সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান

মতামত

আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগ সৌদির জন্য কতটা ধাক্কা

আগামী মাসেই তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সৌদি আরবের জন্য স্পষ্ট বার্তা, তেমনি তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি উপসাগরীয় অঞ্চলে পুরোনো টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করে তুলেছে, ঐক্য নয়, বরং বিভাজনই যেন সামনে এনে দিচ্ছে।

দেখতে গেলে, ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তটি হঠাৎ কিছু নয়। বহুদিন ধরেই তেল উৎপাদন কতটা হবে—এই প্রশ্নে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে মতবিরোধ ছিল। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তেলের দাম ধরে রাখতে উৎপাদন সীমিত রাখতে চেয়েছে, অন্যদিকে আমিরাত বরাবরই বেশি উৎপাদনের পক্ষে ছিল। গ্লোবাল রিস্ক ম্যানেজমেন্টের প্রধান বিশ্লেষক আর্নে লোহমান রাসমুসেনের কথায়, আমিরাত সব সময় ‘পরিমাণভিত্তিক কৌশল’-এর দিকে ঝুঁকেছে, আর সৌদিরা থেকেছে ‘দামভিত্তিক কৌশল’-এ।

এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। সৌদি আরবে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বাস এবং তাদের তেলের মজুতও আমিরাতের দ্বিগুণের বেশি। বিপরীতে আমিরাতে নাগরিকের সংখ্যা ১০ লাখের মতো। ফলে তেল আয়ের ভাগাভাগিও সেখানে তুলনামূলকভাবে সীমিত মানুষের মধ্যে হয়। সেই সঙ্গে আমিরাত বহুদিন ধরেই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে তেল উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

আমিরাতের ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক যতটা, রাজনৈতিক ততটাই। সেন্টার ফর দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রেগ প্রিড্ডির মতে, সৌদি আরব নিজেই বাজার দখলে ফের মনোযোগ দেওয়ায় পুরোনো বিতর্কের গুরুত্ব কমে গেছে। তাই এই সিদ্ধান্ত মূলত রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।

ঠিক এই সময়েই আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সম্প্রতি জানা গেছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে আমিরাতকে সহায়তা দিতে ইসরায়েল একটি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও প্রযুক্তিবিদ পাঠিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

যদিও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার ও আকাশপথে সহায়তা দিয়েছে, একই সঙ্গে তারা পাকিস্তানের মাধ্যমে মধ্যস্থতার চেষ্টাও চালিয়েছে। অন্যদিকে আমিরাত প্রকাশ্যে ও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে আক্রমণ চালিয়ে যেতে চাপ দিয়েছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতা ঠেকানোর চেষ্টা করেছে।

এই অবস্থায় ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার কৌশল হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প বহুদিন ধরেই ওপেককে ‘বিশ্বকে ঠকানো কার্টেল’ বলে সমালোচনা করে আসছেন। আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক এলেন ওয়াল্ড মনে করেন, এটি হয়তো আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনো সমঝোতার অংশ, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় সহায়তার বিনিময়ে ওপেককে দুর্বল করার চেষ্টা হয়েছে। এমনকি শিগগিরই কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তির ঘোষণাও আসতে পারে বলে তিনি ধারণা দিয়েছেন।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নার্ড হেইকেলের মতে, আমিরাতের জ্বালানি নীতি সৌদি আরবের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ওপেক ছাড়ার ফলে তাদের আর সৌদিদের কথা শুনতে হবে না। বহু বছর ধরেই তারা এই সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছিল, আর যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।

এরই মধ্যে আমিরাত দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও ইঙ্গিত মিলছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ ৯ মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে তারা প্রস্তুত। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি মুদ্রা বিনিময় চুক্তির প্রস্তাবও দিয়েছে আমিরাত, যাতে প্রয়োজন হলে ডলারের সরবরাহ নিশ্চিত থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওপেক ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমিরাত-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতারই অংশ। ওপেকে সৌদি আরবের আধিপত্য দীর্ঘদিনের, আর রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ
নিয়ে গঠিত ওপেক প্লাসেও তাদের প্রভাব প্রবল। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের ভাষায়, এই সিদ্ধান্তে সৌদি আরব ক্ষুব্ধ হবে এবং মনে হচ্ছে আমিরাত আরও বড় কোনো পরিকল্পনা করছে।

দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। ইয়েমেনে সৌদি আরব আমিরাত-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে, আবার সুদানের গৃহযুদ্ধেও তারা বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। এমনকি লিবিয়াতেও প্রভাব বিস্তার নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। ইরানের হামলার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, এই যুদ্ধ হয়তো দুই দেশকে আবার কাছাকাছি আনবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বার্নার্ড হেইকেলের মতে, আমিরাতের জ্বালানি নীতি সৌদি আরবের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ওপেক ছাড়ার ফলে তাদের আর সৌদিদের কথা শুনতে হবে না। বহু বছর ধরেই তারা এই সিদ্ধান্ত বিবেচনা করছিল, আর যুদ্ধ পরিস্থিতি তাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে।

বাস্তবিক দিক থেকেও আমিরাত এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। যুদ্ধের আগে তারা দৈনিক প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। এখন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ফুজাইরাহ বন্দর হয়ে পাইপলাইনে প্রতিদিন প্রায় ১৯ লাখ ব্যারেল তেল পাঠাচ্ছে। তাদের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আগে এই সিদ্ধান্ত নিলে তা বড় প্রভাব ফেলত। কিন্তু এখন অতিরিক্ত তেল বাজারে আসছে না, কারণ যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত। যুদ্ধ শেষ হলেও বৈশ্বিক মজুতে ঘাটতি থাকায় আমিরাতের বাড়তি রপ্তানি সহজেই বাজারে শোষিত হবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই সিদ্ধান্ত ওপেকের জন্য বড় আঘাত হতে পারে। ৬৫ বছর আগে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনেজুয়েলা মিলে যে জোট গড়ে তুলেছিল, তার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। 

শন ম্যাথিউস মিডল ইস্ট আইয়ের সাংবাদিক

মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত