আইনসভা রাষ্ট্রের সেই নাভিকেন্দ্র, যেখানে রাষ্ট্রাচারের বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। আইনসভার সদস্য প্রচলিত অর্থে সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত, তাঁরা সেই আইন জন্মদানের প্রক্রিয়ার ধাত্রী। আইনপ্রসবা আইনসভায় সংসদ সদস্য তর্কবিতর্ক করেন বলে জানি। প্রসবব্যথা উঠলে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা না থাকলে স্বামী হলেও সেই প্রক্রিয়ায় থাকতে পারবেন না (যদিও পশ্চিমা দেশে ওই সময়ে স্বামীকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়)। সে বিবেচনায় রাজনীতির অভিজ্ঞতাহীন নতুন সদস্যরা নতুন আইন প্রণয়নপূর্ব সংসদীয় বিতর্কে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবেন, সেই সন্দেহ কি অহেতুক?
রেওয়াজ ছাড়া গানের সুর, তাল ও লয় ঠিক হয়? গলা সাধা ছাড়া গান গাইলে হবে? ঘরোয়া আসর জমানো যায়, কিন্তু তার চেয়ে বড় পরিসরে? থিয়েটারে মহড়া ছাড়া, অনুশীলন ছাড়া মঞ্চে ডাক পাবেন? বয়সভিত্তিক দলে খেলা ছাড়া ন্যাশনাল ক্রিকেট টিমে ঢুকতে পারবেন? যদি প্রশ্নগুলোর উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে কেন মনে হচ্ছে, লাখো নির্বাচকের জন্য আইনসভায় গিয়ে আইন প্রণয়ন করবেন রাজনীতির কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া।
সংসদ সদস্যের কাজ কেবল নৌকাবাইচের উদ্বোধন কিংবা ত্রাণের গম বিতরণ নয়, সংসদ সদস্যদের কাজ কেবল ঠিকাদারিও নয়; জাতির জীবন পরিচলনের আইনকানুন তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাজ একজন সংসদ সদস্যের। বিমানের টিকিট কাটলেন, তাই বলে বিমান চালনার আবদার কি রাখতে হবে? প্রশিক্ষণ ছাড়া পাইলট আর রাজনৈতিক সংস্রবহীন হঠাৎ আইনপ্রণেতা বনে যাওয়ার তফাত কোথায়?
জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভের চেষ্টায় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে শামিল ক্রীড়া, বিনোদনসহ বিভিন্ন অঙ্গনের তারকারা, প্রশাসন ও পুলিশের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সংসদের ৩০০ আসনের বিপরীতে মোট ৩ হাজার ৩৬২টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। প্রতিটি আসনের বিপরীতে আগ্রহী প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে গড়ে ১১ জন।
কিন্তু পাশের দেশে মহুয়া মৈত্র যে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রাখেন, তা কি এফডিসি-ফেরত কেউ দিতে নিশ্চিত করতে পারেন? মনোনয়ন যাঁরা পেয়েছেন বা পাননি অথবা কোনো না কোনোভাবে রাজনীতিসংলগ্ন, তাঁরা ভাবতে পারেন, জীবন আসলে অন্বেষণ, সমর্পণ, অভিশাপ এবং মূলত ব্যর্থতার সমূহ শিল্প। রাজনীতিও নয় কি?
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজনীতিবিদদের বাইরে ক্রিকেটার, ব্যবসায়ী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, সাবেক আমলা, সাবেক পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তা, চিকিৎসক, কূটনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ প্রায় সব পেশার ব্যক্তিরা আছেন। আওয়ামী লীগ এবার এমন কিছু সংসদ সদস্য হতে আগ্রহী রাজনীতি ভিন্ন অন্য মাধ্যমের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে যে এতে বহু বছর ধরে রাজনীতির মাঠের লড়িয়েরা হতাশ হয়েছেন।
রাজনীতির সংস্রবহীন নতুন প্রার্থীদের মনোনয়ন অথবা শর্তহীন সমর্থনের প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা নেই বলা যাবে না। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। খেলোয়াড় বা অন্য পেশার জনপ্রিয় ব্যক্তির রাজনৈতিক দলের হয়ে ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সমরূপতা রয়েছে। জাতীয় ফুটবল দলের এক অধিনায়ক জনপ্রতিনিধি হয়ে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র (হোক তা নিবন্ধিত) প্রদর্শন করার ঘটনা তো খুব আগের ঘটনা না।
যেকোনোভাবেই হোক নির্বাচন হবে, কিন্তু ঐতিহ্যবাহী দলের পতাকার ভার এমন কারও হাতে দিয়ে অনাসৃষ্টি না ঘটানোই বাঞ্ছনীয়। অনেক দিন দলীয় রাজনীতি করেও মনোনয়ন না পাওয়া রাজনৈতিক ভাষ্যে ন্যায্যতার ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।
মনোনয়ন নিয়ে রাজনীতিতে জেঁকে বসতে অনেক পদাধিকারী তাঁর পদে থেকেই ক্ষমতার অপচর্চা করেন। অবসরের পর নেমে যান রাজনীতিতে। অবসরের তিন বছর পার না হওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের (সামরিক-বেসামরিক) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার বিধান কেন অবৈধ হবে না, এ-সংক্রান্ত চারটি পৃথক রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। (সূত্র: প্রথম আলো)
আবেদনকারী ও সরকারপক্ষকে পরিপূর্ণভাবে শুনে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় দেন। ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের চতুর চক্রব্যূহ ভেঙে দিতে এই রায় এক কার্যকর ব্যবস্থা। এখানে বিচার বিভাগ সেই অভিভাবক, যে লাভের বানে সেটে দিয়েছে জলকপাট।
একটা সময় ছিল যখন মিশনারি ফোকাস নিয়ে রাজনীতি করতেন দিনবদলের স্বপ্ন দেখা তরুণেরা। সেদিন এখন গত, সেসব দিনের কথা এখন লোককথার মতো শোনায়। অতীত আর বর্তমানের এক যুগলবন্দী দেখা গেল, আওয়ামী লীগ যখন তার মনোনয়নের তালিকা প্রকাশ করল। তবে পূর্বাপর দলীয় রাজনীতির সংস্রবহীন কিছু প্রার্থীর মনোনয়ন দেখে রাজনীতির মাঠের প্রার্থীদের হতাশ হওয়া স্বাভাবিক।
দুনিয়ার অনেক প্রান্তেই পূর্ব-পশ্চিমনির্বিশেষে জনতুষ্টিবাদের বাড়বাড়ন্ত। ট্রাম্প থেকে এরদোয়ান জনমনোরঞ্জনের জয়গান এবং তা গণতন্ত্রের নামেই কিন্তু। এ ধরনের নির্বাচনের পর প্রশ্ন ওঠে, নিহিত এই সম্ভাবনা নিয়েই কি গণতন্ত্র ভবিষ্যতেও তার যাত্রা জারি রাখবে?
‘তত্ত্বতালাশ’ একটি চিন্তাচর্চার জার্নাল, এতে প্রশ্নকারী সারোয়ার তুষারের প্রশ্ন, ‘দুনিয়াজুড়ে এমন অভিনব কিছু ঘটে চলেছে, যা সমস্ত মূল্যবোধকে মাড়িয়েও প্রবল পরাক্রমের সঙ্গে বিরাজ করে যাবে?’ উত্তরে সাব-অল্টার্ন তাত্ত্বিক সুদীপ্ত কবিরাজ বলেন, ‘সাধারণ লোককে একবার নির্বিশেষে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যে নিয়ে এলে তাকে আর প্রতিপ্রেরণ করা সম্ভব নয়।’ কে জানে আমরা সে সে চক্রে পড়ে গেলাম কি না?
নীতিনির্ধারণের জায়গা সংসদ। বিচারকের নৈর্ব্যক্তিকতা আমরা প্রত্যাশা করি আইন প্রণয়নকারী সংসদ সদস্যদের কাছ থেকেও। কিন্তু সংসদ সদস্য যখন ব্যবসায়ী, তখন তিনি নিশ্চিতভাবেই নিজ নিজ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কোনো নীতি-আইন প্রণয়ন করবেন না।
রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের দখলে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী এমপি হন ৬১ শতাংশ। অথচ ১৯৭৩ সালের সংসদে আইনপ্রণেতাদের প্রধান পেশা ছিল আইন ব্যবসা। তা ছাড়া পেশা হিসেবে ব্যবসা ও কৃষিকাজও ছিল। সেই সময়ের সংসদে ৩১ শতাংশ আইনপ্রণেতা ছিলেন আইনজীবী এবং ১৮ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী। নব্বই-পরবর্তী নির্বাচনগুলোয় ব্যবসায়ীদের হার বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানেন, রাজনীতিতে টাকার প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে (সূত্র: সমকাল)।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা অবয়ব থাকে, আচরণকে তা নিয়ন্ত্রণ করে। রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা বর্জিত কাউকে মনোনয়ন সব ক্ষেত্রে যে সমালোচনার তা নয়। এর বিপরীত চিন্তার অনুসারীরা বলবেন, সংসদ হোক রংধনুর মতো বৈচিত্র্যময়।
কিন্তু পাশের দেশে মহুয়া মৈত্র যে বিশেষজ্ঞ জ্ঞান রাখেন, তা কি এফডিসি-ফেরত কেউ দিতে নিশ্চিত করতে পারেন? মনোনয়ন যাঁরা পেয়েছেন বা পাননি অথবা কোনো না কোনোভাবে রাজনীতিসংলগ্ন, তাঁরা ভাবতে পারেন, জীবন আসলে অন্বেষণ, সমর্পণ, অভিশাপ এবং মূলত ব্যর্থতার সমূহ শিল্প। রাজনীতিও নয় কি?
এম এম খালেকুজ্জামান আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
adv.mmkzaman@gmail.com