
হরমুজ প্রণালি আজ বিশ্ব অর্থনীতি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর এই জলপথ কার্যত এক ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হয়ে উঠেছে। ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং এক-চতুর্থাংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তাই এই সংকটকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সত্তরের দশকের পর জ্বালানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
যদিও ইরানের নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়, তবু উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সমুদ্রের মাইন এই প্রণালিকে বিপজ্জনক করে রেখেছে। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অনেকটাই কমে গেছে।
বিমা খরচও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। কোথাও কোথাও বলা হচ্ছে, প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য অতিরিক্ত টোল দাবি করছে ইরান।
বিশ্ব বাণিজ্যের অধিকাংশই সমুদ্রপথে হয়। কিন্তু নিরাপদ চলাচলের কারণে এই বাণিজ্য নির্দিষ্ট কিছু সরু পথের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই সরু পথগুলোকে বলা হয় ‘চোক পয়েন্ট’ বা সংকীর্ণ প্রবেশপথ। ইতিহাসে দেখা গেছে, এই পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারা মানে সমুদ্রশক্তিতে আধিপত্য বিস্তার করা।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় জিব্রাল্টার, মাল্টা, এডেন, সিঙ্গাপুর—এইসব জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে তারা বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যে আধিপত্য বজায় রেখেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও দারদানেলেস প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুদ্ধের গতিপথে বড় ভূমিকা রাখে।
বর্তমান সময়েও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কৌশলগত আগ্রহ (যেমন গ্রিনল্যান্ড বা পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা) আসলে এই চোক পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণের চিন্তারই অংশ। কারণ রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এই পথগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমুদ্রপথকে আন্তর্জাতিক সম্পদ হিসেবে দেখার ধারণা বহু পুরোনো। সপ্তদশ শতকে ডাচ আইনবিদ হুগো গ্রোটিয়াস ‘মুক্ত সমুদ্র’ ধারণা দেন, যেখানে সব দেশ সমানভাবে সমুদ্র ব্যবহার করতে পারে।
পরে ১৯৮২ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন এই ব্যবস্থাকে আরও নির্দিষ্ট করে, যেখানে উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত জলসীমা নির্ধারণ করা হয়।
তবে সমস্যা তৈরি হয় এই চোক পয়েন্টগুলো নিয়ে। কারণ এগুলো অনেক সময় এক বা একাধিক দেশের আঞ্চলিক জলের মধ্যেই পড়ে যায়। তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়।
এই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক আইনে ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ এবং ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ নামের দুটি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথমটি কিছু শর্তসাপেক্ষে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়।
দ্বিতীয়টি আন্তর্জাতিক প্রণালির মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করে। তবে এই নিয়ম প্রয়োগ নিয়েই বহু সময় বিরোধ দেখা দেয়।
হরমুজ প্রণালি সেই ধরনের একটি আন্তর্জাতিক জলপথ, যা ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে গেছে। ইরান এই আন্তর্জাতিক চুক্তির কিছু অংশ মানলেও পূর্ণভাবে অনুমোদন দেয়নি।
ফলে সংকটের সময় এই প্রণালিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে চলে যায়।
বিশ্ব অর্থনীতির নির্ভরতা এই জলপথের ওপর এতটাই বেশি যে এর যেকোনো বাধা সরাসরি জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
ইরানের বর্তমান দুর্বল অর্থনীতি, সামরিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এই প্রণালি তাদের জন্য শেষ বড় কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
ফলে তারা এই পথকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে রাজনৈতিক ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে।
ভারতের জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জ্বালানি আমদানি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। তাই এই অঞ্চলের যেকোনো অস্থিরতা ভারতের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি শুধু একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং শক্তির ভারসাম্যের এক জটিল প্রতীক। এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও বাড়বে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা গোটা অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান—এই তিন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারতকে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা নিতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকাশ্য ভূমিকার চেয়ে নীরব কূটনীতি এখানে বেশি কার্যকর হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি শুধু একটি জলপথ নয়, এটি বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং শক্তির ভারসাম্যের এক জটিল প্রতীক। এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্বব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
অরুণ প্রকাশ ভারতের নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ