গতকাল দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোট গ্রহণ করা হয়।
গতকাল দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোট গ্রহণ করা হয়।

মতামত

যে কারণে এবার মানুষ ভোটকে নিজের অধিকার ভাবল

ভোট কেবল রাজনৈতিক পরিভাষা নয়—এটি নাগরিক আত্মসম্মানের ভাষা। মানুষ এবার উপলব্ধি করেছে, ভোট দেওয়া মানে কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন নয়; এটি নিজের অস্তিত্ব, মত ও ভবিষ্যতের ওপর নিজের স্বাক্ষর রাখা। এবারের নির্বাচন তাই মানুষকে শুধু ভোটার বানায়নি; তাদের আরও সচেতন, আত্মমর্যাদাবান ও সক্রিয় নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। লিখেছেন সারফুদ্দিন আহমেদ

এবারের নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভোটকেন্দ্রগুলোতে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা নিছক একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সম্পাদন ছিল না; বরং তা ছিল নাগরিক আত্মসচেতনতার এক গভীর, নীরব ও তাৎপর্যপূর্ণ উন্মোচন।

ভোটকেন্দ্রের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখেমুখে যে প্রশান্তি, যে আত্মবিশ্বাস এবং যে সংযত গর্ব প্রতিফলিত হয়েছে, তা একটি রাজনৈতিক ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি কিছু নির্দেশ করে। মনে হয়েছে, তাঁরা যেন নিজেদের অস্তিত্ব, মতামত ও নৈতিক অবস্থানকে রাষ্ট্রের সামনে নিবন্ধিত করতে এসেছেন।

গতকাল বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা সত্ত্বেও সামগ্রিক পরিবেশ ছিল স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল। ভোটারদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—তাঁরা ভোটদানকে আর নিছক প্রক্রিয়াগত অংশগ্রহণ হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য অধিকার প্রয়োগের এক সচেতন মুহূর্ত হিসেবে অনুভব করছেন। যেন প্রতিটি ব্যালট পেপার একটি নীরব ঘোষণা—‘আমি আছি; আমার মত আছে; আমার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রগঠনের অংশ।’

এই মনোভঙ্গির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার স্তর, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সঞ্চিত বোধ, সামাজিক রূপান্তরের ধারা এবং নতুন প্রজন্মের নাগরিক চেতনার উত্থান। ফলে ভোট আজ কেবল দায়িত্ব নয়; এটি অধিকার, মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।

তারুণ্যের প্রথম ভোট: ‘খুব ঈদ ঈদ ফিল হচ্ছে’

‘তারুণ্যের প্রথম ভোট দিয়েছি, খুব ঈদ ঈদ ফিল হচ্ছে’—প্রথম আলোর প্রতিবেদনে আসা এক তরুণের এই উক্তির মধ্যেই ধরা পড়ে এক নতুন নাগরিক মানসিকতার সুর। তরুণ ভোটারদের অভিজ্ঞতায় ভোট যেন পরিণত হয়েছে এক উৎসবমুখর আত্মপ্রকাশে।

খিলগাঁও মডেল কলেজ কেন্দ্রে নাফিসা আনজুম ও মাহমুদা মাহফুজের বক্তব্যে যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের আনন্দ।

মাহমুদার ‘নিজের ভোটটা নিজে দিতে পেরেছি’—এই উচ্চারণে নিহিত রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি আকাঙ্ক্ষার পূরণ। নাফিসার বক্তব্যে অতীতের আতঙ্ক ও বর্তমানের আস্থার পার্থক্য স্পষ্ট। আগে নির্বাচন মানেই ছিল অনিশ্চয়তার শঙ্কা; এবার তা পরিণত হয়েছে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তায়।

রাজনৈতিক দর্শনের পরিভাষায় বলতে গেলে, ভোটদান হলো ‘পাবলিক রেল্ম’-এ প্রবেশের এক অনন্য মুহূর্ত—যেখানে ব্যক্তি নিজেকে ব্যক্তিগত পরিসর থেকে তুলে এনে সামষ্টিক পরিসরে দৃশ্যমান করে তোলে। এই দৃশ্যমান হওয়াই নাগরিকত্বের প্রথম শর্ত। তরুণ ভোটারদের অভিজ্ঞতায় সেই দৃশ্যমানতার আনন্দই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

ভয় থেকে আস্থায়: গণতন্ত্রের মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি

গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের ধারায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি আস্থার সংস্কৃতিতে বিকশিত হয়। অতীতে ভোটকে ঘিরে সহিংসতা, অনিশ্চয়তা ও প্রক্রিয়াগত অস্পষ্টতার যে অভিজ্ঞতা ছিল, তা অনেক নাগরিকের মধ্যে একধরনের মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করেছিল। অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগের সাহস বা বিশ্বাস তৈরি হয়নি।

রাজনৈতিক তত্ত্বে ‘পারসিভড ফেয়ারনেস’ বা প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা সম্পর্কে নাগরিকের উপলব্ধি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি মৌলিক উপাদান। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে তার ভোট নিরাপদ, গণনা নির্ভুল এবং প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, তখনই সে নিজের ভোটকে অর্থবহ বলে মনে করে। এবারের নির্বাচনে বহু ভোটারের অভিজ্ঞতায় সেই ন্যায্যতার ধারণা দৃঢ় হয়েছে। ফলে ভোট আর কেবল কর্তব্য নয়; তা পরিণত হয়েছে আত্মসম্মানের এক অভিব্যক্তিতে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘পলিটিক্যাল এফিকেসি’ বা রাজনৈতিক কার্যকারিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। নাগরিক যখন অনুভব করে যে তার ভোট ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে, তখনই সে অংশগ্রহণে আগ্রহী হয়। এবারের নির্বাচনে সেই কার্যকারিতা-বোধ অনেকের মধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে।

দীর্ঘ বঞ্চনা পেরিয়ে অংশগ্রহণ: নারীর উপস্থিতি

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের ঘটনা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ১৯৬৯ সালে স্থানীয়ভাবে নারীদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার যে নির্দেশনা জারি হয়েছিল, তা দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে এক সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। ফলে হাজারো নারী সাংবিধানিকভাবে ভোটার হয়েও কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তাঁদের নাগরিকত্ব ছিল অসম্পূর্ণ—আইনে স্বীকৃত, কিন্তু বাস্তবে অবদমিত।

এবার সেই নীরবতার অবসান ঘটেছে। ভোটকেন্দ্রে নারীদের উপচে পড়া উপস্থিতি ছিল শুধু সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি ছিল সামাজিক মানসিকতার রূপান্তরের চিহ্ন। আয়েশা বেগমের প্রথমবার ভোট দিতে এসে উচ্চারিত ‘খুবই ভালো লাগছে’—এই সংক্ষিপ্ত বাক্যে ধরা পড়ে অর্ধশতাব্দীর বঞ্চনা পেরোনোর আবেগ। ‘নারীরা যখন জীবনের সব ক্ষেত্রেই অংশ নেয়, তখন ভোট দিতে পারবে না কেন?’—নূরজাহান বেগমের এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সামাজিক যুক্তির পুনর্গঠন।

নারীর ভোটাধিকার কেবল সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ নয়; এটি সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রশ্ন। স্থানীয় প্রশাসন, আলেম ও ইমামদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যখন স্পষ্ট করা হয়, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নারীর ভোটদানে কোনো বাধা নেই, তখন তা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক বেশি কিছু বলে প্রতিভাত হয়। এটি তখন হয়ে ওঠে সামাজিক ব্যাখ্যার পুনর্লিখন।

নারীদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, সুযোগ ও সচেতনতা তৈরি হলে দীর্ঘদিনের সামাজিক নিষেধাজ্ঞাও অতিক্রম করা যায়। অনেকে আগে কখনো ভোট না দেওয়ায় প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন; কিন্তু সেই অজ্ঞতা ছিল বঞ্চনার ফল, অক্ষমতার নয়। শেখার সুযোগ পেয়ে তাঁরা অংশ নিয়েছেন।

পাঁচ দশকের বেশি সময় পর নারীদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠান দিয়ে নয়, অংশগ্রহণ দিয়ে টিকে থাকে। অন্তর্ভুক্তি ছাড়া গণতন্ত্রের কাঠামো দৃশ্যত অটুট থাকলেও তার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভোট: নৈতিক চুক্তি ও আত্মমর্যাদার প্রকাশ

ভোটদান কেবল প্রতিনিধিত্বের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার নৈতিক চুক্তির পুনর্নবীকরণ। প্রতিটি ভোট একদিকে ব্যক্তির বিবেকের প্রকাশ, অন্যদিকে সামষ্টিক ভবিষ্যতের নির্মাণে অংশগ্রহণ। ব্যালটপত্রে দেওয়া একটি সিল ব্যক্তিগত পছন্দের বহিঃপ্রকাশ হলেও তার তাৎপর্য সামষ্টিক।

ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী, গৃহিণী বা প্রবীণ—সবাই সেখানে সমান। সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক পার্থক্য বা সাংস্কৃতিক বিভাজন ব্যালটের সামনে এসে সাময়িকভাবে মুছে যায়। এই সাম্যের অভিজ্ঞতাই নাগরিককে অনুভব করায়—সে রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অংশীদার।

ভোট: নৈতিক দায়িত্ব ও যৌথ ভবিষ্যতের নির্মাণ

রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস জনগণের সম্মতি। শাসনক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বতঃসিদ্ধ অধিকারে প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং তা নাগরিকসমষ্টির সম্মতিতে নৈতিক ভিত্তি লাভ করে। ভোট সেই সম্মতির দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। নাগরিক যখন ভোট প্রদান করেন, তখন তিনি কেবল একটি প্রতীকে সিল দেন না; তিনি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে নবায়িত করেন, শাসনের বৈধতাকে পুনর্নিশ্চিত করেন এবং নিজেকে সেই নৈতিক চুক্তির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

এবারের নির্বাচনে ভোটারদের বক্তব্যে যে প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে তা হলো—তাঁরা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, জননিরাপত্তা, সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বাস্তব ও জীবনঘনিষ্ঠ প্রশ্ন বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অর্থাৎ ভোট আবেগের অস্থিরতায় সীমাবদ্ধ না থেকে যুক্তিনির্ভর পর্যালোচনার স্তরে উন্নীত হয়েছে।

এই রূপান্তর গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার লক্ষণ। গণতন্ত্র তখনই গভীরতর হয়, যখন নাগরিকেরা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে নীতিগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সচেতনতার বিস্তার

সাম্প্রতিক সামাজিক জরিপগুলোতে দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক নাগরিক ভবিষ্যৎ নির্বাচনেও অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো—একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূর্ববর্তী সমর্থন পরিবর্তনের ইচ্ছা জানিয়েছেন।

এই প্রবণতা নির্দেশ করে যে ভোটাররা স্থির ও অন্ধ আনুগত্যে আবদ্ধ নন; তাঁরা মূল্যায়ন করেন, তুলনা করেন এবং প্রয়োজনে অবস্থান বদলান। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় এই গতিশীলতাকে বলা হয় ‘ইলেকটোরাল ভোলাটাইলিটি’—যা পরিণত গণতন্ত্রে সচেতন ভোটার আচরণের অন্যতম সূচক।

নতুন প্রজন্ম, বিশেষত তথাকথিত ‘জেন-জি’, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশে বেড়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সংবাদ ও বহুমাত্রিক মতামতের প্রবাহ তাদের রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের কাছে ভোট পারিবারিক বা সামাজিক ঐতিহ্যের অনুকরণ নয়; এটি স্বতন্ত্র অবস্থান নির্ধারণের মাধ্যম। তারা প্রশ্ন করেন, যাচাই করেন এবং আলোচনায় অংশ নেন। ফলে ভোট তাঁদের কাছে কেবল আনুগত্যের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং আত্মনির্ধারণের ঘোষণা।

ব্যক্তিগত মর্যাদা ও নাগরিকত্বের দার্শনিক মাত্রা

ভোটাধিকার মানব মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অংশগ্রহণ ছাড়া নাগরিকত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক পরিচয় হয়ে থাকে; কার্যকর নাগরিকত্বের জন্য প্রয়োজন সক্রিয় উপস্থিতি। ভোট দেওয়া মানে নিজেকে রাষ্ট্রের সমমর্যাদাসম্পন্ন সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা—যেখানে ব্যক্তি তাঁর কণ্ঠকে সামষ্টিক সিদ্ধান্তে যুক্ত করেন।

ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন পেশা, বয়স ও সামাজিক অবস্থানের মানুষদের দৃশ্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। একজন শ্রমিক, একজন শিক্ষার্থী, একজন গৃহিণী, একজন প্রবীণ—সবাই একই সারিতে দাঁড়িয়ে, একই প্রক্রিয়ার অংশ। ব্যালট বাক্সের সামনে সামাজিক পার্থক্য সাময়িকভাবে বিলীন হয়ে যায়; সেখানে কেবল নাগরিক পরিচয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে। এই সাম্যের অভিজ্ঞতাই মানুষকে অনুভব করায়—ভোট কেবল সুযোগ নয়, এটি তার প্রাপ্য অধিকার।

গণতন্ত্রের মনস্তত্ত্ব: ‘আমার ভোটের মূল্য আছে’

গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক উপাদান হলো ‘পলিটিক্যাল এফিকেসি’ বা রাজনৈতিক কার্যকারিতা। নাগরিক তখনই সক্রিয় হন, যখন তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর অংশগ্রহণ ফলাফলে প্রভাব ফেলতে সক্ষম; যদি তিনি মনে করেন, তাঁর ভোট অপ্রাসঙ্গিক বা অগণ্য, তবে অংশগ্রহণের আগ্রহ ক্ষীণ হয়ে যায়।

এবারের নির্বাচনে বহু ভোটার জানিয়েছেন, তাঁদের মনে হয়েছে, তাঁদের ভোট গণনায় যুক্ত হবে, অবহেলিত হবে না। এই বিশ্বাস অধিকার-উপলব্ধির কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক কার্যকারিতার এই অনুভূতি গণতন্ত্রকে কেবল কাঠামোগত নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবে দৃঢ় করে।

অধিকার থেকে আত্মমর্যাদায় উত্তরণ

সমগ্র প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, এবারের নির্বাচন মানুষকে এক নতুন আত্মচেতনার দিকে উন্মুক্ত করেছে। এটি কেবল ভোটদান নয়; এটি আত্মপ্রকাশ, আত্মমর্যাদা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের সমন্বিত অভিজ্ঞতা। ভয় ও অনিশ্চয়তার স্থানে এসেছে আস্থা; উদাসীনতার জায়গা নিয়েছে সক্রিয় অংশগ্রহণ; অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে দৃশ্যমান হয়েছে বিবেচনাশীল সিদ্ধান্ত।

ভোট তাই আর কেবল রাজনৈতিক পরিভাষা নয়—এটি নাগরিক আত্মসম্মানের ভাষা। মানুষ এবার উপলব্ধি করেছে, ভোট দেওয়া মানে কেবল প্রতিনিধি নির্বাচন নয়; এটি নিজের অস্তিত্ব, মত ও ভবিষ্যতের ওপর নিজের স্বাক্ষর রাখা। এবারের নির্বাচন তাই মানুষকে শুধু ভোটার বানায়নি; তাদের আরও সচেতন, আত্মমর্যাদাবান ও সক্রিয় নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

  • সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক

    sarfuddin2003@gmail.com

    *মতামত লেখকের নিজস্ব