারা বাবা বা মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলে তাঁরা কোথায় যাবেন? কোন আদালতে মামলা করবেন? কত দিনের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি হবে? দ্রুত দখল ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আদালত কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারবেন কি না—এসবের কিছুই স্পষ্ট নয়।
সাধারণ দেওয়ানি মামলা শেষ হতে অনেক বছর লাগতে পারে। এরপর আপিলের সুযোগ থাকলে বিরোধ আরও দীর্ঘ হবে। জীবনকালীন অধিকার রক্ষার মামলা যদি দাতার মৃত্যুর পর নিষ্পত্তি হয়, তাহলে সেই অধিকার বাস্তবে কোনো কাজে আসবে না। বৃদ্ধ দাতাকে যেন বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
যে ইতিবাচক উদ্দেশ্য নিয়ে আইনটি করা হয়েছে তা কার্যকর ও এর সুফল পেতে হলে উল্লেখিত ‘অস্পষ্টতা’ দূর এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উচিত এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।
সংসদে বিরোধী দল অভিযোগ করেছে, সংশোধনীটি কোরআন-সুন্নাহ ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে এই আপত্তির শক্ত ভিত্তি আছে বলে মনে হয় না। সংশোধনীতে মুসলিম আইনের অধীন প্রচলিত ‘হেবা’ বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়নি। হেবাসহ আইনে স্বীকৃত অন্য পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগও বহাল থাকছে। নতুন আইনে শুধু আরেকটি পদ্ধতি যোগ করা হয়েছে।
কোনো মুসলিম দাতা চাইলে হেবার প্রচলিত নিয়মে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। আবার চাইলে সন্তান, নাতি-নাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার সময় নিজের জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দিতে পারবেন। অর্থাৎ নতুন বিধানটি কাউকে ধর্মীয় পদ্ধতি ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে না।
ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত কোনো বিষয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম যুক্ত করাও নতুন ঘটনা নয়। যেমন মুসলিম বিয়ের ধর্মীয় বৈধতার জন্য নিবন্ধন আবশ্যক নয়। কিন্তু নাগরিক অধিকার রক্ষা, বিয়ের প্রমাণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রাষ্ট্র বিয়ে নিবন্ধনের বিধান করেছে। এ কারণে নতুন একটি দেওয়ানি পদ্ধতি চালু করাকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলা যুক্তিসংগত নয়।
এই সংশোধনীর সামাজিক প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এর দুর্বলতাগুলো কাটানোর পথ নিয়েও আলোচনা করা দরকার।
● মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
* মতামত লেখকের নিজস্ব