সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ এই জোটের কেউই ইসরায়েল ও তার পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করতে রাজি হয়নি।
সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ এই জোটের কেউই ইসরায়েল ও তার পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করতে রাজি হয়নি।

মতামত

‘ইসলামি ন্যাটো’ কেন ইসরায়েলের রক্ষক হয়ে উঠল

প্রতিটি সাম্রাজ্যই একটি কৌশলকে নিখুঁত করতে চায়। তারা ভুক্তভোগীদের বোঝায় যে অংশগ্রহণ মানেই প্রভাব, আর আনুগত্যই নাকি পরিণত আচরণ। এই কৌশলের সাম্প্রতিক রূপ হলো তথাকথিত ইসলামি ন্যাটো। এটি একধরনের সুন্নি জোট, যার মূল লক্ষ্য পশ্চিমা শক্তিগুলোকে আশ্বস্ত করা যে মুসলিম ক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যাবে এবং নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা যাবে।

এই জোট আসলে ঝুঁকিহীন ঐক্য, কোনো মূল্য না দেওয়া প্রতিরোধ এবং উদ্ধৃতি চিহ্নের ভেতরে বন্দী সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ভ্রান্তি দূর করা দরকার। যদি এই জোট সত্যিই কার্যকর হতো, তাহলে গাজা আজ এমন অবস্থায় থাকত না।

গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ কোনো গোপন ঘটনা ছিল না। তা টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে, সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে, বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে। এখানে ভয়াবহতাকে রুটিনে পরিণত করা হয়েছে প্রশাসনিক দক্ষতায়। হাসপাতাল ধ্বংস করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মুছে ফেলা হয়েছে। অনাহারকে পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র বানানো হয়েছে। শিশুদের হত্যা করা হয়েছে, যেন শিল্পকারখানার উৎপাদনপ্রক্রিয়া।

এটি কোনো দুর্ঘটনা বা ভুল সিদ্ধান্ত নয়। এটি ছিল প্রকাশ্য এক নৈতিক পরীক্ষা। আর ইসলামি ন্যাটোর ছাতার নিচে থাকা প্রতিটি রাষ্ট্র সেই পরীক্ষায় একইভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ এই জোটের কেউই ইসরায়েল ও তার পৃষ্ঠপোষকদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত চাপ সৃষ্টি করতে রাজি হয়নি।

যখন শান্তি শব্দটি আধিপত্য হিসেবেই শোনা যায়। যখন অংশগ্রহণ মানে আত্মসমর্পণ বলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামি ন্যাটো গড়া হয়েছিল ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে, তার জবাব দিতে নয়। সেই ব্যবস্থায় এখন ফাটল ধরেছে। এরপর যা আসবে, তা আলোচনার টেবিলে মিটবে না। তা হবে হিসাব চুকানোর সময়।

তুরস্ক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল; কিন্তু একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে প্রতীকী এই বিচ্ছেদের সীমা কতটা সংকীর্ণ; যখন বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও পশ্চিমা প্রভাবের গভীর কাঠামো অক্ষত থাকে।

অন্য দেশগুলো নিষেধাজ্ঞার বদলে বিবৃতি দিয়েছে, বিচ্ছেদের বদলে বক্তৃতা করেছে, আর বাস্তব পরিণতির বদলে টেলিভিশনের শোক প্রদর্শন করেছে।

এমন নিষ্ক্রিয় সহযোগিতার পরও এই একই শাসকগোষ্ঠী এখন দাবি করছে যে তারা ট্রাম্পের কুৎসিত বোর্ড অব পিসে যোগ দিয়ে ঔপনিবেশিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করবে। এটি কোনো সরলতা নয়। এটি সরাসরি অপমান। যেন অগ্নিসংযোগকারী নিজেই আগুন লাগিয়ে পরে বলছে দমকল বাহিনী এসে গেছে।

কারণ, তার সহযোগীরাই এখন ছাইয়ের দেখভাল করবে। বোর্ড অব পিস কোনো নিরপেক্ষ মঞ্চ নয়। এটি কাঠামোগতভাবেই ঔপনিবেশিক। আন্তর্জাতিক আইন পাশ কাটানো, প্রতিরোধকে নিষ্ক্রিয় করা এবং গণহত্যাকে প্রশাসনের ভাষায় রূপান্তর করাই এর মূল নকশা।

তাহলে এই নাটক কেন। কারণ, ইসলামি ন্যাটোর আসল কাজ জায়নবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়। এর মূল কাজ মুসলিম জনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এটি রাজতন্ত্র ও ধনকুবেরদের জন্য একধরনের সংবরণ কৌশল, যারা তেল আবিবের চেয়ে নিজেদের দেশের রাজপথকে বেশি ভয় পায়।

এই জোট ক্ষুব্ধ মানুষকে বলে শান্ত থাকুন। আপনার শাসকেরা ভেতরের ঘরে আছেন। অর্থাৎ যারা আপনার সহধর্মীদের হত্যা করছে, আমরা তাদের হয়ে আপনার ক্ষোভ সামলে দেব। এই কাঠামোর ওপর ইসরায়েল বসে আছে এমন এক পরজীবীর মতো, যে আশ্রয়দাতাকে বোঝাতে পেরেছে, সে আসলে একটি অপরিহার্য অঙ্গ।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বাস্তবতা খুব দ্রুত বুঝে নিয়েছে এবং আগ্রহের সঙ্গেই সেই পথে এগিয়েছে। যেখানে অন্য দেশগুলো দ্বিধায় ছিল, সেখানে আবুধাবি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। যেখানে অন্যরা আড়ালে কথা বলেছে, সেখানে আমিরাত প্রকাশ্যেই বিনিয়োগ করেছে। আজ আমিরাত বন্দর, দ্বীপ, ভাড়াটে বাহিনী ও নজরদারির ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যা কার্যত ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। ইসরায়েল দেয় ভাবনা, কৌশল ও প্রযুক্তি। আর আমিরাত দেয় জায়গা, অর্থ ও দায় এড়ানোর সুযোগ।

এই ব্যবস্থায় ঔপনিবেশিকতা আর সরাসরি দখলের নামে আসে না। এটি ধীরে ধীরে ব্যবসার মতো ছড়িয়ে পড়ে। প্রয়োজন হলে একটি রাষ্ট্র ভেঙে ফেলা হয়, আর সেই ধ্বংস থেকেই তৈরি করা হয় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ। যতক্ষণ লাভ বাড়ে, ততক্ষণ এই প্রক্রিয়া থামে না।

তবে এই প্রকাশ্য সমন্বয়ের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক ইসলামি ন্যাটোর গোপন জায়নবাদ। প্রকাশ্য জায়নবাদ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে, প্রতিবাদ জাগায়; কিন্তু গোপন জায়নবাদ আনুগত্য তৈরি করে। এটি প্রতিরোধকে এমনভাবে শান্ত করে যে কোনো সতর্কসংকেতই বাজে না। সাম্রাজ্যের প্রকল্পে এটি মুসলিম মুখ বসায়। বিরোধিতার জায়গায় আনে সংলাপ। বিশ্বাসঘাতকতার জায়গায় বসায় বাস্তববাদ। আত্মসমর্পণকে বলা হয় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। এটি হিব্রু ছাড়া জায়নবাদ। কম দৃশ্যমান; কিন্তু অনেক বেশি কার্যকর এবং তাই আরও প্রাণঘাতী।

পাকিস্তানের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে অশোভন। পাকিস্তান একটি পারমাণবিক মুসলিম রাষ্ট্র, যেখানে ফিলিস্তিনের পক্ষে জনসমর্থন প্রবল। অথচ সেখানকার শাসকেরা বোর্ড অব পিসে বসেন, আর দেশের ভেতরে আইনজীবীদের কারাগারে পাঠান, কর্মীদের গুম করেন, ডিজিটাল রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করেন। এ কারণেই ইমরান খান কারাগারেও শাসকদের জন্য অস্বস্তির নাম। তিনি প্রকাশ্যে বা আড়ালে কখনোই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি হননি। এতে সাম্রাজ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক ছক ভেঙে পড়ে।

ফিলিস্তিনের প্রতি তার নিঃশর্ত সমর্থন এবং কাশ্মীর ও গাজাকে কোনো কূটনৈতিক দর-কষাকষির বিষয় না বানিয়ে নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দেখার অবস্থান সেই ধারণাকে চূর্ণ করে দেয় যে মুসলিম জনগণকে চিরকাল প্রতীকী কথা আর ফাঁকা আশ্বাসে ব্যস্ত রাখা যাবে। এই অবস্থানই তাকে শাসকগোষ্ঠীর কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০২২ সালের এপ্রিলের শাসন পরিবর্তন কেবল ঘরোয়া রাজনৈতিক প্রকৌশল ছিল না। এটি ছিল আঞ্চলিক শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়ার অংশ। জায়নবাদ গ্লোবাল সাউথে কোনো ক্যারিশম্যাটিক অবাধ্যতাকে সহ্য করে না। সে দৃষ্টান্ত চায়। সে চায় সার্বভৌমত্বকে শাস্তি দিতে, যতক্ষণ না তা অচল হয়ে পড়ে।

এদিকে ইসলামি ন্যাটো ইরানে শাসন পরিবর্তনের বিরোধিতা করে কোনো নীতিগত কারণে নয়; বরং ভয়ের কারণে। তারা জানে, সেখানে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নিজেদের শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুরতা প্রকাশ্যে চলে আসবে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিন

এই বিরোধিতা তাই ন্যায়বোধের নয়, হিসাবের ফল। তারা অস্থিরতাকে ভয় পায়। অবিচারকে নয়। ট্রাম্পবাদ আসলে শুধু সেই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, যা উদার সাম্রাজ্যবাদ একসময় আড়াল করে রাখত। এখানে আইনের চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অধিকারের চেয়ে চুক্তি। মানুষের চেয়ে ক্ষমতাবানই মুখ্য। দেশের ভেতরে আইসের সন্ত্রাস আর দেশের বাইরে দমননীতি একই মানসিকতার প্রকাশ। নিরাপত্তা মানে আধিপত্য। শৃঙ্খলা মানে সহিংসতা।

এ প্রেক্ষাপটেই শেষ বিদ্রূপটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামি ন্যাটো নিজেকে মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে তারা কখনো এত দুর্বল ছিল না। তারা চাইলে সম্মিলিতভাবে বোর্ড অব পিস প্রত্যাখ্যান করে পুরো উদ্যোগকে অকার্যকর করে দিতে পারত। তারা তা করেনি। তারা চাইলে গণহত্যার জন্য বাস্তব মূল্য আরোপ করতে পারত। তারা দিয়েছে কেবল বিবৃতি। তারা চাইলে নিজেদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারত; কিন্তু তারা বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটনকে।

ইতিহাস কারও প্রতি সহানুভূতিশীল হবে না। ইসরায়েল হত্যা চালিয়ে যাবে এবং সেটিকে আত্মরক্ষার নামে চালাবে। আমিরাত মুনাফা করবে এবং তাকে আধুনিকায়নের ভাষায় সাজাবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন ফুরোলেই মিত্রদের ফেলে দেবে এবং সেটিকেই নেতৃত্ব হিসেবে তুলে ধরবে। পাকিস্তানের শাসকেরা দমননীতি চালু রাখবে এবং তাকে স্থিতিশীলতা বলবে। ইসলামি ন্যাটো নিয়মিত বিবৃতি দেবে এবং সামান্য নড়াচড়াকেই অগ্রগতি বলে ধরে নেবে।

তবু এই বিশ্বাসঘাতকতার কাঠামোর নিচে ধীরে ধীরে আরেকটি উপলব্ধি জন্ম নিচ্ছে। সার্বভৌমত্ব কাউকে ভাড়া দেওয়া যায় না। সংহতি অভিনয় করে দেখানো যায় না। ধ্বংসের পর যে শান্তির কথা বলা হয়, তা আসলে ভালো আলোয় সাজানো সহিংসতারই আরেক রূপ। সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে তখনই, যখন তাদের মিথ্যা মানুষকে আর অবশ করে রাখতে পারে না।

যখন শান্তি শব্দটি আধিপত্য হিসেবেই শোনা যায়। যখন অংশগ্রহণ মানে আত্মসমর্পণ বলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামি ন্যাটো গড়া হয়েছিল ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে, তার জবাব দিতে নয়। সেই ব্যবস্থায় এখন ফাটল ধরেছে। এরপর যা আসবে, তা আলোচনার টেবিলে মিটবে না। তা হবে হিসাব চুকানোর সময়।

  • জুনায়েদ এস আহমাদ পরিচালক, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকোলোনাইজেশনের, পাকিস্তান

    মিডিল ইস্ট মিরর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত