মতামত

প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, শুরু হোক সহিষ্ণুতার সংস্কৃতি

চব্বিশের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান–পরবর্তী সরকার নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এককথায় আকাশচুম্বী। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে যে অপ্রাপ্তি, বৈষম্য আর অন্যায়ের পাহাড় জমেছিল, সরকার পরিবর্তনের পর তার সবটুকুর প্রতিকার রাতারাতি হয়ে যাবে—মানুষ হয়তো এমনটাই মনে করেছিল।

মানুষের এ চাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না, কিন্তু ১৭ বছরের রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পর এ সীমাহীন প্রত্যাশা অস্বাভাবিকও ছিল না। প্রতিদিন শাহবাগ কিংবা সচিবালয়ের সামনে নানা দাবি নিয়ে বিক্ষুব্ধ জমায়েত বা আন্দোলন এ বিশাল প্রত্যাশারই প্রতিফলন।

একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে এত মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগ এক দিনে বা এক বছরেই সামলানো বা সমাধান করা সত্যিকার অর্থেই দুঃসাধ্য। যেকোনো নির্বাচিত সরকারের জন্যও এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতো। কিন্তু সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্নটা সেই সামাল দেওয়া বা না দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; সাফল্য-ব্যর্থতার প্রশ্নটা বড় হয়ে উঠল ন্যূনতম স্থিতাবস্থার অভাবে।

মানুষের সীমাহীন প্রত্যাশার বিপরীতে সরকার যদি অন্তত কিছু ক্ষেত্রে ন্যূনতম সুশাসন নিশ্চিত করতে পারত, তবে জনমনে এ অনাস্থা তৈরি হতো না। দুটি ইস্যুর কথা বলতেই হয়—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরা।

আমার মতে, এই দুই ইস্যুতে সরকারের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের একটা কার্যকর সম্পর্কের অভাব। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান অংশীজন, কিন্তু সরকার তাদের সঙ্গী হিসেবে যুক্ত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে না পারাটাই সম্ভবত এ সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

এ ক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদের গঠন নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এই পরিষদের একটি বড় অংশ এনজিও প্রতিনিধি হওয়ার কারণে এনজিও চালানোর মনোভাব নিয়ে অনেক সময় তারা তাদের দপ্তরগুলো চালিয়েছে। এনজিও জগতের মানুষেরা নানা কারণেই রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা বোধ করেন না। তাঁদের প্রতি সরকারের এ অবিশ্বাসের প্রতিফলন আমরা রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যেও পাচ্ছি। যেখান থেকে আক্ষেপের সঙ্গে বলতে শোনা গেছে যে প্রধান উপদেষ্টা তাঁদের ডাকেন, সুন্দর করে চা খাওয়ান এবং ভালো ভালো কথা বলে বিদায় দেন। এর অর্থ দাঁড়ায় সরকার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সৌজন্য রক্ষা করছে ঠিকই, কিন্তু কোনো কার্যকর বা গভীর কাজের সম্পর্ক তৈরি করছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটা অর্থবহ সম্পর্ক না থাকার কারণেই সরকারের পক্ষে জনজীবনে স্বস্তি তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সাঈদ ফেরদৌস

সরকার ৫ আগস্ট–পরবর্তী আমলাতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলা সামাল দিতেও চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর আমলাতন্ত্রের ভেতরে যে নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে, যেমন গণপদোন্নতি, দলীয় লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর দৌড়ঝাঁপ, সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বরং দেখা গেছে, উপদেষ্টা পরিষদ সেই বিশৃঙ্খল আমলাতন্ত্রের ওপরেই অতিমাত্রায় নির্ভর করে কাজ করেছে।

সনদ কিংবা পেশাগত অভিজ্ঞতার বিবেচনায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা নিয়ে হয়তো প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম; কিন্তু সমস্যাটা ছিল অন্য জায়গায়। একটি অভ্যুত্থান–পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে ধরনের আউট অব দ্য বক্স উদ্ভাবনী এবং অভিনব চিন্তাশক্তির প্রয়োজন ছিল, তা তাঁদের মধ্যে দেখা যায়নি। তাঁরা গৎবাঁধা বা পুরোনো আমলাতান্ত্রিক রাস্তায় সরকার চালানোর চেষ্টা করেছেন। দেশের অর্থনীতি বিধ্বস্ত, আমলাতন্ত্র অকার্যকর ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ধ্বংসের মুখে, তখন যে ধরনের র‍্যাডিক্যাল বা আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ দরকার ছিল, তা কোথাও দেখা যায়নি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া পরিকল্পিত সহিংসতা ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকানো যায়নি। আমি গণ-অভ্যুত্থানের পরমুহূর্তে সংঘটিত ভাঙচুর কিংবা হামলার কথা এখানে বলছি না। কেননা সেই সময়ে যে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটবে, এটা অনুমেয় ছিল। কিন্তু পরবর্তী মাসগুলোতে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শরিফ ওসমান হাদির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সময়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে কিছু বিষয় দেখিয়ে দিচ্ছে। নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের একটি মন্তব্য এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি সরাসরি বলেছেন যে প্রথম আলোডেইলি স্টার কিংবা ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে হামলাগুলো হয়েছে, তা সরকার বা সরকারের কোনো একটি অংশ হয়তো ঘটতে দিয়েছে। এটা তো বড় চিন্তার কথা।

শহীদ হাদির খুনিরা যেভাবে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন, সে প্রসঙ্গে যদি নূরুল কবীরের কথাটা মাথায় রাখি, তাহলে প্রশ্ন ওঠে এ ধরনের পরিকল্পিত দঙ্গলবাজি এবং সহিংসতা সরকারের কোনো অংশের, কোনো এজেন্সির সহায়তা ছাড়া ঘটা সম্ভব কি না? তাহলে কি সরকারের ভেতরেই এমন কোনো অংশ বসে আছে, যারা এ অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার মাধ্যমে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চায়? তা যদি হয়, তাহলে অক্ষমতার চেয়েও এ অন্তর্ঘাতী তৎপরতাই হবে এ সরকারের বড় সংকট।

নতুন শাসক বা রাজনৈতিক শক্তিকে মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ আর আগের মতো চলবে না। মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন ও ভয়হীনভাবে মত প্রকাশ করছে। এটা আগামীর শাসকদের জন্য একটি রেড সিগন্যাল। তাঁরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে জনগণ তাঁদের ক্ষমা করবে না।

এ যখন পরিস্থিতি তখন সরকারের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব কি না, এটাই এখন একটা বড় প্রশ্ন। অধ্যাপক ইউনূস বা কোনো কোনো উপদেষ্টা নির্বাচনের ব্যাপারে হয়তো আন্তরিক, কিন্তু বাজারে এমন গুঞ্জন জোরালো যে উপদেষ্টাদের একটি অংশ নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চান। সরকারের ভেতরকার বিভিন্ন পক্ষ যদি নির্বাচনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা হবে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। যদি দেখা যায় সরকারের কোনো এজেন্সি বা কোনো উপদেষ্টা দৃশ্যত এমন কাজ করছেন, যা নির্বাচনের আয়োজনকে পিছিয়ে দিচ্ছে, তবে তা গোটা রাষ্ট্রকে সংকটে ফেলবে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফিরে আসা বা জামায়াতে ইসলামীর নতুন জোট গঠনের উদ্যোগের ফলে রাজনৈতিক মাঠে ভোটের প্রচার-প্রচারণা আপাতদৃষ্টিতে এখন তুঙ্গে। ঠিক এ সময়ে খালেদা জিয়ার মৃত্যু বিএনপির নির্বাচনী মাঠে কেমন প্রভাব ফেলবে বলা কঠিন। তবে মাঠের দলগুলোর সবাই নির্বাচন চায় কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ওসমান হাদির বেদনাদায়ক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ যখন ‘আগে বিচার পরে নির্বাচন’ স্লোগান তুলছে, তখন তা এ সংশয়কে পোক্ত করে। সুষ্ঠু বিচার অবশ্যই হতে হবে এবং তার প্রক্রিয়া অবশ্যই এখনই শুরু হতে হবে। কিন্তু এ–ও মনে রাখতে হবে, আমরা প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধ নয়; বরং ন্যায়পরায়ণতা চাই। এ জন্য যতটুকু সময় প্রয়োজন, দিতে হবে। আজকে শুরু হওয়া বিচারপ্রক্রিয়া হয়তো নতুন সরকার এসে শেষ করতে পারে। এসব সংশয়ের পাশাপাশি এমন মতও সমাজে রয়েছে যে প্রতিবেশী ভারতও সম্ভবত বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায় না। ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শক্তিও হয়তো চায় বাংলাদেশে অনিশ্চয়তা বজায় থাকুক। এ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সরকারকে এগোতে হবে।

তবে আশার জায়গা হলো বাংলাদেশের জনগণ, যারা দল–মতনির্বিশেষে একটি নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। তারা মনে করে, একটি নির্বাচিত সরকারই পারে বর্তমানের টালমাটাল পরিস্থিতি সামাল দিতে। জনগণ যদি দেখেন যে সরকার নির্বাচনের আয়োজনে আন্তরিক, তবে তারা সরকারের পাশেই থাকবে। নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসবে এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়বে, তখন সরকারের ওপর থেকে এ অনিশ্চয়তার বোঝা কিছুটা লাঘব হতে পারে।

বর্তমান পটভূমিতে নির্বাচন–পরবর্তী সরকারের জন্য একটা বড় কাজ হলো অর্থনীতিকে দাঁড় করানো। বিগত সরকার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে আর্থিক শৃঙ্খলার সর্বনাশ করেছে। টাকা পাচার কিংবা উন্নয়নের নামে লুটপাট অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ব্যাংক খাতে কিছুটা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করেছেন, যা প্রশংসার যোগ্য। এ সার্বিক অরাজকতা হতে বেরিয়ে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা নিয়ে আসা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

কিন্তু এর চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমাজ ও রাষ্ট্রে সহিষ্ণুতা ফিরিয়ে আনা। বিগত ১৭ বছরের দুঃশাসন এবং তার পতনের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সে কারণে বাংলাদেশে চূড়ান্ত রকমের অসহিষ্ণুচর্চা গড়ে উঠেছে। নতুন সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব হবে সহিষ্ণুতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। অতীতের ধারায় প্রতিশোধ নয়; বরং বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তথাকথিত হত্যা মামলায় কাউকে অভিযুক্ত করে ঝুলিয়ে দেওয়া নয়, অভিযুক্তের প্রকৃত দায়ভার নিরূপণ করে সুবিচার করতে হবে।

সর্বোপরি নতুন শাসক বা রাজনৈতিক শক্তিকে মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশ আর আগের মতো চলবে না। মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন ও ভয়হীনভাবে মত প্রকাশ করছে। এটা আগামীর শাসকদের জন্য একটি রেড সিগন্যাল। তাঁরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারেন, তবে জনগণ তাঁদের ক্ষমা করবে না।

  •  সাঈদ ফেরদৌস লেখক ও গবেষক