মতামত

গ্রামের বাজারে ডাব কিংবা মাছের দাম কেন ঢাকার চেয়ে বেশি

বিক্রেতা একটা ডাবের যে দাম চাইলেন, সেই একই দামে ঠিক দুই দিন আগে কারওয়ান বাজারে তার চেয়ে বড় সাইজের ডাব বিক্রি হতে দেখেছি
ছবি : লেখক

এ মাসের শুরুতে ঢাকা থেকে দিন কয়েকের জন্য গিয়েছিলাম কুষ্টিয়ার কুমারখালী। তীব্র গরমে ডাবের খোঁজে কুমারখালী বাজারের এমাথা থেকে ওমাথা চষে বেরিয়ে শেষে একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার দেখা পাওয়া গেল। ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যানে ঘুরে ঘুরে তিনি ডাব বিক্রি করছেন। গত বছরও এ বাজারে তিন থেকে চারজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাকে ডাব বিক্রি করতে দেখেছি।

বিক্রেতা একটা ডাবের যে দাম চাইলেন, সেই একই দামে ঠিক দুই দিন আগে কারওয়ান বাজারে তার চেয়ে বড় সাইজের ডাব বিক্রি হতে দেখেছি। মনে পড়ল, গত বছর এই বাজার থেকে অর্ধেকের চেয়ে কম দামে ডাব কিনেছি। জিজ্ঞাসা করায়, বিক্রেতা জানালেন, এখন আর সে রকম ডাব পাওয়া যাচ্ছে না, আর দাম বাড়ায় ক্রেতাও কম। তিনি ১৫টি ডাব নিয়ে সকাল ১০টায় বাজারে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে যখন আমি কথা বলছি তখন ঘড়িতে ঠিক দুপুর ১২টা ৫ মিনিট। দুই ঘণ্টায় মাত্র পাঁচটি ডাব বিক্রি হয়েছে। আরও ১০টা ডাব তখনো রয়ে গেছে। কয়টা নাগাদ সেগুলো বিক্রি হবে, তা পরিষ্কার করে জানেন না। জানালেন, সব কটি ডাব বিক্রি করতে পারলে খরচ বাদে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা থাকবে। তাঁর একার আয়ের ওপরই পাঁচ সদস্যের পরিবার নির্ভরশীল। ডাব বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই আমাদের সামনে দিয়ে এক ভ্যানভর্তি ডাব চলে গেল। আমার কৌতূহলী চোখের উত্তরে জানালেন, আড়তে যাচ্ছে, ঢাকায় যাবে।

আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ ও তাৎপর্যহীন ঘটনা বলে মনে হলেও আমাদের অর্থনীতির চরম বৈষম্য ও বাজারব্যবস্থার দুর্বলতার চিত্র এ থেকে আঁচ করা যায়। কয়েকটি খণ্ড চিত্র পাশাপাশি জোড়া দিলে সমীকরণটা সহজভাবে মেলানো যাবে। সে জন্য আরও কয়েকটি তথ্য দেওয়া যাক। যে বিক্রেতাকে ৮০ টাকায় ডাব বিক্রি করতে দেখেছি, তিনি গৃহস্থের কাছ থেকে ডাব কিনেছেন ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। গাছে উঠে ডাব পাড়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পারিশ্রমিক অবশ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয় না। গৃহস্থের বাড়ি থেকে এক বা দুই কিলোমিটার দূরত্বে বাজারে পৌঁছাতে দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। কয়েক শ কিলোমিটার দূরে রাজধানীর বাজারে সে ডাবই স্থানীয় বাজারের তুলনায় কম মূল্যেও বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় বাজারে ডাব না মেলা অথবা মিললেও দুর্মূল্য হওয়ার পেছনে বড় দুটি কারণ রয়েছে। এক. গত দেড় বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় ক্রয়সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। চাল, নুন, তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজারের স্বাভাবিক সূত্র অনুযায়ী চাহিদা কমে গেলে দামও কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঘটছে উল্টো ঘটনা। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোয় চাহিদার কারণে ডাবগুলো সেখানে চলে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় লোকজন বঞ্চিত হচ্ছেন।

ধনী-গরিবের এই বৈষম্য এতটা প্রকট হওয়ার বড় কারণ হলো এখানে সম্পদ একটা অংশের মাঝে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের তথ্য বলছে, অতিধনী তৈরিতে বাংলাদেশ তৃতীয় ও ধনী তৈরিতে প্রথম। বিপুল জনসংখ্যা আর সীমিত সম্পদের দেশে যখন এভাবে ধনী ও অতিধনীর তৈরির প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে, সেখানে বৈষম্যটা দৃষ্টিকটু রকম উৎকট না হয়ে উপায় নেই। একটা শ্রেণির মাঝে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে ভোক্তা হিসাবে তাঁরা যে চাহিদা বাড়াচ্ছেন তাতে জিনিসপত্রের দাম সংখ্যাগরিষ্ঠের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গরু ও খাসির মতো প্রাণিজ আমিষ এখন সাধারণ মানুষের জন্য স্বপ্নের মতো বিষয় হয়ে ওঠার এটি বড় একটি কারণ।

শুধু ডাব নয়। দেশি মাছের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। কুমারখালীর স্থানীয় বাজারগুলোয় মাছ কিনতে গেলে রুই, কাতলা, পোনা, তেলাপিয়া, পাঙাশ, হাইব্রিড কইয়ের মতো মাছগুলোই পাওয়া যায়। অথচ এ উপজেলার এক দিকে পদ্মা নদী আর অন্য দিকে গড়াই নদ। মাঝে অনেকগুলো খাল ও বিল। সেখানে দেশি প্রজাতির মাছ মিললেও সেগুলো স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় না। সরাসরি চলে যায় ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয়। যেটুকু মেলে তার দাম ঢাকার বাজার থেকেও বেশি।

খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি, টাকা পাচারের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সংকট এখন বৈষম্য। সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে বাংলাদেশ এখন উচ্চ আয় বৈষম্যের দেশ। বিবিএসের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২২ সাল শেষে গিনি সহগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৪৯৯ পয়েন্ট। ২০১৬ সালে গিনি সহগ ছিল দশমিক ৪৮২ পয়েন্ট। সাধারণত দশমিক ৫০০ হলেই একটি দেশকে উচ্চ আয় বৈষম্যের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ধনী-গরিবের এই বৈষম্য এতটা প্রকট হওয়ার বড় কারণ হলো এখানে সম্পদ একটা অংশের মাঝে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের তথ্য বলছে, অতিধনী তৈরিতে বাংলাদেশ তৃতীয় ও ধনী তৈরিতে প্রথম। বিপুল জনসংখ্যা আর সীমিত সম্পদের দেশে যখন এভাবে ধনী ও অতিধনীর তৈরির প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে, সেখানে বৈষম্যটা দৃষ্টিকটু রকম উৎকট না হয়ে উপায় নেই। একটা শ্রেণির মাঝে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে ভোক্তা হিসাবে তাঁরা যে চাহিদা বাড়াচ্ছেন তাতে জিনিসপত্রের দাম সংখ্যাগরিষ্ঠের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। গরু ও খাসির মতো প্রাণিজ আমিষ এখন সাধারণ মানুষের জন্য স্বপ্নের মতো বিষয় হয়ে ওঠার এটি বড় একটি কারণ।

১৮ কোটি মানুষের দেশে আমরা একটা, দুটির বাইরে নগর গড়ে তুলতে পারিনি। সারা দেশ থেকে সব সম্পদ এনে সেই নগরেই কেন্দ্রীভূত করে ফেলছি। শুধু ভৌত অবকাঠামো নির্ভর উন্নয়ন বৈষম্যকে তীব্র করে তুলছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হয়েছে। অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ ব্যয় হয়। এখন খুব কম গ্রামই পাওয়া যাবে যেখানে পাকা সড়ক পৌঁছায়নি। কিন্তু গ্রাম ও মফস্বলের মানুষের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কি ঘটেছে? দোকানদারি আর ব্যাটারিচালিত ভ্যান ছাড়া গ্রাম ও মফস্বলের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে কি?

ব্রিটিশরা এক সময় ভারতবর্ষে রেললাইন নির্মাণ করেছিল। এ রেললাইন ভারতের অর্থনীতির সামন্তীয় স্থবিরতা ভেঙে দিয়েছিল। সেটা মুদ্রার একদিকের সত্য। আরেক দিকের সত্য হলো, এই রেললাইন ধরেই সারা দেশের সম্পদ কলকাতা থেকে পাচার হয়ে লন্ডনে পৌঁছে যেত। সে দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে কখনোই দারিদ্র্য যেত না। সেই ঔপনিবেশিক একমুখী উন্নয়ন দর্শন থেকে কি আমরা এগোতে পেরেছি?  

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী