গত বছরের শেষের দিকে ইসরায়েল আফ্রিকার সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর পরপরই সোমালিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়েও তীব্র নিন্দা ওঠে।
ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রয়েছে ইয়েমেনের হুতিরাও রয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীটির নেতা আবদেল-মালিক আল-হুতি ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তকে একটি ‘শত্রুতামূলক অবস্থান’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং সতর্ক করেন যে, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের যেকোনো উপস্থিতিকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করা হবে।
এই মাসের শুরুতে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার সোমালিল্যান্ড সফর করেন। তাঁর ভ্রমণসূচিতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী বেরবেরাকে অন্তর্ভুক্ত করলে হুতিদের সেই উদ্বেগ আরও জোরালো হয়। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফরের পর এক বিবৃতিতে জানান, নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি তাঁদের আলোচ্যসূচিতে ছিল।
সোমালিল্যান্ডের কর্মকর্তারাও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা তাঁদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতির সম্ভাবনার বিষয়ে ইতিবাচক। যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তবে ইসরায়েল সরাসরি এডেন উপসাগরের অপর পাড়ে হুতিদের মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোমালিল্যান্ডের দেওয়া এই স্বীকৃতি ইসরায়েলের এক বৃহত্তর নীতি পরিবর্তনের অংশ। ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর, ইসরায়েল এখন গোপন রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের চেয়ে বিকল্প পক্ষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার দিকে ঝুঁকছে।
২৬ ডিসেম্বর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতার স্বীকৃতির এই ঘোষণা দেন, তখন তিনি প্রকাশ্যে মোসাদ পরিচালক ডেভিড বার্নিয়াকে ধন্যবাদ জানান। এর মধ্য দিয়ে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের পেছনে গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার দিকেই ইঙ্গিত করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিদের পক্ষ থেকে ক্রমবর্ধমান হুমকির কারণেই এই সময়টিকে বেছে নিয়েছে ইসরায়েল। গাজায় যুদ্ধের সময় থেকেই ইসরায়েল ও হুতিদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে হুতিরা ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে এবং লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে বেরবেরাকে নিয়ে। এডেন উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই শহরটি লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারে এক অনন্য কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে অটোমান, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৭ সাল থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখানে অবস্থান শক্ত করেছে। এই বন্দরটি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথের পাশে অবস্থিত এবং হুতি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৫০০ কিলোমিটার (৩০০ মাইল)।
ইসরায়েলের ‘ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ’ (আইএনএসএস)-এর একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, সোমালিল্যান্ডের ভূখণ্ডকে ইসরায়েল বহুমুখী অভিযানের জন্য ব্যবহার করতে পারে: ১. হুতিদের কার্যক্রম ও অস্ত্রশস্ত্রের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি। ২. ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারকে কৌশলগত সহায়তা প্রদান। ৩. সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর প্ল্যাটফর্ম।
সোমালিল্যান্ডের জন্য ইসরায়েলের এই কূটনৈতিক সমর্থন এক নাজুক সময়ে এসেছে। ২০২৩ সালে লাস আনোদ শহরটি বিরোধী বাহিনীর কাছে হারানোর ফলে তারা সামরিকভাবে পিছিয়ে পড়ে। এ ছাড়া সোমালিয়ার ফেডারেল সরকার আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ ও ভিসা বিধিনিষেধের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিল্লাহির প্রশাসন ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে কূটনৈতিক স্বীকৃতির বিনিময়ে কৌশলগত সহযোগিতা ও প্রবেশাধিকারের প্রস্তাব দিয়েছিল। গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট জানান, একমাত্র ইসরায়েলই সেই চিঠির সাড়া দিয়েছে।
সোমালিল্যান্ডে বেশির ভাগ মানুষ ইসরায়েলের সঙ্গে এই চুক্তিকে সমর্থন করেছেন। তারা নিজেদের পশ্চিমা মিত্র হিসেবে তুলে ধরতে চায়—যেমনটি তারা তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে করেছে। তারা চীন, ইরান এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে আগ্রহী।
সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক অ্যালন লিয়েল আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য কেবল ইয়েমেনে হামলা চালানোর ঘাঁটি পাওয়া নয়; বরং গাজা যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিকভাবে যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে নতুন মিত্র খুঁজে পাওয়া এবং নিজের প্রভাব বজায় রাখা।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি নেতানিয়াহুর আমন্ত্রণে ইসরায়েল সফরে যেতে রাজি হয়েছেন, যেখানে একটি দূতাবাস খোলার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মাহমুদ ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে সোমালিল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে এই বড় কূটনৈতিক অগ্রগতির পর সোমালিল্যান্ডের নেতারা এখন আর সোমালিয়ার সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী নন।
ফয়সাল আলী সোমালিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার বিষয়ে লেখালিখি ও সাংবাদিকতা করেন। দ্য গার্ডিয়ান ও টিআরটি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন।
আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।